নাম ছিল তার বারোবিঘা মাঠ। যে-মাঠে একদা দাপিয়ে ফুটবল খেলেছেন রায়গঞ্জের ষাট-সত্তর দশকের বিখ্যাত খেলোয়াড়রা। চুটিয়ে খেলা হতো ক্লাব ক্রিকেট থেকে অফিস ক্রিকেট। আমি খেলতে দেখেছি আমার বাবা-কাকাদের। পাড়াতুতো দাদা-কাকাদের। রাঙাজেঠুর কাছে সাইকেল শিখেছি আমি নিজে আর আমার বন্ধুরা। ঘুড়ি ওড়াতো ছেলের দল। কিশোর থেকে যুবক। এই মাঠ তখনও প্রাচীর দিয়ে ঘেরা হয়নি। দিব্যি মাঠের চারদিকে বাড়ি, একদিকে শাস্ত্রী সংঘ ক্লাব, আরেকদিকে বিজয় সংঘ। তাদের মেম্বারদের নিয়মিত খেলাধূলা-শরীরচর্চার জায়গা ছিল এই মাঠ। আর আমরা যারা আশেপাশের বাড়ির ছেলেমেয়ে, তাদের রুমালচোর, দাড়িয়াবান্ধা এসব কিছু ছিল বাঁধা। বিকেল হলেই মাথার ওপর চলন্ত গম্বুজের মতো কালো মশার ঝাঁক উড়তো। মোজাতে বিঁধে যেত চোরকাঁটা। কেউ-কেউ গরুর খোটা দিয়ে বেঁধে দিয়ে যেত সকালবেলায়। নিয়ে যেত বিকেল হলে। আশির দশক অবধি এভাবেই ছিল সেই মাঠ। প্রাচীর না-থাকায় ডানদিকে গীতাঞ্জলির দিকে, বাঁদিকে আশা টকিজের দিকে মানুষ এই মাঠটি পেরিয়ে যাতায়াত করতো। ছিল পায়ে-হাঁটা রাস্তা। একটু রাতের দিকে মদ-জুয়ার ঠেক বসতো। একবার এই মাঠ পেরিয়ে আমাদের বাড়ি আসার সময় আমার বড়োপিসির গলার সোনার হার ছিনতাই হয়ে যায়। আরেকবার বাবা টিউশন সেরে রাত্রিবেলা বাড়ি ফেরার সময় সদ্য ঘটে যাওয়া এক মার্ডারের সাক্ষী হয়। আমার ছোটোবেলায় কোর্ট থেকে সাক্ষী দেবার সমন আসতে দেখেছি বাড়িতে। এই মাঠেই পাড়ার হাবলু-কাবলুদের সঙ্গে খেলতে গিয়ে ভাইয়ের পা ভেঙে গেছিল। আমার বাবার অফিস ক্রিকেট ম্যাচের খেলা দেখেছি। সেই ম্যাচে বাবা একটি ক্যাচ আউট করে। ছোটোকাকু ছিল মোটামুটি ফুটবল প্লেয়ার। ছোটোকাকু, দাদা, ভাই এরা সব খেলেছে একদা এই মাঠে। বিকেল হলে মাঠে গিয়ে গল্প করতে বসতেন মা-কাকিমার দল। এই মাঠেই দেখা ছোটোবেলার একমাত্র যাত্রা 'দেবী চৌধুরানী'। সুপ্রিয়া দেবী এসেছিলেন সেই যাত্রা করতে। এই মাঠে নাচ করে গেছেন হেমা মালিনী। সৃষ্টির গোপন কম্মটি যে একটি গালাগাল, তাও এই মাঠের ছেলেপেলের কাছেই শোনা। ছোটোবেলার বন্ধুকে বিশেষ সম্পর্কে আখ্যায়িত করে খ্যাপাতো মাঠের ছেলেপেলে। দু-একজন ছাড়া যাদের সাথে আর যোগাযোগ নেই। সময়ের স্রোতে ছিটকে গেছি কে কোথায়! আর স্মৃতির ওপর ধ্বংসাবশেষের মতো বিরাজ করছে এই মাঠ ভর্তি জঙ্গল। ৯০ দশকে জানতে পারলাম এই মাঠ পিডব্লিউডি-র। তারা এক গুদাম খাড়া করলো মাল স্টক করার জন্য। মাঠের একদিকে গড়ে উঠলো কিছু কোয়ার্টার। পিডব্লিউডি অফিস। আরেকদিকে এই গুদাম। কিছু গাছ লাগানো হলো মাঠের মাঝখানে। দেখতাম, মাঝেসাঝে ফটোগ্রাফি ক্লাবের লোকজন আসতো মাঠে ছবি তুলতে। ক্রমে-ক্রমে পিডব্লিউডি-র অবহেলায় এই মাঠ ভরে গেল ঘন জঙ্গলে। গুদামের মাথায় বসলো ডেনড্রাইট শোঁকার আড্ডা আর মাঠের মধ্যে জমে উঠলো বড়ো-বড়ো লোহার রিং আর রাবিশ। ফাঁকে-ফাঁকে জঙ্গল। তাতে সাপখোপের আড্ডা। তারা সংখ্যায় এতই যে, আশেপাশের বাড়িগুলোতে ঢুকে পড়ে প্রায়ই। মাঝেমাঝে পিডব্লিউডি-তে চিঠি করে কেউ জঙ্গল পরিষ্কার করবার জন্য। একশোবার চিঠি করলে, একদিন এসে হয়তো দু-একবার কাস্তে চালিয়ে যায় ওপর-ওপর। আসল জঙ্গল পরিষ্কার হয় না। লাভ কিছুই হয় না, উপরন্ত আশেপাশের বাড়িগুলোর জঞ্জাল ফেলার ভ্যাটে পরিণত হয়। জঙ্গল হয়ে যাওয়া এখনকার বারোবিঘা মাঠ
খারাপ লাগে, রায়গঞ্জে একসময় একডাকে চিনত যে-সব মাঠ; টাউন ক্লাব আর মার্চেন্ট ক্লাব মাঠের পরেই যার নাম ছিল বারোবিঘা মাঠ, সেই মাঠের এই ভয়ানক দুঃখজনক পরিণতি দেখলে। মনে হয় মানুষ হিসেবে আমরা আমাদের দায়িত্ব-কর্তব্যে অবহেলা এতটাই করি যে, আমাদের সরকারি সংস্থাগুলো তাদের কাজ ঠিকঠাক করে উঠতে পারে না। সামান্য একটা মাঠের রক্ষণাবেক্ষণ পিডব্লিউডি তার এত-এত কর্মী নিয়েও করতে পারলো না। সাধারণ মানুষের হাতে যতদিন ছিল, ততদিন সেই মাঠ ব্যবহারযোগ্য ছিল। সরকারি ঘেরাটোপে সরকারি ব্যবস্থাপনায় সেই মাঠ ধ্বংস হলো। মুছে গেল কত ইতিহাস।
(ক্রমশ)
Comments
Post a Comment