দেবাঞ্জন বাগচী

চারদিন ধরে চলা অবিশ্রান্ত বৃষ্টি থেমেছে কাল। পাড়ার পুকুর উপচে জল নানাজায়গায় ছড়িয়ে পড়েছে। খেলার মাঠগুলো জলে ডুবে গেছে। তাই আজ অদিতিদের একমাত্র খেলা কলাগাছের ভেলায় চড়ে ঘুরে বেড়ানো। পাড়ার বন্ধু বরুণ কোথা থেকে একটা ভেলা আর দু'টো লগি জোগাড় করেছে। তাতে চড়ে ঢোলকলমির ঝোপের মধ্যে দিয়ে অদিতি, অর্ক আর বরুণ চলেছে। অর্ক, অদিতির ভাই। ওর হাফপ্যান্টটা একটু বড়ো বলে দাঁড়িয়ে দু'হাতে লগি ঠেলতে পারে না। অর্ক বসে-বসে ঠেলছে, বরুণ দাঁড়িয়ে। বরুণ যেতে-যেতেই অভিজ্ঞ কন্ডাক্টারের মতন বলে চলেছে একের পর এক শহরের নাম—"বরমপুর, কিস্নোনগর, বদ্দমান, সিলিগুড়ি, কলকাতা।" সেখানে সে কাল্পনিক সওয়ারি নামাচ্ছে, আবার তুলছে। অদিতি টাকার হিসেব রাখছে। হঠাৎ মেঘ কেটে চড়া রোদ উঠেছে। ওরা গাছের তলায় বিশ্রাম নিচ্ছে না, কারণ গাছগুলোতে এখন সব সাপ উঠে বসে আছে। নিচের জলে খেলা করছে অনেক মাছ। খলসে, ল্যাটা, শোল, তেচোখো, সরপুঁটি চেনা যায় নৌকায় বসেও। কেউ-কেউ বাড়ির বারান্দায় বসে মাছ ধরছে। এলোমেলো হাওয়ায় ঘন সবুজ পাটগাছের মাথাগুলো জল ছুঁয়েই আবার সোজা হয়ে উঠছে। অদিতির ইচ্ছে আরেকটু দূরে যাওয়ার, কিন্ত বরুণ মাঝি হিসেবে খুব কড়া। শুনেই বকা দিচ্ছে।
তন্দ্রামতো এসেছিল, ভেঙে গেল। এগুলো সবই বহু আগে ঘটে যাওয়া ঘটনা, ঠিক স্বপ্নও নয়। বেথুয়াডহরির বাড়িতে বর্ষাকালে ওরা অনেকবার ভেলায় চেপে এভাবেই ঘুরেছে।

পেছনের সিটে বসা মায়ের সঙ্গে কথা বললে হয়। সড়কপথে পুরো সফরটাই প্রায় চুপ করে কেটে যাচ্ছে। আজ অনেক চেষ্টা করেও অদিতি বাবা-মাকে দুই-তিনটির বেশি প্রশ্ন করতে পারলো না। পুরো সময় মা প্রায় চুপই বলা চলে। বাবা পেছনের সিট থেকে কয়েকবার মাথার চুলে বিলি কেটে একটু ঘুমিয়ে নিতে বললেন, তবে তা হয়তো মৌনতা ভাঙার জন্যই। অপ্রশস্ত হাইওয়ে গাড়ির ভিড়ে মন্থর। ওদিকে আবার মাঝরাতে বোম্বের ফ্লাইট, তাই অদিতির সন্ধের মধ্যে কলকাতায় ফেরার তাড়া আছে। হাইওয়ের সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করতে চালক মাঝেমাঝেই বেপরোয়া হয়ে উঠছে। পেছনে রয়ে যাচ্ছে কালো ধোঁয়া আর অনেকটা ব্যস্ততা।

এই পথেই প্রায় কুড়িবছর আগে ওরা তিনজন প্রথমবার চলেছিল বাসাবদল করতে। বেথুয়াডহরিতে অদিতি মাধ্যমিক অবধি পড়ার পর বাবা ট্রান্সফার নিলেন কল্যাণী। অদিতি পড়াশোনায় ভালো রেজাল্ট করবে, সেটা জেনেই। পরের আটবছর একটা পাঁচকাঠা জমির ওপর আম, লিচু, নারকেল, সুপারি, চাঁপা আর বেলিফুল ঘেরা একতলা বাড়িকেই ওরা নিজেদের ঠিকানা বলে জানতো। সেই ভুল ভাঙালো অদিতির জন্ডিস, চাকরির প্রথম বছরে। ও তখন কলকাতায় মেসে থাকে আর সপ্তাহান্তে বাড়ি আসে। অসুস্থ হওয়ার পর প্রথম বোঝা গেল, চাকরি করতে আবার পুরো পরিবারকে একছাদের তলায় দরকার। বাবা প্রথমে ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে চলে আসলেন বাগুইআটি। একবছর পর কল্যাণীর বাড়ি বিক্রি করে নিউটাউনে ফ্ল্যাট।

কর্মজীবনের প্রথম চারবছর সেখানে ভালোই ছিল। মধ্যবিত্ত কিছু পরিবার, বেশিরভাগ প্রতিবেশীই অবসরপ্রাপ্ত অথবা ষাটোর্ধ্ব। সকালে হেডফোন কানে চার-পাঁচপাক হাঁটাহাটি, অফিস সেরে তিনজন মিলে টিভির সামনে বসে রাতের খাবার। বছরে একটা করে সপরিবারে বেড়ানো, দুই-একটা উইকএন্ড টুর অফিসের বন্ধুরা মিলে। এক দুর্গাপুজেতেই, প্রস্তুতি আর বিসর্জন মিলে একমাস উৎসব। শীত পড়লে দুই-তিনটি পিকনিক। এভাবেই সামান্য কিছু সংখ্যার ওপরেই ছিল অগুন্তি আনন্দ। মাঝেমাঝে একটু বিবাদও হতো, কোন বাড়িটা ওদের আসল বাড়ি সেই নিয়ে। বাবার যেহেতু জীবনের সেরা সময় কেটেছে বেথুয়াডহরির পিতৃভিটায়, বাবা সেই বাড়ির বাইরে কিছু ভাবেন না। মনে করতেন এসব-ই ওঁর প্রবাস, একদিন আবার দেশের বাড়ি ফিরে যাবেন। আবার কল্যাণীর বাড়ি কেনা, সাজানো, গাছ লাগানো সবই হয়েছিল মায়ের অভিভাবকত্বে। তাই মা রায়গঞ্জের মেয়ে হলেও, কল্যাণীর বাড়ি ভুলতে পারতেন না। এই নিউটাউনের ফ্ল্যাট আবার অদিতির নিজের পছন্দ করে কেনা আর ইন্টিরিয়র ডিজাইনিং করে সাজানো। বাবা-মা'কে এখানে সে আগলে রাখে। তাই এখানে তার একাত্মতা অন্যরকম। যে-একাত্মতা পুনেতে ট্রান্সফার হয়েও অদিতি কাটাতে পারেনি। ঘরে ফিরে একেকদিন কেঁদেও ফেলতো। এক ছুটির বিকেলে আগা খান প্যালেসের সামনের লনে সায়নের কোলেও মাথা রেখে কেঁদে ফেলেছিল। সেই প্রথম সায়ন ওর চুলে হাত রেখেছিল। সেই দুইবছর সায়নের সঙ্গে নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করেছিল দীঘল আর বুদ্ধিদীপ্ত গড়নের অদিতি। দু'জনে একই পাড়ায় পেয়িং গেস্ট, অফিসও কাছেই। তাই সকালের হাঁটা, দুপুরের খাওয়া, সন্ধেবেলা কফিশপ সব একসাথে। সায়ন অবশ্য প্রস্তাব দিতে একেবারেই তাড়াহুড়ো করেনি। দু'জনে মারাঠি নাটক দেখতে-দেখতে, গোয়া বা মহাবালেশ্বরের পথে চলতে-চলতে অথবা লোনাভালার মায়াবী কুয়াশায় ওরা আবিষ্কার করেই ফেললো একদিন, একসাথে থাকার প্রয়োজনীয়তা।

কলকাতায় আত্মীয়স্বজন কম, বাবার ইচ্ছা ছিল দেশের বাড়িতেই মেয়ের বিয়ে হোক। ওদিকে আবার সায়নদের বাড়িও কাছে নয়, সিউড়ি। দু'জনের বিয়ে করার ছুটি সাতদিন। অগত্যা বিয়ের অনুষ্ঠান হলো কলকাতাতেই। আসতে পারলেন না বাবার ও মায়ের বাড়ির আত্মীয়স্বজনেরা প্রায় কেউই। কনেযাত্রীরা দুটি এসইউভি গাড়িতেই ধরে গেলেন। বাবা খুব কষ্ট পেয়েছিলেন। অনেক ধুমধাম করে বিয়ে দেওয়ার ইচ্ছা ছিল। বেথুয়াডহরির বনেদী পালচৌধুরি বাড়ির ছেলেমেয়েদের বিয়ে এভাবে হয় না। তবে অদিতির বহুবছর ধরেই সে-সব আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে তেমন যোগাযোগ ছিল না, কাকু আর বড়োমাসি ছাড়া। পিসি পিসেমশাইকে হারিয়েছেন অনেক বছর আগে। পিসতুতো ভাই অর্ক ছিল অদিতির চেয়ে দু'বছরের ছোটো, ও বলতে গেলে কাকুর কাছেই মানুষ। আগে অনেক কষ্টে দিন কাটলেও এখন স্ট্রিং থিওরি নিয়ে কানাডায়। গবেষণায় নামও করছে। ওখান থেকে এসে বারবার মা-কে নিয়ে যেতে চেয়েছিল, পিসি যায়নি। আগে যখন ও মুম্বাইতে গবেষণা করছিল, তখনও পিসি যায়নি। অকালবিধবা ব্যক্তিত্বময়ী পিসি বিয়েতে এসে, অদিতিকে পরিয়ে দিয়েছিল ঠাকুমার একজোড়া বালা। পরদিন সকালে সেই বালা দেখতে-দেখতে ও সায়নকে বলছিল ঠাকুমা-র গল্প। সায়ন অবশ্য তখন মগ্ন দু'মাস পরের ওদের ইন্দোনেশিয়ায় হানিমুন নিয়ে। সে-সময় কেটেছে স্বপ্নের মতো।

সায়ন বিচক্ষণ এবং মিশুকে ছেলে। বিয়ের বছরখানেক পর ওই বললো বাবা-মা'কে পুনেয় নিয়ে আসতে। তিনকামরার ফ্ল্যাট, বাবা-মা থাকলে সবারই সুবিধা। যতই ভালো দাম পাওয়া যাক, বাবা-মা আবার ফ্ল্যাট বিক্রি করতে চাইছিল না। ওদিকে কলকাতায় সেরকম কেউ নেই, তাই একসময় যেতেই হলো। আবার ওঁদের নতুন করে জীবন শুরু। এবার ট্যাংরা মাছ, মোচা, বাংলা কাগজ, রবীন্দ্রজয়ন্তীর মতো কিছু জিনিস বাদ গেলেও সেই শূন্যতা ভরিয়ে দিল কুহু। অদিতি-সায়নের কর্মব্যস্ত জীবনের সব ফাঁকফোঁকর ঢেকে দিলেন কুহুর দাদু ও দিদিমা। পুনের বহুতলেই বসেই কুহু শুনে-শুনে প্রায় মুখস্থ করে ফেললো 'আবোল তাবোল'। অদিতি আর সায়ন সপ্তাহান্তে ওকে নিয়ে যেত শপিং মলে। খেলনা বা জামাকাপড় কিনে দিতে, যেমন হয়। রবিবার রাতে সবাই মিলে ডিনার টেবিলে ফেসবুকের জন্য 'গ্রুপফি'। আজ মনে হয়, জীবনের ব্যক্তিগত মুহূর্তগুলো এত বেশি করে ছবিতে আটকে না-রাখলেও হতো। এখন একটা দিন মনে হলে, চোখের সামনে আগেই সেই ছবিগুলো চলে আসে। সেদিনের বলা কথা বা চিন্তাগুলো মনে পড়ে না। অদিতি সিদ্ধান্ত নিল, এবার থেকে
আর অত ছবি তোলায় মন দেবে না।

চারমাস আগে সায়ন যখন দুবাইয়ের বড়ো পেট্রোলিয়াম কোম্পানিতে চাকরি পেল, ওরা সবাই কী করবে বুঝতে পারেনি। টাকার অঙ্ক এতটাই বড়ো যে, না করা যায় না। সায়ন একা চলে যেতে রাজি নয়, মেয়েকে ছেড়ে। অদিতি রাজি নয় বাবা-মা'কে ছেড়ে যেতে। সায়ন দ্রুত সিদ্ধান্ত নিল, সবাই মিলেই দুবাই যাবে। অদিতি জানতো, বাবা-মা রাজি হবেন না। অনেক প্রস্ততি নিয়ে ও যখন বাবাকে বললো, বাবা চুপ করে শুনলেন। উত্তর না-দিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে উঠে গেলেন। নিজের মতামত জানানোর অভ্যাস ভুলতে শিখেছেন আগেই। নির্দিষ্ট সময়ে বাবা-মায়ের ভিসাও মঞ্জুর হলো। সায়ন নতুন কেনা গাড়ি পাঠিয়ে দিল সিউড়ির বাড়িতে। বেশ কিছু জিনিসপত্র বিক্রি করে দেওয়া হলো। একদিন হঠাৎ সন্ধেবেলা মা খেতে বসে কেঁদে ফেললেন, কল্যাণীর বাড়ির কথা মনে পড়ছে। খুব কাঁদতে-কাঁদতে জোর দিয়ে বললেন, "আমি শেষ জীবনে ওই মরুভূমির দেশে যাবো না।" কিছুক্ষণ পর বুকে ব্যথা। মাঝরাতে সুপারস্পেশালিটি আইসিইউ-তে নেওয়ার সময় ডাক্তার ওদের তেমন কোনো আশ্বাস দিতে পারেননি। দশদিন যুদ্ধের পর মা যখন ছাড়া পেলেন তখন মায়ের সব শক্তি সংঘবদ্ধ হয়েছে একটাই বাক্যে, "আমাকে তোরা ও দেশে আর নিয়ে যাস না।" দরকার হলে মা বৃদ্ধাশ্রমেও যেতে রাজি।

ওদিকে বাস্তবটাও দ্রুত বদলেছে। মা হাসপাতাল থেকে ফেরার পর দেখা গেল, দুবাইয়ে চাকরি জয়েন করতে সায়নের আর পঁচিশ দিন সময় আছে। ইতিমধ্যে যেতে হবে বলে অদিতি নিজের চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়ে বসে আছে, আর দিন সাতেকের মাধ্যেই রিলিজও পেয়ে যাবে। বাবা-মা'কে নিয়ে এই অবস্থায় ওই দেশে যাওয়া বিপজ্জনক। একে দুবাই চিকিৎসায় খুব বেশি এগিয়ে নেই, তার উপর আবার আকাশছোঁয়া খরচ। ওদেশের লোকেই ভারতে চিকিৎসা করাতে আসে। ইতিমধ্যে পুনের এই ফ্ল্যাট কেনার জন্য এক ভদ্রলোক ন্যায্য দামে আগ্রহ দেখিয়েছেন। যাওয়ার আগে এই দামে বিক্রি না-করার কোনো কারণ নেই। দুবাই থেকে এসে এসব করার সময় যে পাওয়া যাবেই, জোর দিয়ে বলা যায় না। সময় হলেও, দাম আরও কম পাওয়া যেতে পারে। সায়ন অবশেষে ভাবলো, পরিবার রেখে ও একাই যাবে কিনা। এবার বেঁকে বসলো অদিতি। বাবা-মা আর বাচ্চা নিয়ে চাকরি ছাড়া অচেনা শহরে সে থাকতে নারাজ।

শেষের কয়েকদিন অদিতি ঘুমের ওষুধের প্রভাবে অফিসে কাজেকর্মে ভুলও করতে লাগলো। এমন সময় একদিন সন্ধেবেলা বাবা জানালেন, উনি মা-কে নিয়ে বেথুয়াডহরি ফিরে যেতে চান। বাবা ওদের সঙ্গে পরামর্শ না-করেই কাকুকে বলেছিলেন একটা ভালো বৃদ্ধাশ্রমের খবর নিতে। শুনেই কাকু খুব পীড়াপীড়ি করছেন দেশের বাড়িতে ফিরে যেতে। বাবার ভাগের দু'টো ঘর এখনও রয়ে গেছে, আর পরের প্রজন্ম বড়ো শহরে চলে যাচ্ছে বলে বাড়িতেও তেমন লোকজন নেই আজকাল। সায়ন শুনে বললো, "পুনেতে হাইরাইজে থাকার পর আপনারা ওই গ্রামের পুরোনো দোতলা বাড়িতে থাকতে পারবেন?"
বাবা গভীর প্রশান্তি নিয়ে বললেন, "লাট্টু আমাকে ডাকার পর খুব আনন্দ পেলাম, জানো সায়ন। সৌভাগ্যবশত ভাইয়ের পরিবারের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক ভালো। সে তোমাদের কাছেও খুবই ভালো ছিলাম। তবে সত্যি বলতে কী আমি নিজেই বুঝিনি, এত তীব্রভাবে চেয়েছি বাড়ি থেকে আমার ডাক আসুক। তোমাদের এখন দৌড়ের সময়, আমরা সঙ্গে থাকলে তোমাদের স্পিডও তো কমে যাবে! তার থেকে ওর মা ভালো হোক, দু'জন মিলে মাঝেসাঝে ঘুরে আসবো। আর দুবাইয়ে তো দেখি সবাই আজীবন চাকরি করেও না! তুমিও হয়তো আরও ভালো চাকরি পেয়ে দেশে ফিরে আসবে, তখন আবার আমরাও ফিরে আসবো।"

গাড়ির জানালা নামিয়ে অদিতি ভাবছিল ফিরে আসা আর যাওয়ার পার্থক্য। একই সফর, অদিতি যাচ্ছে বাবা-মা'কে রেখে আসতে। বাবা-মা'য়ের কাছে এটা হয়তো ফেরা হচ্ছে। একযাত্রায় পৃথক ফল হতে নেই; একযাত্রার দুই নাম হলে কি বুঝতে হবে পথ আলাদা হয়ে যাচ্ছে!
কলকাতার এফ এম চ্যানেলের আওয়াজ আস্তে-আস্তে অপরিষ্কার হয়ে আসছে, একশো কিলোমিটার অতিক্রান্ত। তাতেও বোঝা যাচ্ছে ঘোষক ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস দিচ্ছেন। ধীবরদের বারণ করা হয়েছে সমুদ্রে যেতে, জল ছাড়ছে ঝাড়খণ্ডের বাঁধগুলি। রাস্তায় গাড়ি কমে এসেছে। পূর্বের আকাশ পরিষ্কার, পশ্চিমে ঘন কালো মেঘ। দূরে যেখানে বৃষ্টি হচ্ছে, সেখানে মেঘের কালো রঙ ধুয়ে এসেছে
জলরঙের মতো। ঘন সবুজ পাটক্ষেতের ওপর দিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে চলেছে কিছু বুনো বক আর শামুকখোল। এখনও চাষের মাঠ জলে ডোবেনি। আর একমাস পর এলে দেখা যাবে, দু'পাশের চাষজমিতে ভেজানো আছে পাট। যেগুলি জাঁক দেওয়া হয়ে গেছে, তা থেকে তন্তু বের করে পাটকাঠি আলাদা করা হয়েছে। শুকনো পাটকাঠির বান্ডিল হাইওয়ের পাশে, পুড়ে যাওয়ার অপেক্ষায়। হয়তো জ্বালানি হয়ে কিংবা পুজোর যজ্ঞে। সেই
সারি চলবে কয়েক কিলোমিটার। এই বন্যায় নাকি বাবার দেশের বাড়ি প্রায় কুড়িবছর পরপর একবার ডোবে। যে-বছরে ডোবে, সেই বছরে নাকি পালচৌধুরি বাড়িতে আত্মীয়বিয়োগ হয়। দু'হাজার সালের বন্যার পর অকালে মারা গিয়েছিলেন পিসেমশাই, আটাত্তর সালে চলে যান চলে যান ঠাকুমা, পরের বছর দাদু। তার আগের বড়ো বন্যায় দাদুর ভাই, ছোটদাদু। এসবই কুসংস্কার, তাও অদিতি কেঁদে ফেললো। সে-আওয়াজের যেটুকু বেরোলো, তাও নিভৃত রইলো বৃষ্টির শব্দে।

পিসি, কাকু আর কাকিমা ছাতা নিয়ে দাঁড়িয়ে গলির মুখে। বৃষ্টির ছাঁট আর কম আলোয় দিনেও চেনা যাচ্ছিল না, তবে গাড়ি দেখে উৎসাহভরে এগিয়ে আসার গতি দেখেই নিজের লোক চেনা যায়। ওঁরা একে-একে ছাতা দিয়ে অদিতিদের বাড়ি নিয়ে যেতে থাকলেন। গলিটা বাঁধানো, তবে এখনও পিচ পড়েনি। পাড়ার প্রতিবেশীরা গাড়ি থেকে ব্যাগ নামিয়ে ঘরে পৌঁছে দিচ্ছে, বাবাও গল্প শুরু করে দিয়েছেন। বাড়িটা সাবেকি হলেও কাকুরা রঙ করে সুন্দর রেখেছেন। এখনও দুর্গাপুজো হয় নাটমন্দিরে। নাটমন্দিরের সামনে প্রণাম করতেই অদিতির চোখ আটকে গেল বাইরের দেওয়ালের রঙে। সব দেওয়ালেই হলুদ রঙের গায়ে, মাটি থেকে প্রায় পাঁচফুট উচ্চতা অবধি সোজা দাগ, যেন কেউ লাইন টেনে দিয়েছে। তার নিচের অংশের রঙ ঈষৎ গাঢ় হলুদ, ওপরে হালকা। অদিতি পিসিকে বললো, "পিসিমণি, এখানে এরকম স্ট্রেট দাগ হয়ে আছে কেন?"
পিসি তাকিয়ে বললেন, "ওটা তো বন্যার জলের দাগ রে! গেল বন্যায় সেই যখন তোর পিসে চলে গেল, তখন অতদূর জল উঠেছিল। তারপর আমরা দু'বার প্লাস্টার করিয়েছি,
কিন্ত দাগটা যায়নি। আসলে ইটের ভেতর ড্যাম্প চলে গেছে। ওদিকে বাড়িতেও দ্যাখ না, দেওয়ালের গায়ে দাগ দেখতে পাবি একই হাইটে।"
মনে পড়ে গেল ছোটোবেলায় কাকু বলেছিল, বন্যার জল নাকি বাড়তে-বাড়তে অনেক উপরে যায়, তবে ততদূর দাঁড়ায় না। অনেকটা নেমেও আসে। নেমে এসে একজায়গায় স্থির হয়ে থাকে অনেকদিন। সে পাঁচদিনও হতে পারে আবার পনেরো দিনও হতে পারে। তারপর আবার বয়ে চলে যায়। সে হয়তো উত্তরের কোনো নদীর বয়ে আনা জল, অনেক কূল ভাসিয়ে অনেক ঘর ভেঙে বিশ্রাম নিয়েছিল কিছুদিন। সমচ্চোশীলতার নিয়মে জল নেমে গেছে, কিন্তু স্বাক্ষর হিসেবে রেখে গেছে নিজের স্থিতির চিহ্ন। সবাই স্মৃতি হিসেবে এক স্থিতির মুহূর্তই ধরে রাখতে চায়।

মা আলতো করে হাত ধরে হাসিমুখে বললেন, "কী রে বুকুন, তুই আবার কী ভাবতে বসলি!" 
অদিতি বহুবার লক্ষ করেছে, মায়ের হাসিটা বড়ো নিষ্পাপ। বহুবছর হলো, এমন হাসি অদিতি ভুলেছে। হাসিটা দেখে মনে হলো, এবার অন্তত বন্যা হবে না।
ও জড়িয়ে ধরলো মা-কে।


Comments