সমরেন্দ্র মণ্ডল

বছর ফুরোলো। দিনপঞ্জির পাতা ছিঁড়লো। দেওয়ালে চিত্র-বিচিত্র নতুন দিনপঞ্জি ঝুললো। কিন্তু কিছু বদলালো কি? কই, কিছুই তো বদলালো না! যা ছিল, তাই থাকলো। বছর-বছর যেমন থাকে আর কী! বদলেছে শুধু একটাই। ওই যে কী বলে, বিশেষ নিবিড় সংশোধন। যতই তারিখ এগোয়, দিনপঞ্জির পাতা খসে, সংশোধন-বাবুদের ধ্যাস্টামো বাড়ে।

অর্বাচীন ভাবে, এই ধ্যাস্টামোর মানে কী? আমি বাপু এদেশে জন্মেছি, বড়ো হয়েছি, চাকরি  করেছি, বউকে নিয়ে বাজারের টাটকা-বাসি খেয়ে এখনও বেঁচে আছি, বছর-বছর ভোট দিয়েছি, তা এখন আমায় বলতে হবে "এই দেশেতেই জন্ম আমার..."। তুমি না-হয় ঠিক আছো, তোমার বাপের নাম মিলছে না। তাও না-হয় মিললো, কিন্তু তোমার নামের বানান ভুল। তুমি অর্বাচীন না আর্বাচীন, সেটা আগে প্রমাণ করো। তা প্রমাণ না-হয় হলো, তা নামের সঙ্গে 'চীন' কেন? তুমি সন্দেহজনক।

ধুত্তোর, নিকুচি করেছে তোর বিশেষের!

এই প্রবল শীতে চাদরের ঘেরাটোপে অর্বাচীন বাজারের দিকে এগিয়ে যেতে-যেতে দ্যাখে, মানুষ উদাসীন, নির্লিপ্ত। যেন পৃথিবীতে কোথাও কিছু ঘটছে না। একমাত্র শীতই সত্য। উদাসীনতাই পরমংতপঃ।

অর্বাচীন হাঁটে আর ভাবে, গিন্নি ফুলকপির খিচুড়ি খাবার কথা বলেছিল। ঠিক বায়না নয়, আলতো করে ছুঁড়ে দিয়েছিল। খিচুড়িতে শুধু কপি দিলে তো হবে না, সঙ্গে মটরশুঁটি, ছোটো আলু, ছোটো গোটা পিঁয়াজ। ওহো, একটু ঘি-ও তো চাই! সে-সব তো না-হয় হলো। কিন্তু কপির দাম তো নামছে না। সেই যে তিরিশ টাকায় উঠে বসে আছে, নামার আর নাম নেই!

ভাবতে-ভাবতে চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে এক মৃৎপাত্র চা নিয়ে সুড়ুৎ করে গলায় চালান করে, বেশ আরাম বোধ করলো। চায়ের ভাঁড় ফেলে যেই পা বাড়াবে, দ্যাখে সামনে বাঁকাদা। এমন সোজা লোকটার নাম কী করে যে বাঁকা হলো, সেই গূঢ় রহস্যের সমাধান না-করেই এক পা বাড়াতে প্রশ্ন ছুটে এল, বাজারে চললেন?
খ্যাঁক করে উঠলো অর্বাচীন, ভাবছিলুম।
—আজ বেশ বড়ো সাইজের ফুলকপি উঠেছে। স্নোবল।
—মানে সাদা জুঁই ফুল? ও মোটেই ভালো কপি নয় মশাই।
—তার মানে আপনি বলছেন, আমি ঠিক কপি কিনিনি?
—ঠিক মানে? সবটাই বেঠিক। তবে ল্যাটা মাছ দিয়ে ঝোল খেলে মন্দ হবে না।
কী যেন ভাবলেন বাঁকাদা। তারপর থুতনিটা নিচের দিকে ঝুলিয়ে দিয়ে বললেন, হতে পারে।
—হতে পারে না, হতেই হবে।
বাঁকাদা গায়ের চাদরটাকে সাবড়ে নিয়ে অর্বাচীনের দিকে চোখ ছুঁড়ে বললেন, কড়াইশুঁটির কচুরি। চলবে নাকি?
অর্বাচীন কাচের বাক্সের ভিতর এলোমেলো পড়ে থাকা কচুরির দিকে মোলায়েম চোখে তাকিয়ে বললো, বলুন দুটো।
 —চীনবাবুকে দুটো দাও।
হাতে শালপাতার বাটি পড়তেই কচুরিতে মন দিল অর্বাচীন। একটা উদরসাৎ হয়েছে কি হয়নি, চোখ তুলে দ্যাখে বাঁকাদা 'গন' মানে হাওয়া। তা যাক। যে-চুলোয় যাওয়ার যাক। দামটা দিয়ে গেলেই হলো। অর্বাচীন নীলরঙের মাথা কাটা ড্রামে শালবাটি ফেলে, হাত ধুয়ে, দু'ঢোক জল গলায় ঢেলে দোকানির সামনে দাঁড়ালো। বললো, দাম তো দিয়ে গেছে।
—না দেয়নি।
—দেয়নি?
—বলে গেলেন, আপনি দেবেন।
অর্বাচীন বুঝলো, সে ফেঁসে গেছে। বাঁকাদা আসলে শরীরে নয়, মনে বাঁকা। অগত্যা চারটে কচুরির দাম নগদ আটাশ টাকা সক্কাল-সক্কাল গচ্চা দিয়ে বাজারের দিকে হাঁটা দিল। পথে দু'বার কচুরির ঢেঁকুর তুললো। নাঃ, আর দেরি করা উচিত হবে না। পথে না আবার কোনো সোজাদা, মোটাদা, কেলোদা, ধলোদা ধরে ফেলে! পথে কোনোদিকে না-তাকিয়ে ডানহাতে থলি ঝুলিয়ে, বাঁহাত পকেটে ঢুকিয়ে একটা সিগারেট ধরাবে কি ধরাবে না ভাবছে, তখনই পাঞ্জাবির খুঁট ধরে কে যেন টান মারলো।
—কে রে!
পিছন ফিরতেই দ্যাখে জগা। বায়বীয় জগাকে দেখেই  অর্বাচীনের চোখ গোটা হয়ে গেল, আবার কী মতলবে?
—দিল তো? সক্কালবেলায় দিল তো? বাঁকাবাবুকে চিনলেন না মশাই! ওই দেখুন মাছওয়ালার সামনে রেখে যাওয়া  মাছের কালো পলিথিন  নিয়ে কেমন হেলতে-দুলতে বাজার থেকে বেরিয়ে যাচ্ছেন।
—দাঁড়া, ওকে এখনই ধরছি।
—কিস্যু লাভ হবে না মশাই। আগে প্রমাণ করতে হবে, মাছটা ওর নয়। যেমন আপনাকে প্রমাণ করতে হচ্চে আপনি ভোটার কি ভোটার নন। দেশের নাগরিক কি নাগরিক নন। সব এসআইআর-এর চক্কর মশাই, বুইলেন?
অর্বাচীন কী যেন ভাবলো, তারপর জগার দিকে তাকিয়ে  ছুঁড়ে দিল, ধুত্তোর!

Comments