ছোট্ট-ছোট্ট পাতিলেবুর মতো খুশি ফলতো তখন। কারণে-অকারণে ফুলেফলে রসেবশে টসটস মন। জাতিপ্রেম বা জাতিবৈরিতা কোনোটারই ধার না-ধেরে একবাক্যে ইউরোপীয় নববর্ষকেই নিজের ভেবে নিয়েছিলাম। একদম নিজের। আর সত্যি বলতে কী—দেশের কোনটি নিজের উৎসব আর কোনটি সাহেবদের, এতসব বোঝার বয়স ছিল না তখন। তখন সাহেব বলতে বুঝতাম ভারতের বাইরে যে-কোনো একটি দেশের যে-কোনো এক হদ্দ ফরসা মানুষ এবং তাঁদের উৎসব মানেই প্রচুর পরিমাণে কেক-বিস্কুট আর নানারকম মানুষের সমাহার। শুধু মুসলমান বা শুধু হিন্দু নয় বা শুধু এই দুইয়ের 'ভাব-ভাব' কিংবা 'ঝগড়া-ঝগড়া' নয়।
ঠাকুরদা অশোক ছিলেন ইংরেজি নববর্ষ নিয়ে এক্কেবারে উদাসীন। ফলে এই দিনটিতে কাক জাগার আগেই ভাব করতাম বাবার সঙ্গে। দুমদাড়াক্কা—লেপের মধ্যেই গলাফলা জড়িয়ে। যাতে আমাদের গোপন শলা তুলোয় ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসে বাবা আর আমার মাঝেই। লেপের বাইরে মা-র কানে না-পৌঁছোয়।
দুপুরে শ্যামবাজার মোড়ে বাবার সঙ্গে আমার প্রথম যে-ঝামেলাটা শুরু হতো, তা ছিল কেক খাবো না বিস্কুট? আমি চাইতাম ব্রাউন পেপারে মোড়া বাপুজি কেক। বাবা কিনে দিতেন একটি বিশাল টিনের বাক্সভর্তি বিস্কুট। বাক্সটার ওপর বেগুনি কভার আর তাতে একটি গোলাপি ফুল। ভেতরে আবার অনেকগুলো ছোটো বক্স। এক-একটা বক্সে এক-একরকম বিস্কুট। আমাদের বাড়িতে তখন ওপারবাংলা থেকে অনেক কাকা-পিসি এসেছেন। বাবার সাফ কথা, বাড়ি ফিরে সবাইকে একটা করে বিস্কুট দিবি।
বাবার এই ভাগের থিওরিতে গজরাতাম। গজরাতে-গজরাতেই আমিনিয়া। ঢোকার মুখেই শাসাতাম—বাবা আমি কিন্তু সব খাবার প্যাক করে বাড়ি নিয়ে গিয়ে শান্তি করে খাবো। অনেকক্ষণ ধরে চেটে চিবিয়ে খাবো। খেয়ে-খেয়ে পেটটা মোটা করে ফেলবো। তবু একা খাবো। সেদিনের রাক্ষুসে বাচ্চাটাকে আমার বাবা মনোজ মিত্র মশায়ের কঠোর নির্দেশ ছিল—যাও, সবার মাঝে গিয়ে বোসো। তারপর সবাই কী খাচ্ছে লক্ষ করো। তারপর ঠিক করো তুমি কী খাবে। খেলে ওদের মতো করে কিছু খাও। তোমার খাওয়ার পরিমাণ যেন বাকিদের মতো হয়। গোঁজ হয়ে থাকতাম। ঝাপসা চোখের সামনে নেচে বেড়াতো আমিনিয়ার লাল টমেটোমাখা মুরগির পা।
লালসা হতো গা। বড়ো লালসা। খালি ভাবতাম, আমি কেন একা খাবো না দশ মুরগির কুড়িটা পা? পেটে যখন ধরে যাবে কুড়িটা—কেন খাবো একটা? কেন খাওয়াতে এনে বিট্রে করছেন বাবা? কেন?
কেঁদে ফেললাম একবার। আলতো করে আমার মুখটা তুলে দেখালেন চারপাশ। আমারই পাশের টেবিলে এক সাধারণ মুসলিম তাঁর অনেকগুলো সন্তান নিয়ে খেতে বসেছেন। এক-দু'প্লেট বিরিয়ানি সবাই মিলে ভাগ করে খাচ্ছেন। কী তৃপ্তি তাঁদের মুখে! নতুন বছরের প্রথম দিনে আমিনিয়ার বাইরে তখন জুটে গেছেন কত ভিখিরি। হয়তো আশা, বাড়তি খাদ্য আজ নিশ্চয় বাড়বে।
কান্না মুছে আমি চুপ। সেই আমার দেশ বোঝার শুরু। দেশের মানুষকে বান্ধব ভাবার শুরু। আজও দেখি ফাঁকা পেটে চিল্লায় মস্ত নেকড়ে—যে সর্বকালের এবং সর্বমানবের।
খিদের মিল অন্তরের মিল।
তাই অন্তেও মিল।
কলমের সর্পবিষে চিরে ফেলি হিন্দু-মুসলিমের গোলমিল।
সেদিন আমাদের মালী ঝন্টু ছেলেকালের এ-গল্প শুনে বললে—দিদি বিরাট আম্রগাছের তলায় তৃণগাছ বাঁচে না গো। সেথাকার জমিন ফাঁকাই থেকে যায়। এসো তোমার জন্য নতুন বর্ষে ছাদে পড়ে থাকা ভাঙা ক্যাম্পখাটে এক সবুজ লতা বুনে দি। চারদিক মুড়ে-মুড়ে লাউপাতার তোষক বানিয়ে দেব দিদি।
আমি বলি—ভাঙা টিনের ক্যাম্পখাটে লতার বিছানা? এ কী করে হয় ?
লম্বা শরীর দুলিয়ে মালী বলে—ভাঙা হলেও ক্ষেত্র সমান। বড়ো নেই তাই ছোটো বাঁচবে দিদি। তাতে পোষের রোদ যেমন খেলবে চাঁদও তেমনি—একেবারে একপাত্তর করে | দেখো তুমি—
হা-হা। ঝন্টু বড়ো শুদ্ধ ভাষায় কথা কয়।
ভাঙা ফার্নিচারে উপন্যাস গড়ে।
বেশ করে গা।
Comments
Post a Comment