মানুষের কাছে নিজের শহর বলতে যতটা ভৌগোলিক মানচিত্রের পাতায় অবস্থানের, তার থেকেও অনেক বেশি স্মৃতির পাতায় জায়গাটির অবস্থান। নিজের শহর-দেশ-গাঁ একান্ত নিজের মাটিটুকুর কথা মানুষ যতই পরিণত হয় ততই সঙ্গোপনে লালন করতে থাকে মনের গহিনে। নিজের বেড়ে ওঠার আলোর বিচ্ছুরণ যে-পথে পড়ে থাকে, মানুষের মন পড়ে থাকে সেই পথেরই প্রান্তে। বেড়ে ওঠার বাঁকে পড়ে স্কুল-কলেজ-খেলার মাঠ-গলি-রাজপথ ধরে হাঁটা দিনগুলো আর অনুভব করা ভালো বা মন্দ সম্পর্কগুলোর নীরব অবস্থান। নিজের মাতৃভূমি ছেড়ে যারা কর্মজীবনে বাইরে যায়, তারাও কোনও একটা বয়সে এসে অনুভব করে, ছেড়ে যাওয়া মানেই দূরত্ব নয়; আরও গভীরভাবে ফিরে আসা।
আমার জন্ম ও বেড়ে ওঠা এমন এক ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক শহরে, যা ঐতিহ্য আর আধুনিকতার মেলবন্ধনে পশ্চিমবঙ্গের নদিয়া জেলার সদর এবং প্রাচীন বাংলার শিক্ষা-সংস্কৃতির এক উল্লেখযোগ্য পীঠস্থান। কৃষ্ণনগর রাজার শহর। এর আগে নাম ছিল রেউই। রাজা কৃষ্ণচন্দ্র ছিলেন নদিয়া রাজপরিবারের শ্রেষ্ঠ পুরুষ এবং সংস্কৃত ও ফারসি ভাষায় শিক্ষিত। তিনি শাক্তপদাবলীর রামপ্রসাদ সেন, অন্নদামঙ্গল প্রণেতা রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র, গোপাল ভাঁড়—এঁদের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। জগদ্বিখ্যাত জগদ্ধাত্রী পুজো ও মৃৎশিল্প রাজার উদ্যোগেই শুরু হয়েছিল।
এহেন শহরের অলিগলি, পুজোপার্বণ, উপেক্ষা-বঞ্চনা, আদর-প্রেম-স্নেহাশিস, শোক ও সন্তাপে জড়িয়ে রয়েছে এই ক্ষুদ্র জীবন। মধ্যচল্লিশে পৌঁছে শুধুই ফিরে দেখা অতীতকে, যার গায়ে লেগে আছে আমার শৈশব-কৈশোর-যৌবন। বিষণ্ণ দুপুরে কোলাহলহীন এক শান্ত ছায়ায় আষ্টেপৃষ্টে ধরে কত-কত সম্পর্ক, আত্মীয়তা, পড়ার টেবিলে মায়ের রক্তচক্ষু, দাদুর হাত ধরে সকালে পুজোমণ্ডপে যাওয়া, সরস্বতী পুজোর সকাল, জগদ্ধাত্রী পুজোর আড়ম্বর; এসবই শিকড়বদ্ধ করে রেখেছে। স্মৃতিকথাতে মনে পড়ে, ছোটোবেলায় বই পড়ার আগ্রহ দেখে দাদু পাবলিক লাইব্রেরির শিশুবিভাগের সদস্য করে দেন সেই ক্লাস ওয়ানেই। স্মৃতিতে আজও অমলিন হলঘরে দেখা বিশালাকায় কাঠের গোল টেবিল, যেখানে নিবিড় অধ্যয়নরত মানুষদের দেখে আর পাঠকক্ষের নিস্তব্ধতা দেখে ভয় করতো সেই শিশুবেলায়। বড়ো হয়ে জেনেছি, সে এক ঐতিহাসিক জায়গা; আর পাঠকক্ষটি তদানীন্তন মহারাজ শ্রীশচন্দ্রের নামানুসারে নামাঙ্কিত। সেইসময় মাঠের বামদিকে একটি সভাগৃহ ছিল, যেটি এখন পার্ক মতো করা হয়েছে আর পাবলিক লাইব্রেরিটি দোতলা বাড়ি হয়ে অত্যাধুনিক সজ্জায় সজ্জিত হয়েছে। ইতিহাসকে এখানে যেন ছুঁয়ে থাকা যায়। গোল টেবিলটি স্পর্শ করলে সেই ওয়ানে পড়া শিশুবেলাকে যেন চমকে উঠতে দেখি। জলঙ্গির পাড়ে অবস্থিত এই শহরের বহমানতা ঠিক যেন নদীরই মতো। কত-কত স্মৃতি সে বয়ে নিয়ে চলেছে অনির্দেশ্যের পথে। নদীর ঘাটের সিঁড়িতে, চায়ের দোকানে, পোস্ট অফিসের মোড়ে, রাজবাড়ির মাঠে কত-কত কবির জন্ম হয়েছে; কত আন্দোলনের জনক এ-শহর, কত গল্প কত ইতিহাস বলে শেষ নেই। কৃষ্ণনগর বরাবরই সাংস্কৃতিক শহর। এখানে সাহিত্য আলাপের বিষয়, চাপিয়ে দেওয়ার নয়। এখানে শিক্ষা-সাহিত্য-শিল্প-রাজনীতি-চলচ্চিত্র-বিনোদন একসঙ্গে শ্বাস নিতে কোনোদিন হাঁফিয়ে ওঠেনি। ছোটোবেলায় পাবলিক লাইব্রেরি যাওয়া আসার পথে দেখতাম ধবধবে ধুতি-পাঞ্জাবি পরা শান্ত-সৌম্য মানুষ কয়েকজন একধারে টেবিলে নিবিষ্ট। বড়ো হয়ে তাঁদের পরিচয় জেনেছি—অধ্যাপক সাহিত্যিক সুধীর চক্রবর্তী, মোহিত রায়। এই শহর রত্নগর্ভা শহর, বহু নামী কবি-লেখক বুদ্ধিজীবীদের জননী ও আশ্রয়দাত্রী। এই শহরের প্রতিটি পদক্ষেপ শিক্ষার বীজে পূর্ণ।
যেহেতু রাজার শহর, বনেদিয়ানা থাকবেই। আজ আড়ম্বর বহুগুণ বাড়লেও ঐতিহ্যে অমলিন রাজপরিবারের জগদ্ধাত্রী পুজো। মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রই বঙ্গদেশে প্রথম জগদ্ধাত্রী পুজোর প্রবর্তক, সে-কথা ইতিহাসবিদরা মেনে নিয়েছেন। এখন রাজার প্রাসাদ ছাড়িয়েও জগদ্ধাত্রী মায়ের পুজো হয়ে উঠেছে কৃষ্ণনগরের নিজস্ব উৎসব। মহারাজা প্রবর্তিত বারোদোল মেলা আকারে-আয়তনে বহুগুণ বাড়লেও আজও একই মহিমায় আছে। কৃষ্ণনগর রাজপরিবার যেমন ক্ষমতা ও শাসনের কেন্দ্র ছিল, তেমনই শিক্ষা-সাহিত্য-শিল্প ও শহরের চরিত্রনির্মাণের কারিগরও ছিল।
এই শহরের উপকন্ঠে ছোট্ট জায়গা ঘূর্ণি, যেখানে মৃৎশিল্প জেগে উঠেছিল রাজারই পৃষ্ঠপোষকতায়। আজ শিল্পীরা দেশে-বিদেশে খ্যাতি অর্জন করেছেন মাটির কাজে দক্ষতা দেখিয়ে। এ পরম গৌরবের জায়গা। স্মৃতি হয়ে জেগে থাকা অভ্যাস আসলে আমাদের মজ্জায় মিশে। শিল্পীদের হাতের সূক্ষ্মতা ও কারুকার্য বিন্যাসে এই লোকশিল্প ভারতবর্ষের অন্যতম একটি প্রধান কুটিরশিল্প। প্রদীপের নিচের অন্ধকারের মতো শিল্পীদের দুর্দশা তবু ঘোচে না। কৃষ্ণনগরের শিল্পীদের কাজে মুগ্ধ ছিল ইংরেজরাও। সাধারণত দশ টাকা থেকে শুরু হয়ে কয়েক হাজার অবধি দাম হয়। জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত শিল্পীদের তৈরি পুতুলের দাম তুলনামূলক বেশি। ইতিহাস-ঐতিহ্য এই শহরে জনজীবনের সঙ্গে এতটাই সম্পৃক্ত হয়ে আছে, যা নদীবিধৌত ছোট্ট জনপদটির প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মানুষের অনুভূতি বিশ্বাস ও সময়ের সাক্ষ্য দিয়ে চলছে।
শহর শুধুমাত্র একটা জায়গার নাম নয়, সেখানকার মানুষের অনুভূতির এক নীরব দ্যোতনা। শহরের সঙ্গে-সঙ্গে বয়ে চলা ঘটনাপ্রবাহই মানুষের জীবনদর্শন, যা সেই অতীতের সঙ্গে বর্তমানের সামাজিক পারস্পরিক ফারাক সূচিত করে। ছোটোবেলায় দেখা প্রায় গ্রাম্য জায়গা ঘূর্ণির আজ অনেক উন্নতি হয়েছে। সরকারি আনুকুল্যে রাস্তাঘাট, কল, যোগাযোগ ব্যবস্থা সবই পাল্টে গেছে। ঘূর্ণির কুমোরটুলির তৈরি প্রতিমা আজ বিদেশে পাড়ি দিচ্ছে, এটা শিল্পীদের কাজের পুরস্কার। তবু অনেক কষ্টেই চলে তাদের আজকের জীবন। এর মধ্যে জলঙ্গির প্রবহমানতা ক্ষীণ হয়েছে। তবু কিছুই হারায় না, সব আলোই লুকিয়ে থাকে রাতের তারার গভীরে আর আমাদের চলে নিরন্তর অন্বেষণ। নিজের চোখ দিয়ে নিজের অনুভব দিয়ে আমৃত্যু খুঁজে যাই নিজের ফেলে আসা পথ!
(ক্রমশ)
Comments
Post a Comment