তাপসী লাহা

অশ্রুত নদী দীর্ঘদেহী জলপুরুষের রাতে মিশে যাচ্ছে, যমুনা তীব্র ঠকে যায় জলগহনের শঠতায়। তার ভেতরের আলো, স্কন্দমালা সমেত জলরাশির নিপুণ ছায়া সরবের মতো কথা বলে বেড়ায় মায়াবী কুজ্ঝটিকায়। কারা আসবে আজ এই বাদরের অপেক্ষমান রাতে! কারা শুনবে অনসূয়ার বিরহী গীত, বিনোদবেণী ঝুলিয়ে চিরঅশ্রুরতা প্রেয়সী সন্ধ্যার শেষপ্রহরের হুতাশ মাখিয়ে পরিবেশন করে অমোঘ লয়কার, কী অপূর্ব অমোঘ তীব্রতায় এই ফনকারা বিমোহিত করে রেখেছে পূর্ণমাসের তীব্রগর্ভা শ্রাবণের অস্হিরতাকে। সেই অস্থিরতা ছুঁয়ে গেছে শহরের সব চেনা-অচেনা মহল্লা, কানাগলির মুখে, ভিন্নবেশ নারী, ভিন্নদেশ থেকে সমাগত সে-সব তৃষ্ণাতুর কালা, মুখাবয়বে বিরহ ও অপেক্ষার আঁধার ও মিলনের বুনো তিতিক্ষায় বাক্য নিমরাজি অভিমানের রাশভারী, জমাট চাউর খুলে মেলে ধরতে। আজ আর নেক সওদায় নয়, ছিনিয়ে নেওয়ার তাড়নায় তীব্র বিষ ঢেলে উগড়ে দেবে সাকির মনমদিরায়, প্রেয়সীর ভগ্ন-বিরহী হৃদয়ের খোঁজ নেওয়ার উপলক্ষে নয়, আজ মেহফিল সেজেছে পাওনা কড়ায়গণ্ডায় বুঝে নেওয়ার, তরিবত গ্লাসে সুরা উপচে পড়ে অহরহ, অদূরে ঘনঘন মেঘের গর্জন পুরুষ উষ্মার রঙ মেখে ধূসর কালচে ফণায় আসর মাপছে সন্ত্রস্ত করার অভিপ্রায়ে। আজ কারা আগমনের কথা বলবে, খুশির বাইরে লিখবে মিলনগীতি, ফুলে-ফুলে সাজাবে রাসনিকেতন, নাগরের হেঁটে আসার পথে পদতলে বিছিয়ে দেবে কুঞ্জফুলের বিছানা, কদমের মালা গেঁথে কে পরাবে গলে, কারও হাতে সুরভিত রজনীগন্ধার বেড়ি দেখা যাচ্ছে, গ্লাসের কানা ঘেঁসে উপচানো সুরারস গলে পড়ছে সঘন রাত্রির নিবিষ্টতায়। রাত ফণা তুলছে নিষ্ঠুর পুরুষের রূঢ় দেহভাষায়, কৃষ্ণশীল প্রেমে মজে থাকা প্রেয়সীর বরাদ্দ রুখাসুখা মনের পেশিবহুল জানবি। হয়তো মন আছে, হাসি ছলকায় আনুগত্য ও নির্ভার অজস্র প্রদর্শনের মাঝে, তবু এক কঠিন দৃষ্টি স্থির ধরে রাখে তার সমগ্র সত্তাকে। ভালো সে বাসে কি? কখনও তো মনে হয়। চলে যায় কেন? মেলে না উত্তর। শুধু কথার অভাব পূরণ করে গলায় দলাপাকানো অভিযোগ আর তুচ্ছতাচ্ছিল্যের বাহারি প্রদর্শন। একজন অভিযোগের ঝুলি নিয়ে দণ্ড দেওয়ার ভঙ্গিতে প্রেমকে কাঠগড়ায় তুলে রেখেছে, অপরপক্ষ এই বিশ্বাসের টালখাওয়া, ভালোবাসার মানুষের চেয়ে প্রবঞ্চকের কথায় অহম প্রধান, পরাজিত প্রাণপুরুষের আচরণে যারপরনাই মর্মাহত, অন্তরে ছিন্নভিন্ন, দেহ থেকেও সমগ্র অস্তিত্ব হারিয়ে যায় আপনজনের থেকে প্রাপ্ত আঘাতে। তবু লড়ে যায় আত্মপক্ষ সমর্থনে। মন বলে সে রাজি হবে, একটুখানি মান-অভিমান। চোখের বাঁধ যে ভেঙেছে, ধুয়ে দেবে সন্দেহের রূঢ় বালুকণা তার মন থেকে, আবার ঠিক হবে সব আগের মতো ঝর্নার জলের মতো কুলকুল ধারায় সঙ্গীতের দ্রুত মূর্ছনায় বেজে উঠবে যুগলযাপনকাল। হাতগুলো জুড়ে যাবে কাছে আসার মুহূর্তে, সমর্পিত হবে প্রবল মুহূর্তটি ভালোবাসার তাড়নায়। সঙ্গীত তীব্র হতে থাকে উত্তেজনার মতো, সেতারের ঝঙ্কারে এই বুঝি নরসুন্দর ও নদী মিলে যাবে দোঁহে, বুঝবে সমর্পণের এইসব সুরা, শৃঙ্গার অজুহাত, ছলনা নয়, প্রকৃত অনুরক্তার প্রার্থিত পুরুষের প্রতি আত্মনির্গত ভজনা, ঈশ্বর যেমন সুকঠিন বেদীতে অপেক্ষমান থাকেন ভক্তকে ভালোবাসা প্রদর্শনের সুযোগ দিতে। দুরুদুরু বুকে সমস্ত উপচার সঠিক পদ্ধতি মেনে সারতে নিবৃত্ত পূজারিণী।

ভেঙে যায় গ্লাস। শীতল, কঠিন ছোবলের ধর্ম মেনে কাচপাত্র ভেঙে যায়, ভেঙে দেয় রাগের সংলাপ। বাঁধ আবার ভেঙে যায়। ছিঁড়ে যায় হৃদয়ের সংবেদী তারগুলো প্রবল নির্মমতায়। অসহায় বিধিলিপি চেয়ে দ্যাখে প্রত্যাখ্যানের দৃশ্য। মড়মড় শব্দে ভেঙে পড়ে পায়ের জোর।দূর থেকে শেষবারের মতো দেখা হৃদয়ের কাঠিন্যের শেষ লাগাম পরিয়ে ভরা শূন্যতার প্রাণহীন মাঠ দুপুরের ভাবলেশহীন রোদ ক্রোধের মতো প্রেমিকা প্রকৃতির কাছে রূপকথা থেকে এক প্রত্যাখাতার গল্প বলে চলে।

Comments