সন্তোষদা-কে এর মধ্যে দেখলাম। হাফহাতা শার্ট আর প্যান্ট পরে পাড়ার রোলের দোকানের সামনে বেঞ্চিতে বসে থাকতে। মনে হয় এখন আর রিকশা টানে না। আজ থেকে পাঁচ বছর আগেও সন্তোষদা-কে দেখতাম পাশের বাড়ির প্রাচীর ভাঙার সুযোগে তাদের যে-উঠোন, সেখানে রিকশা রাখতে। সেই পাশের বাড়ি কিছুদিন আগে পর্যন্ত ছিল আনন্দদের। ওবাড়ি এখন বিক্রি হয়ে গেছে। যারা কিনেছে, ৮ ফুট উঁচু প্রাচীর দিয়েছে। ভেতরে কী আছে, আর দেখা যায় না। গেটে ঝোলানো আছে 'টু লেট'। সন্তোষদা-র রিকশা আদৌ আছে কিনা বা থাকলেও এখন কোথায় রাখে, জানি না। রিকশা একদম কমে গেছে এই মফস্বল শহরে। বেড়েছে টোটোর দাপট। এত বেড়েছে যে, রাস্তায় জ্যাম লেগে যায়। এর মধ্যে টোটোর ধাক্কায় ওর এক কলিগ শিলিগুড়ি মোড়ে ট্রাকের নিচে পড়ে যান। পা টুকরো-টুকরো হয়ে যায়। ভেইন অপারেশন করে জোড়া লাগিয়েও সে পা বাঁচানো যায়নি। আপাতত তিনি কলকাতার হসপিটালে ভর্তি।
ফিরি সন্তোষদা-র কথায়। আনন্দদের পাশের বাড়ি থাকতো। রিকশা চালাতো। ওর মাকে দেখেছি নাতি-নাতকুর সামলাতে। রাস্তার ওপর বসে বিড়ি খেতো। সন্তোষদা-র বউ আমাদের পাশের বাড়িতে এখন কাজ করতে আসে। সন্তোষদা-র চেহারা সেই একইরকম রয়ে গেছে। দাড়ি-গোঁফহীন একটা মুখ। চুল এখনও কালো। কত বয়স হবে সন্তোষদা-র? আমি যখন ছোটো ছিলাম, সন্তোষদা-কে এই চেহারাতেই দেখেছি। অর্থাৎ সন্তোষদা কোনোমতেই ৬৫-র কম নয়। ছেলে মারা গেছে সন্তোষদা-র। মদ খেয়ে লিভার পচিয়ে ফেলেছিল।
একদিন সুপার মার্কেট থেকে বাজার করে ফিরছি, বাড়ির থেকে একগলি হাঁটাপথে, দেখি সন্তোষদা লুঙ্গি পরে ওর বাড়ির সামনে রিকশাটা দাঁড় করিয়ে হাতে দুটি ট্রান্সপারেন্ট প্লাস্টিকে বাজার নিয়ে ঢুকছে। একটি প্যাকেটে আড়াইশো পটল, হাফকেজি আলু, আরেকটিতে দু-তিনটি পোনামাছ। এটাই ওর বাড়ির আজকের বাজার। প্লাস্টিক নিয়ে জ্ঞান দিতে এই লেখা নয়। পুরসভা তার নজরদারি ঠিকঠাক চালালে, প্লাস্টিক ব্যান এদ্দিনে হয়ে যেত। কাগজের ঠোঙা এই মফস্বলে মোটেই দুষ্প্রাপ্য নয়। অনেক পরিবারের মেয়ে-বউরা কাগজের ঠোঙা বানিয়ে সংসার চালায়। কিন্তু এখন কথা বলবো সন্তোষদা-কে নিয়েই। ওকে আমি ছোটোবেলা থেকে দেখে আসছি। আনন্দদের পাশের বাড়ি। ইট বের করা দু'কামরার, একটি পাকা শৌচাগার টিনের দরজার। সেই আদ্যিকাল থেকে ও রিকশা চালায়। এই দুরন্ত টোটোযুগেও ওর রিকশা সম্বল। ছটপুজোয় নিজে হাতে বাড়ির দেওয়ালে সস্তার রঙ লাগায়। টুনি জ্বালে ইদানীং। মাত্র পঁচিশ টাকায় চায়না টুনি বাজারে মেলে। আগে পারতো না। ওর বউ আনন্দদের বাড়ি কাজ করতো এককালে। এই রিকশা চালিয়েই সন্তোষদা ছেলের বউ ঘরে এনেছে। নিশ্চয়ই একটা ঘর ছেলেবৌয়ের। ওর বউ এখনও একইরকম রোগা লম্বা শ্যামবর্ণ মিষ্টি মুখশ্রী। সন্তোষদা বেঁটেখাটো হাট্টাকাট্টা কালোকুলো। চুল রঙ করে কিনা জানি না। কালোই দেখি। লুঙ্গি পরে সেদিনও রিকশা চালাতো, আজও তাই চালায়।
তখন কলেজে পড়ি। প্রেম করি। প্রেমিকপ্রবরটি অপেক্ষা করবে স্টেডিয়ামের গেটে। তখনও স্টেডিয়াম খোলা মাঠ। গ্যালারি নেই। ঢোকার মুখে একটা শিমুল গাছ। তার তলায় বসে কয়েকবারই গল্পগাছা করেছি। মাথার ওপর না-হলেও বড়ো-বড়ো শিমুল ফুল ঠাসঠাস করে ঝরে পড়তো আশেপাশে। তো যা বলছিলাম, সেইসময় আমাদের পাড়া থেকে স্টেডিয়ামের রিকশাভাড়া ছিল আট টাকা। কলেজ অবধি চলে যাওয়া যেত দশ টাকায়। রিকশা চড়ার বিলাসিতা খুব একটা করতাম না। আমার বাহন ছিল সাদারঙের একটা অ্যাভন সাইকেল। ক্লাস সিক্সে বাবা কিনে দিয়েছিল। পুরো ইউনিভার্সিটি মায় বিএড পড়াকালীনও ওটাই ছিল আমার সঙ্গী। তো, কী কারণে মনে নেই, সেদিন সাইকেল নেই। চড়েছি সন্তোষদা-র রিকশায়। আমার সম্বল একটাই দশ টাকার নোট। ভাড়া আট টাকা, দু'টাকা আমার। পঞ্চাশ টাকা মাইনের একটা টিউশানি করি। হাতখরচ। প্রেম করতে যাচ্ছি। প্রেমিকও ছাত্রই। আমার থেকে একবছর আটমাসের বড়ো। ফুটো পকেট। কলেজের উল্টোদিকে বাপিদা-র রসুনের সিঙাড়া জোটে মাঝেমাঝে। একবার অশোকা, আর একবার পপুলার রেস্টুরেন্ট। তা না-হলে এমনি-এমনিই এ-গলি সে-গলি হাঁটাহাঁটি, সাইকেল পাশে-পাশে, হ্যান্ডেলটা ওর হাতে। আমি ধরতে বলিনি কখনও। ও-ই ধরতো। তো, সন্তোষদা-র কাছে খুচরো নেই। বললো, "পরে নিয়ে নিস।" পাড়ার মেয়ে। ছোটো থেকে দেখছে। আজ সন্তোষদা-কে দেখে সাতাশ বছর পর সে-কথা মনে পড়লো। মনে পড়লো, দু'টাকা আমার নেওয়া হয়নি আজও! সন্তোষদাও ভুলে গেছে। দু'টাকার সুদ ভাঙিয়ে আমার দু'আনার জীবন চলছে। মরে যাইনি অন্তত। হারিয়েছি অনেক। এটুকুই। জীবনটা মজার-ই আসলে। দেয়, নেয়। চলে যায়। যাচ্ছে।
(ক্রমশ)
Comments
Post a Comment