সমরেন্দ্র মণ্ডল

বহুদিন আগে বাংলা ছায়াছবির অভিনেতা নৃপতি চাটুজ্জের একটা গল্প পড়েছিল অর্বাচীন। এক মফস্বল শহরে কোনো এক সিনেমার আউটডোর শুটিং চলছিল। সেই দলে ছিলেন নৃপতিবাবুও। তা, যে-হোটেলে তাঁকে রাখা হয়েছিল, তার বারান্দায় দাঁড়িয়ে রোজ সকালে রাস্তার কুকুর গুনতেন। যদি সংখ্যায় এক-ই থাকতো, তাহলে স্বস্তির শ্বাস ফেলতেন। এক সহ-অভিনেতা কয়েকদিন পরপর ঘটনাটা লক্ষ করে একদিন জিজ্ঞেস করলেন, সক্কালবেলায় বারান্দায় দাঁড়িয়ে বিড়বিড় করেন কেন নৃপতিদা?
উত্তরে তিনি স্বকীয় গাম্ভীর্যে বললেন, কুকুর গুনি।
— মানে?
— মানে, রোজ দেখি কুকুরের সংখ্যা এক আছে কিনা। বলা তো যায় না, এতগুলো লোককে রোজ মাংস খাওয়াচ্ছে, একটা কুকুর জবাই করে মিশিয়ে দিতে তো পারে!

কথাটা বেশ চাউর হয়ে গেল। হোটেল-মালিকের কানে পৌঁছেছিল কিনা, সেটা অবশ্য জানা যায়নি। সেকালের সিনেমাপাড়ার বিখ্যাত সাংবাদিক রবি বসু 'স্মৃতির সরণী' বইয়ে এসব লিখে গেছেন। এসব গপ্পো পুরোনো বইয়ের মতোই হারিয়ে গেছে। অর্বাচীন ভাবে, যদি একালের মতো ফটোতোলা ঢাউস ফোন থাকতো, তাহলে কী হতো! হোটেল-মালিক নিশ্চয় গ্রেফতার হতো, জনস্বার্থে মামলা হতো। লাল-নীল-সবুজ-হলুদ দলের বিক্ষোভ হতো। নৃপতিবাবুকেও চোদ্দোবার থানা আর আদালত দৌড়তে হতো। বিনেপয়সার উকিল আর রাজনৈতিক মুরুব্বির খোঁজ করতে হতো। কত্ত ঝামেলা !

এই তো ক'দিন আগেই কলকাতায় এক নামজাদা রেস্তোরাঁয় এমন কাণ্ড ঘটে গেল। খদ্দের যুবকটিকে নাকি ছাগমাংসের বদলে গোমাংস দেওয়া হয়েছিল। সমাজমাধ্যমে চাউর হলো, ক' দিন ধরে চর্চা চললো। আদালত পর্যন্ত  বিষয়টা গড়ালো। অর্বাচীন ভাবে, এসব এখন হবে। সামনে নির্বাচন দাঁড়িয়ে রয়েছে। সুতরাং এমন নানা নাটক হবে। ঢ্যারা-ঢ্যারা-ঢ্যারা, লাগ ভেলকি লাগ।

নির্বাচনের কথা মাথায় আসতেই এসআইআর ছুটে এসে মাথায় খটাস করে গাঁট্টা মারলো। অর্বাচীনের মনে পড়লো, ও হরি, এ-কম্মটিও তো কম জ্বালার নয়! দিন পাঁচেক আগেই তো তাকে লাইনে দাঁড়াতে হয়েছিল। ব্যাপারটা কী? না, অসঙ্গতি। কিসের অসঙ্গতি? না, তোমার বাপ তোমার মায়ের থেকে মাত্তর পনেরো বছরের বড়ো। তোমার বয়স পঁয়ষট্টি বছর হলে, বাপ-মায়ের বয়সের এই ব্যবধান কেন? ভ্যালারে ভ্যালা! এরা কেশব নাগের অঙ্কও জানে না? অর্বাচীন গিয়ে সব কাগজপত্র দিয়ে অঙ্ক কষে দিয়ে এসেছে। এর পরেও নাম থাকবে কি থাকবে না, দেবা ন জানন্তি। মেশিন জানন্তি। এখন তো আর মানুষের বোধ-বুদ্ধি-আবেগ-যুক্তির উপর নির্ভর করে না, সব ওই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বলে দেবে। তোমায় যোগ করবে মেশিন, বিয়োগ করবে মেশিন। যা চলছে, মানুষের তো বটেই, দেবতাদের অসঙ্গতি ধরতেও আর দেরি নেই!
     
এই ধরুন-না, সরস্বতীর কথা। তার চাকরি গেল বলে! এরপর শুনবো, কেউ আর দেবীর কাছে গিয়ে "বিদ্যে দাও মা" বলে অনুনয় করছে না। বিদ্যে দেওয়ার কাজটা করছে ওই মেশিন। তার কাছে গিয়ে ছাত্র বলছে, "এআই দাদা, আমার অঙ্কটা কষে দাও না। আমার ইংরেজির উত্তর লিখে দাও না।" অমনি মেশিন পুঁ-পুঁ করে কাগজ বের করে দিল তার পেট থেকে। তা, ওগুলো ঠিক হলো না ভুল হলো, দেখবে কে? মাস্টাররা তো রাস্তায় বসে। তাদের চাকরি নেই। ইস্কুল আছে, মাস্টার নেই। ছাত্তররা বাড়িতে ছোটো-ছোটো মেশিনের সামনে বসে। ইস্কুলে একটা এআই মাস্টার বসানো আছে। সে-ই সব কাজ দেখে দেয়।

শুধু কি আর সরস্বতীর কপাল পুড়বে? কতজনের সুবিধা হবে বলুন দিকি! ধরুন, এক যুবকের কবি হওয়ার শখ হলো, অথচ কবিতা তার আসে না। সে ওই এআইয়ের সামনে গিয়ে বললো, "দাদা একটা আইডিয়া বলছি, একটা কোবতে নামিয়ে দাও না।" ব্যস। কবিতা বেরিয়ে এল। শুনছি, এখন নাকি ওই মেশিনে গপ্পো লিখে পত্রিকায় ছাপিয়ে দিচ্ছে! এভাবে  কবিতা বা উপন্যাস লিখে দশটা ভাষায় অনুবাদ করিয়ে নাও। তারপর মুক্তবাণিজ্য করো। একটু তেলের বাটি নিয়ে  ঘোরাঘুরি করো; শুধু দেশীয় আকাদেমি কেন, আন্তর্জাতিক নোবেলও পেয়ে যেতে পারো। মা...মা...সবই এআইয়ের কৃপা মা!

এইসব ভবিষ্যৎ দেখতে-দেখতে  চায়ের কাপটা টেবিলের উপর রেখে খবরের কাগজে চোখ বোলালো। টিভি, গাড়ির দাম কমলো বটে; তেলের দাম কমলো না। চালের দামও মই বেয়ে উপরে উঠছে। বড়ো চিন্তিত অর্বাচীন। চায়ের পর একটা সিগারেটে টান দিতে যাবে, অমনি খেয়াল হলো, বাজেটে দাম বেড়েছে। অতএব আধখানা করে টানবে। ফুক-ফুক দু'টান। ধুস, এতে কি আমেজ আসে! পুরোটাই টানি। ঠিক পুষিয়ে যাবে। ডিএ পেয়ে যাবো। জয় আদালত! 


Comments

  1. জিও বস। কেয়া দিস!!! আলুর দম কে ডিস্!!

    ReplyDelete

Post a Comment