লিটল ম্যাগাজিনের অনুসন্ধিৎসু পাঠক জানেন, শিগক একটি পঞ্চাশ বছরের ব্যতিক্রমী পত্রিকা। শিগক-এর নির্বাহী-সম্পাদক শ্যাম বিশ্বাস কবিতা লেখেন 'রামানন্দ সেন' নামে, আর গল্প লেখেন 'এম কালিদাস' নামে। আবার স্মৃতিকথা, ব্যক্তিগত গদ্য ইত্যাদি তিনি স্বনামেই লিখে থাকেন। যেমন, এই মুক্তধারা অনলাইন-এ তিনি দুর্গাপুজো নিয়ে লিখেছিলেন স্মৃতির গ্রামের বড়োপুজো শীর্ষক একটি গদ্য। আবার শ্যামাপ্রসাদ বিশ্বাস নামেই লিখেছেন একটি চমৎকার স্মৃতিগ্রন্থ স্মৃতির ছোটবেলা । কিন্তু অলখ নিরঞ্জন যেহেতু গল্পের বই, অতএব এখানে তিনি এম কালিদাস। এখন কথা হলো,অলখ নিরঞ্জন কি আসলেই গল্পের বই?অলখ নিরঞ্জন আসলে কী? অণুগল্পের একটি ক্ষুদ্র সংকলন, নাকি ছোটো-ছোটো কিছু গদ্যের সমাহার, নাকি সমাজ ও সমকালকে ধরে রাখতে চাওয়া একটি অনিয়মিত দিনলিপি? আসলেঅলখ নিরঞ্জন এইসব কিছুই না এবং এই সবকিছুই! বইটির পরিচিতি হিসেবে অবশ্য লেখা হয়েছে, "একটি গল্পের মালা"; যার প্রকাশনাকৃত ইংরেজি "আ সিরিজ অফ বেঙ্গলি স্টোরিজ"। কিন্তু অলখ নিরঞ্জন নেহাত-ই গল্পের চেয়ে কিছু বেশি। এবং ক্ষীণতনু বইটি পড়তে আর যা মনে হয়, তা হলো, গল্পের বই পড়তে অভ্যস্ত পাঠকের কাছে এই বইটি একটা ধাক্কা। পাঠক আসুন, এবার আপনাদের ওই ধাক্কাগুলোর সঙ্গে পরিচয় করানো যাক।
প্রথম ধাক্কা হলো, উৎসর্গপত্রের মধ্যেই লেখকের বয়ান; যার পুরোটাই তুলে দেওয়ার লোভ সামলাতে পারছি না :
"একটু-আধটু সংস্কৃতি চর্চা করি। পুজোর প্যান্ডেলে খুব একটা যাইনে। তবে রবিঠাকুর নজরুলের জন্মদিবসে আর ইদানিং বসন্ত উৎসবে মাতি। সুন্দরীদের ঘ্রাণ নিই।
ফেসবুকে থাকি, নিজের ঢাক নিজেই বাজানোর এই সুযোগ আগে ছিল না। সন্ধ্যায় টিভিতে ঝগড়াঝাটি দেখি। পোড়া মানুষ দেখতে দেখতে চা...আহা আর কি চাই, সিরিয়ালে খাপি নায়ক নায়িকাদের সাবানের ফেনায় ডুবে মন্তব্য করি কিসব ফালতু গল্প! ছ্যা:-ছ্যা! আর খবরে দুর্নীতি ধর্ষণ শুট আউট বাজি তৈরী নাকি বোমা! শুনতে শুনতে ক্লান্ত হয়ে শুয়ে পর্ণ সাইট খুলি। অপেক্ষা করি সংস্কৃতি করা সুন্দরীরা হোয়াটসঅ্যাপ-এ কোনো মেসেজ বা ছবি পাঠাল কিনা।..."
এই বয়ানেই এই বইটির টোন নির্ধারিত হয়ে যায়।
পাঠকের দ্বিতীয় ধাক্কাটি লাগবে অলখ নিরঞ্জন-এর গল্পগুলো পড়তে গিয়ে। কারণ, এই বইয়ের গল্পেরা হঠাৎ-ই শুরু হয়ে যায়। অনেক গল্পের কোনো শিরোনামও নেই! যাদের শিরোনাম আছে, তাদেরও ঠিক শিরোনামের মতো করে নেই। সে-সবও বড়ো হঠাৎ-ই শুরু হয়ে যাওয়া! একাধিক গল্প আবার এমন, যা একটি অন্যটির কন্টিনিউয়েশন! অর্থাৎ সেখানে তাদের গল্পের মালা বা সিরিজ অফ স্টোরিজ পরিচিতি সার্থক।
এরপরের ধাক্কাগুলো গল্পগুলোর বিষয়ে। চরিত্র এবং উপাদান নির্বাচনেও। ক্ষয়িষ্ণু রাজনীতি, যৌনশোষণ, চিটফান্ড কেলেঙ্কারি, লক্ষ্মীর ভাণ্ডার (বইয়ে অবশ্য লেখা হয়েছে "লক্ষী ভান্ডার") ও কন্যাশ্রী-র মতো সরকারি খয়রাতি প্রকল্প, কৃষকের আত্মহত্যা, মধ্যবিত্তের সুবিধাবাদ ইত্যাদি প্রাসঙ্গিক ও সমসাময়িক বিষয় নিয়ে এসেছেন এম কালিদাস। এইসব আলোড়িত হওয়ার মতো বিষয় নিয়ে খুব নির্বিকারভাবে গল্প বলে যান তিনি। যেমন, সাপ শুধু জমির আলেই থাকে ! গল্পে তিনি লিখেছেন : "কাসেম আলীর বয়স প্রায় পঞ্চাশ। অনেক জমি জিরেত। চার পাঁচটা ছেলে মেয়ে। দোতলা কোঠা বাড়ি। সে রাজনীতি করে আর বাঁধায় মালের ব্যবসা করে। ব্যাঙ্কের কাজ মিটে গেলে কাসেম মিনুকে বলে বাইকের পিছনে বসো। চলো কোথাও খেতে হবে — খুব ক্ষিধে পেয়েছে। মিনু তার কথা মতো বাইকের পিছনে উঠে বসে। বাইক চলছে। মাঝে মাঝে মিনুর বুক কাসেমের পিঠে ঘষা লাগছিল। তারা একটা একটা ঝকঝকে রেস্টুরেন্ট কাম হোটেলে আসে। বিরিয়ানি খাবার পর মিনুকে বলে - চলো, উপরের ঘরে কিছুক্ষণ বিশ্রাম করি। মিনু কি করবে বুঝতে পারেনা, সে সিঁড়ি বেয়ে কাসেমের পিছন পিছন দোতলার এক নীল দেওয়ালের ঘরে ঢোকে। একটা খাটে সুন্দর পরিপাটি বিছানা। মিনু বেওয়ার কি কিছু করার ছিল! কাসেম বলে চিন্তা করো না আমার কাছে ভাল বেলুন আছে। ফেরার সময় বাইকে মিনুকে গ্রামের মুখে নামিয়ে দেয় কাসেম।
— তুমি না খুব খারাপ!
— কেন দু'হাজার পাইয়ে দিলাম। মাটির ঘর পাকা করে দেব। তবে আমার সাথে প্রধানও কিন্তু আসবে।
মিনু বেওয়া পাকা বাড়ির স্বপ্ন দেখতে শুরু করে..."
আসলে লেখক এম কালিদাস এখানে যতটা কথক, ততটাই দর্শক। ঠিক যেমন, পাঠক হিসেবে আমরাও। লেখক হিসেবে এইসব গল্পে তিনি লড়াই বা প্রতিবাদ-জাতীয় শব্দের ব্যবহারে খুব একটা হইচই ফেলে দিতে চান না। বরং নির্লিপ্তির সঙ্গে চুপচাপ দেখিয়ে দিতে থাকেন সমাজের অবক্ষয় এবং পচনের জায়গাগুলো। পাঠকের কাছে ছবির মতো করে ঘটনাক্রম তুলে ধরাই এখানে তাঁর উদ্দেশ্য। ফলে, তাঁর গল্প পড়তে গিয়ে পাঠক মৃদু ধাক্কা অনুভব করেন, নড়েচড়েও বসেন; কিন্তু পাঠককে ভূপতিত করে দেওয়া তাঁর উদ্দেশ্য নয়।
প্রকাশক আদিবর্ণ ২৪ পৃষ্ঠার (২২+২) এই পুস্তিকাটির মুদ্রিত মূল্য রেখেছে ১০০ টাকা! মানে, সিরিয়াসলি? তাঁরা কি জানেন না, বাংলা ভাষার পাঠকেরা এই ভাষার সবচেয়ে সমৃদ্ধ প্রকাশনাকেও বইয়ের অতিরিক্ত ও যুক্তিহীন দাম রাখার জন্য এখন ঠাট্টার ছলে 'আনন্দ জুয়েলার্স' নামে ডাকেন! বইয়ের অযৌক্তিক মূল্য নির্ধারণের এই প্রবণতা আসলে বাংলা প্রকাশনা জগতের জন্য ক্ষতি ছাড়া আর কিছুই নিয়ে আসে না।
আরও একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো, ব্যতিক্রমী এই গল্পমালাটিতে ব্যবহৃত কিছু বানান সচেতন পাঠকের চোখের জন্য খুব পীড়াদায়ক। এই ২০২৬ সালে এসেও যদি কোনো বইয়ে আমাদের 'তৈরী', 'স্টেশনারী', 'মফ:স্বল', 'সব্জী', 'সরকারী', 'কেরানী', 'আলী', 'চাষী', 'শাড়ী', 'জিন্দেগী', 'অঞ্জলী' ইত্যাদি বানান পড়তে হয়; যদি সেই বইয়ে 'কি' আর 'কী'-এর প্রায়োগিক পার্থক্য বিবেচনা না-করেই ব্যবহার করা হয়ে থাকে; তাহলে বলতে হবে, বাংলা ভাষার বানানবিধির বিবর্তন নিয়ে এখনও অনেকেই খুব একটা সিরিয়াস নন।
বইটির প্রচ্ছদ ও লেখক-প্রতিকৃতি নির্মাণ করেছেন শাম্ব পি বিশ্বাস। তাঁর কাজটি অন্যরকমের; নিজস্বতায় ভরপুর। বইয়ের পিছনে দেওয়া লেখক-পরিচিতি এবং তাঁর কাজ পরস্পরকে উপযুক্ত সঙ্গত করেছে।
অলখ নিরঞ্জন | এম কালিদাস | আদিবর্ণ | আসাননগর, নদিয়া, পশ্চিমবঙ্গ | প্রথম প্রকাশ : জানুয়ারি ২০২৬ | প্রচ্ছদ : শাম্ব পি বিশ্বাস | ১০০ টাকা
Comments
Post a Comment