স্মৃতির গভীরে ডুব দিয়ে যে-সোঁদা গন্ধ পাওয়া যায় তা শুধু অতীত হয়ে যাওয়া কিছু সময় নয়, তা আমাদের অভ্যাস সম্পর্ক ও আত্মপরিচয়ের সম্মিলিত অনুভূতি। নিজের শহর, জন্মভূমি, বেড়ে ওঠার ভিত একজন মানুষকে যেভাবে প্রভাবিত করে; যেভাবে তার মূল্যবোধ গড়ে তোলে; সময়ের সঙ্গে-সঙ্গে শহরের রূপ বদলালেও মনের মধ্যে পুঞ্জিত সেই অনুভবের ছাপের কোনো বদল হয় না। এভাবেই গড়ে ওঠে জীবনদর্শন। শৈশবের নরম ভাঁজে লুকোনো শিউলি একটা সময় শুকিয়ে আসে, কিন্তু মন পড়ে থাকে সেই শিউলিতলাতেই। তাই বারেবার পিছন ফিরতে মন চায়, সেই ভোর সেই বিকেলবেলায় জজকোর্ট মাঠে কৃষ্ণচূড়া গাছটার নিচে লাল হয়ে থাকা ফুলগুলো কুড়িয়ে ফ্রক বোঝাই করার দিনগুলোতে ফিরে যায় মন। আজ সেই কোর্টের মাঠের শতচ্ছিন্ন দশা। মাঠ বলতে নেই, শুধুই এবড়োখেবড়ো মাটি; চারপাশে কোর্টের ঘিঞ্জি ঘর, এখানে-ওখানে চায়ের-খাবারের দোকানের ভিড়ে বিকেলে সেই ফুটবল খেলার পথ বন্ধ। দাদুর সঙ্গে মাঠে যাওয়া আর স্কুলের বন্ধুদের সঙ্গে আবারও মাঠে দেখা হওয়া, খেলা— এসব দিনগুলো স্মৃতিতে অমলিন হয়ে থাকবে।
শহরের কথা লিখতে বসে কোনটা আগে কোনটা পরে লিখবো ভেবে, খেই হারিয়ে ফেলি। রাজা কৃষ্ণচন্দ্র নদিয়া রাজবংশের শ্রেষ্ঠ পুরুষ ছিলেন। তাঁর রাজবাড়ি আজ দাঁড়িয়ে রয়েছে ইতিহাসের নীরব প্রহরী হয়ে। প্রতি খিলানে স্তম্ভে কামানে রাজার কথা। গোপাল ভাঁড় কি সত্যিই ছিল নাকি গল্প, এই চর্চা চলতেই থাকে।
দোলপূর্ণিমার পর দ্বিতীয় একাদশী তিথিতে রাজবাড়ি প্রাঙ্গণে বিরাট মেলা বসে। একমাস ধরে চলা এই মেলা 'বারোদোলের মেলা' নামে পরিচিত। তৎকালীন নদিয়ারাজ প্রতিষ্ঠিত মেলার শুরুতে বারোটি কৃষ্ণবিগ্রহ রাজবাড়ির নাটমন্দিরের প্রবেশপথে পৃথক-পৃথক কাঠের সিংহাসনে বসিয়ে তিনদিন তিন বেশে পূজা হয়। 'হরিভক্তিবিলাস' গ্রন্থে এই দলের উল্লেখ পাওয়া যায়। মেলাকে কেন্দ্র করে ঠাকুর দর্শন করতে হাজার-হাজার ভক্ত সমাগম হয় ও তীর্থস্থানের রূপ পায় সেই স্থান। কথিত আছে, রাজমহিষী একবার নদিয়ারাজের কাছে সেকালে বিখ্যাত উলার জাতের মেলা দেখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু রাজকার্যের চাপে মহারাজ সেকথা বেমালুম ভুলে যান। তাছাড়া সেই সময়ের আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থায় কোনো রানির পক্ষে উলার মেলা দেখা শোভনীয়ও ছিল না। তাই মহিষীর আবদার রাখতে তিনি একটা আস্ত মেলা বসিয়ে ফেলেন রাজবাড়ির মাঠে। সেই মেলাই বারোদোলের মেলা, আজ যা শহরবাসীর কাছে ঐতিহ্য। রাজার সময়ের সেই দিনগুলো আজও ছুঁয়ে যায় শহরের প্রান্ত। আজ বিভিন্ন অরাজনৈতিক সংগঠন বারোদোল মেলা শুরুর তিনদিন দরিদ্রনারায়ণ সেবার মাধ্যমে দীনদুঃখীকে পোশাক ও খাবার সেবা বিতরণ করে। সেই অষ্টাদশ-উনবিংশ শতকে এই শহর শুধু রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নয়, শিক্ষাবিস্তার সাহিত্যচর্চা ও ধর্মীয় আচার-উৎসবেও বিশেষ গুরুত্ব অর্জন করেছিল এবং নদিয়া রাজপরিবারের পৃষ্ঠপোষকতায় তা সম্ভব হয়েছিল। ঐতিহাসিকদের মতানুসারে এই পৃষ্ঠপোষকতা থেকেই স্থানীয় শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির উত্থান হয়েছিল।
আমাদের শহরের এক বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো পাড়াভিত্তিক সামাজিক অবস্থান, যা সেই রাজার সময় থেকেই ছিল। ওই এলাকাতে বসবাসকারী মানুষের পেশা জাতিগত বা ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যভিত্তিক চাষাপাড়া, মালোপাড়া, বাগদিপাড়া, তাঁতিপাড়া, মেথরপাড়া, চকেরপাড়া, কলুপাড়া, উকিলপাড়া নাম হয়েছিল। যেমন, চাষাপাড়ায় কৃষক সম্প্রদায়, ছুতোরপাড়ায় কাঠ-ব্যবসায়ী; এরকম মালোপাড়ায় বাস করতো মালো বা জেলেরা। এরা সারাবছর জলঙ্গি নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতো আর পুজোর সময় রাজার দুর্গাঠাকুর বিসর্জন দিত জলঙ্গি নদীতে। তাদের পোশাকে, ঘরে সবসময় মাছের উৎকট গন্ধ লেগে থাকতো। রাজার প্রচলিত জগদ্ধাত্রী পুজোর বিসর্জন দিতে গিয়ে মালোদের ইচ্ছা হলো, তারাও পুজো করবে এবং রাজার কাছে সেইমতো দরবার করলে রাজা ১১ টাকা অনুদান দিলেন পুজো করতে। মহাসমারোহে তারা মা জগদ্ধাত্রীর আরাধনায় মেতে উঠলো। এদিকে রাজাকে নিমন্ত্রণ করেছে পুজোতে, রাজা এসে মাছের প্রবল গন্ধে পাড়াতেই ঢুকতে পারছেন না; তখন জেলেরা ধুনো পুড়িয়ে মাছের গন্ধ তাড়ালে রাজা উপস্থিত হলেন মা জলেশ্বরী-র সামনে। জল-ই যেহেতু মালোদের প্রধান জীবিকা, তাই তাদের আরাধ্য মায়ের নাম 'জলেশ্বরী'। এই পুজোতে মহিলা নয়, পুরুষেরা আজও জলঙ্গি নদী থেকে জল নিয়ে আসেন। আজও রাজবাড়ি থেকে এগারো টাকা অনুদান আসে, তারপর পুজো শুরু হয়। সেই রাজার সময়ের ধুনো পোড়ানো রীতি আজ এক বিশ্বাসে পরিণত হয়েছে। কারও মানত থাকলে, সারা দেহ ভিজে কাপড়ে মুড়িয়ে হাতে আর মাথায় মাটির পাত্রে ধুনো ছিটিয়ে পোড়ানো হয় আর সে এক আচারে পরিণত আজ।
প্রসঙ্গের জল বহুদূর গড়ায়, যেমন জলঙ্গি নদী দিয়ে কত-কত জল বয়ে গেছে আর শহর-সভ্যতা আগের থেকে উন্নততর হয়েছে জনজীবনের প্রাবল্যে আর সরকারি আনুকূল্যে। জগদ্ধাত্রী পুজো, যা এই শহরের প্রধানতম উৎসব, তা আড়েবিঘতে কতখানি বর্ধিত হয়েছে তার কথা নিয়ে আবার আসছি পরের পর্বে।
(ক্রমশ)
Comments
Post a Comment