শর্মিষ্ঠা মিত্র পালচৌধুরী

বুকের মধ্যে চাঙড়-চাঙড় বরফের নিচে চাপাপড়া সম্পর্ক হিমঘরে থাকতে-থাকতে লাশে পরিণত হয়। পাঁজরের মধ্যে যদি জেনারেটর থাকতো! তাহলে স্নায়ুতন্ত্রের অলিগলি দিয়ে উত্তাপ পরিবাহিত হয়ে বরফ গলিয়ে দিত। বরফের ফাঁকফোকর দিয়ে উঁকিঝুঁকি মারে আগামীর সবুজচারা। ওদিকে বুনোহাঁসের দল পালকে কলমির বনজ গন্ধ মেখে সম্পর্কের চোরাবালিতে পথ হারায়। ঘাটের প্রত্যেকটা সিঁড়ি জানে সিঁড়িভাঙার গল্প। প্রত্যেকটা ঢেউয়ের অভিঘাতে থাকে ভাঙাগড়ার সংবাদ। বাঁধানো ঘাটে ছড়িয়ে আছে ছাতিমের তীব্র সুবাসমাখা বিরহের কাব্যগাথা। 

এইসব ভাবতে-ভাবতেই বাজপাখির মতো ঝুপ করে সন্ধে নামে কার্তিকের মাঠে। বিষণ্ণ বারান্দার এককোণে এসে দাঁড়ায় অষ্টাদশী চাঁদ। শরীরের ভাঁজে-ভাঁজে লেখা অভিজ্ঞতার গল্প। নতজানু হয়ে বসি নদীর কাছে। অনুভব করি, নদীর একাকিত্ব ও বিচ্ছেদবেদনাকে সহ্য করার কী অপরিসীম শক্তি! বালিকাবেলায় জীবনের ব্যথাতে ভার এবং ধার দুই-ই ছিল, আর আজ পরিণত বয়সের ব্যথায় শুধুই ভার আছে; কোনো ধার নেই। তাই এখন আর নতুন করে রক্তপাত হয় না। প্রতিটা আঘাত নিয়ে কীভাবে চলতে হবে, তা যেন আগের থেকেই ঠিক করা আছে। সভ্যতার এই অগ্রগতির দায় কে নেবে? 

বালিকাবেলায় কাঙ্ক্ষিত মানুষটির আগমন হলে যমুনায় ঢেউ উঠতো; শরীরতন্ত্রীতে বেজে উঠতো শ্যামসুন্দরের বাঁশি! অকারণে ছাদে চলে যাওয়া, আকাশের সাথে গল্প করা, বৃষ্টিতে ভিজে কদমের সুবাস অনুভব করতো যে-প্রজাপতি; আজ তার ডানা আঘাতে-আঘাতে, কথার বিষে ছিন্নবিচ্ছিন্ন! এখন এই দূষিত পৃথিবীতে সে কথা বলে না, হাসে না, ওড়ে না; বরং মুখোশের উপর মুখোশ চাপিয়ে লিখে চলে তার বারোমাস্যা!

নরম মাটি পেলেই দাঁত-নখ দিয়ে ক্ষতবিক্ষত করা যেন এই নীল গ্রহের দস্তুর! বুকের ভেতর যে-ছলাৎছলাৎ নদী আছে; তার উপর চড়ার পর চড়া পড়তে থাকে আর একদিন হঠাৎ মরুভূমিতে সেই নদী পথ হারিয়ে ফেলে। আঁকাবাঁকা নদীপাড় ধরে যতটুকু দেখা যায়, সেখানে শুধুই কোলাহল। তবুও কূল থেকে অকূলে যাবার জন্য জীবনডিঙিটি আমরা ভাসিয়ে দিই। 

বুকের ভেতর উথালপাথাল নদী আর মেহেন্দি রঙের দুপুর ধীরে-ধীরে ফিকে হয়ে যায়। ভাঙা পাঁজর ঘষে চকমকি জ্বালিয়ে দেখি চুম্বনের কোলাজ। মহেঞ্জোদারোর অস্থির বাতাস আর্দ্র হয়ে যায় পুরিয়া ধানেশ্রীর আলাপে। 

Comments