শর্মিষ্ঠা ঘোষ

পারিজাত ধানের মুড়ি সেরা বলে জানতুম ছোটোবেলায়। ধবধবে সাদা আর ফুরফুরে। আর ছিল মাঘুশাল। একটু লালচে কিটকিটে। তখন সবই ছিল খোলায় ভাজা। পরে এল মেশিনে ভাজা, ইউরিয়া দেওয়া। টিন পিটিয়ে মুড়ি রাখতো বাবা। সর্ষের তেলের টিনে কাঁধ উঁচু করে ঢাকনা বানানো হতো। একটু 'সফি' যারা, ডালডার হলুদ প্লাস্টিকের বড়ো কৌটোয় মুড়ি রাখতো। টিন হিসেবে দাম নিত বস্তা মাথায় মুড়িওয়ালি। মুড়িওয়ালা দেখেছি খুবই কম। গ্রাম থেকে আসতো সকালবেলায়। দুপুরের মধ্যে মুড়ি বেচে ফিরে যেত গ্রামে। ফাঁকা বস্তা আর হয়তো মুদির সওদা একপলা তেল, নুন। গ্রাম কখনও বাজার করেনি শহরে, জামাকাপড় হার্ডওয়ার ছাড়া। ফাস্টফুড বলতে তেলেভাজার দোকান, মোগলাই কাটলেট। বহুদিন পর্যন্ত রায়গঞ্জে রেস্টুরেন্ট বলতে অশোকা। সেখানে প্রথম মোগলাই পরোটা আর মাটন কষা খাওয়ালো বাবা, ক্লাস এইটের জন্মদিনে। একমাত্র রোলের দোকান ইনস্টিটিউট-এর কাছে। জন্মদিনে আর তোলা হতো স্টুডিওতে ছবি। ছিল স্টুডিও পিকাসো। স্টুডিও মোনালিসা। অনেক পরে হলো স্টুডিও চার্লি। স্টুডিও রেইনবো। কালার ল্যাব তো সেদিনের গল্প। তখন সব ছবি সাদাকালো। জন্ম বিবাহ মৃত্যু নির্বিশেষে। 

যা বলছিলাম, ফাস্টফুড তখন খারাপ চোখে দেখা হতো। আমার ক্লাস নাইনে বাড়িতে ম্যাগি এল। বাবা স্টোভে বাটি বসিয়ে মশলা দিয়ে ম্যাগি সেদ্ধ করে দিল। প্রথম শোনা, টু মিনিটস নুডুলস। প্রথমবার খেয়ে খুব একটা ভালো লাগেনি। তখন মফস্বলে মাংস বলতে মানুষ খাসি, পাঁঠাই বেশি বুঝতো। রবিবার মানে মধ্যবিত্ত-বাড়িতে মাংসের সিটি পড়বে প্রেসারকুকারে। দু'পিস মাংস, একপিস আলু আর হলুদ ঝোলের দুপুর। মুরগির মাংসের সেরকম চল ছিল না। মুরগিকে বলতো রামপাখি। অনেক বাড়িতেই মুরগি ঢোকা বারণ ছিল। যাদের ঢুকতো, সেটা আবার দেশি মুরগি। ব্রয়লারের কোনো গল্প ছিল না। আমি যখন কলেজে পড়ি, তখন আস্তে-আস্তে ব্রয়লার মুরগি আমাদের পাতে জায়গা করে নিচ্ছে। প্রথম-প্রথম ক্যাটারাররা বিয়েবাড়ির জন্য ফ্রোজেন ব্রয়লার মুরগি নিয়ে আসতো। তবে মাংস হিসেবে তার সেরকম কৌলিন্য ছিল না। বাড়িতে হলুদ সরওয়ালা দুধে ঘি বানাতো কেউ-কেউ। লেবু দিয়ে ছানা কেটে হতো ছানার ডালনা। পনির তো সেদিনের ছোকরা। কালো মেটেহাঁড়িতে গরুর দুধ বেচতে পুরুষ-মহিলারা আসতো বিকেলবেলা দুধহাটি মোড়ে। সাথে অ্যালুমিনিয়ামের মগ, পোয়া মাপার জন্য। পোয়া মানে আড়াইশো। চার পোয়ায় হতো এক সের। আর আনতো আঁটি বেঁধে সবুজ ঘাস, বাঁশ, গরুর খাবার বা চাল ছাইবার খড়। কারও বাড়ি গোয়ালা বড়ো টিনের পাত্র সাইকেলের দু'ধারে বেঁধে আসতো। দুধের ওপরে ভাসতো বাঁশপাতা বা খড়। যাতে চলকে না-পড়ে। এমন এক গোয়ালা ছিল গণেশ। লম্বা মুখ, ঢ্যাঙা, লুঙ্গি পরা। সব গোয়ালাকেই লুঙ্গি পরতে দেখেছি। এই গণেশের কাছেই শোনা, ওদের গ্রামে কেউ মারা গেলে গোটা গ্রামের ছেলে ন্যাড়া হয়। আবার বিয়ে-শাদি হলে গোটা গ্রাম চলে আসে নেমন্তন্ন খেতে। এগুলো গল্পের মতো লাগে আমার মেয়েদের। 

হঠাৎ এত কথা মনে পড়লো কেন? আমার বর শিলিগুড়ি থেকে মুড়ি এনে খায় বলে! সে-মুড়িতে নুন বেশি, ফোলা-ফোলা। আমার ছোটোবেলার পারিজাত ধানের মতো মিষ্টি মুড়ি নয়। এখন তো কালেভদ্রে মুড়ি খাই। ট্রেনে-বাসে চড়লে একমাত্র। ঝালমুড়ি।
(ক্রমশ)  

Comments

Post a Comment