আমার দীর্ঘদিনের ভ্রমণসঙ্গী ত্রিনাথ ঘোষের সঙ্গে আমি একাধিকবার বিভিন্ন জায়গায় উইক-এন্ড ট্যুরে গিয়েছি। একবার গেলাম কাটোয়া। কৃষ্ণনগর থেকে নবদ্বীপ, নবদ্বীপ থেকে কাটোয়া। সেবার আমাদের সঙ্গে কলকাতা থেকে সন্তোষ কুণ্ডু-ও ছিলেন। কাটোয়া স্টেশনে নেমে প্রথমেই আমরা এক হোটেলে উঠে, স্নান করে, সামান্য কিছু খেয়ে, কাটোয়ার বেশ কিছু মন্দির দর্শন করলাম। কেশব ভারতী-র সঙ্গে যে-মন্দিরে চৈতন্যদেবের সাক্ষাৎ হয়েছিল, সেখানেও গেলাম। মন্দির দর্শন করে মনপ্রাণ জুড়িয়ে গেল। এরপর গেলাম উদ্ধারণপুরের ঘাটে— শ্মশানে। সেখানে এক সাধুর কাছে সন্তোষদা অনেকক্ষণ বসে থাকলেন, কথা হলো ওঁদের মধ্যে। আমি ও ত্রিনাথদাও ছিলাম। আমি নীরব-ই থাকলাম। তরুণ সাধু, জটাজুটধারী, মা কালীর আরাধনা করেন। উদ্ধারণপুরের এই শ্মশানেই ডেরা বেঁধে আছেন। গঙ্গার তীরেই মহাশ্মশান। দূরদূরান্ত থেকে মৃতদেহ সৎকারের জন্য কত মানুষ আসেন এখানে! আমি শ্মশানটা ঘুরে-ঘুরে দেখলাম। গঙ্গার তীরে গিয়ে বসলাম কিছুক্ষণ। মনে এক প্রশান্তি অনুভব করলাম। অনেকদিন পরে কানপুর গিয়েছিলাম। কানপুর থেকে ২১ কিলোমিটার দূরে হিন্দুতীর্থ বিঠুর। বিঠুরের মাহাত্ম্য আমাদের শাস্ত্রে বিধৃত আছে। বলা হয়, এখানকার ব্রহ্মাবর্ত ঘাটে ব্রহ্মার অশ্বমেধ যজ্ঞের নিদর্শন আছে, আর আছে রামায়ণের বাল্মিকীর আশ্রম। যাইহোক, বিঠুরে গঙ্গার তীরে বসে আমার উদ্ধারণপুরের ঘাটের কথা মনে পড়ছিল। উদ্ধারণপুরের ঘাট থেকে কাটোয়ার হোটেলে ফিরে আমরা দুপুরের আহার সারলাম, তারপর বিশ্রাম। অপরাহ্ন শেষে কাটোয়া শহরটা ঘুরে দেখলাম, পায়ে হেঁটে। সন্ধ্যারাতে হোটেলে ফিরে চা খেয়ে নিজেদের মধ্যে গল্প শুরু হলো। আমি ডায়েরিতে সারাদিনের অভিজ্ঞতার নোটস নিলাম। রাতের খাবার শেষে ঘুম। আগামীকাল আমরা সতীপীঠ অট্টহাস যাবো।
পরদিন সকালে ফ্রেশ হয়ে চা-ব্রেকফাস্টের পর্ব সেরে আমরা বাসে করে নিরোল নামক এক স্থানে পৌঁছলাম। বাস থেকে নেমে ভ্যানরিকশায় চেপে অট্টহাসের উদ্দেশে রওনা দিলাম। রাস্তার দু'পাশে গ্রাম; গ্রামীণ জীবনের সজলতা ভরা নানা দৃশ্যে অভিভূত হতে-হতে, ছোটো একটা নদীর সাঁকো পেরিয়ে আমরা গভীর জঙ্গলস্থিত অট্টহাস মায়ের মন্দিরে প্রবেশ করলাম। ঘন গাছপালা ঘেরা মায়ের মন্দিরপ্রাঙ্গণে প্রবেশ করতেই মন এক অনাস্বাদিতপূর্ব আনন্দে বিভোর হয়ে গেল। মাতৃমূর্তি দর্শন করে, মন্দিরের পিছনের জঙ্গলে ঘুরতে শুরু করলাম। এক জায়গায় দেখি, বলি দেওয়ার হাড়িকাঠ। শুনেছি, ডাকাতরা এই মন্দিরে নরবলি দিয়ে ডাকাতি করতে যেত। জঙ্গলের মধ্যে শিয়াল, বেজি, গোসাপ, খরগোশ এই দিনের বেলাতেও দেখতে পেলাম। সাপও প্রচুর আছে, জঙ্গল থেকে বেরিয়ে স্থানীয় একজন মানুষ বললো আমাদের। সাপের কথা শুনেই তাড়াতাড়ি জঙ্গল থেকে বেরিয়ে আমরা মন্দির-চাতালে ফিরে এলাম। দোতলার ঘরে আশ্রমাধ্যক্ষ মহারাজের সঙ্গে দেখা করলাম। কিছু কথা হলো।
উনি জানালেন, "অট্টহাস মন্দিরে বারবার চুরি হয়। চোরেরা মায়ের অলংকার, পুজোর বাসনকোসন সব নিয়ে গেছে। ভক্তরা পুনর্বার মায়ের গহনা গড়ে দিয়েছে। বাসনসামগ্রী এনে দিয়েছে। জানি না, চোরেরা আবার কবে আসবে। প্রশাসনকে সবিস্তারে সব জানিয়েছি। দেখা যাক, সুরাহা হয় কিনা কিছু!" আক্ষেপ ঝরে পড়লো মহারাজের কন্ঠে।
তিনি বললেন, "নদীতে স্নান করুন। ভোগ প্রস্তুত হচ্ছে। মধ্যাহ্নে প্রসাদ নেবেন আপনারা।"
আমরা 'হ্যাঁ' বলে নিচে নেমে এসে ভোগের কুপন কাটলাম তিনটে। তারপর নদীর কাছে গেলাম স্নানের উদ্দেশ্যে। গ্রীষ্মকাল, নদীর জল সামান্যই আছে। কিন্তু যেটুকু আছে, তা স্ফটিকস্বচ্ছ। আমরা বেশ তৃপ্তি করেই স্নানপর্ব শেষ করলাম এবং ডাইনিং হলে ভোগের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। দেবীকে ভোগ নিবেদন করার পরে মন্দিরের স্বেচ্ছাসেবকেরা আমাদের ভোগ পরিবেশন করতে শুরু করলেন। খুব তৃপ্তির সঙ্গে আহারপর্ব সেরে আমরা মন্দিরের আশেপাশে কিছু সময় ঘোরাঘুরি করে, কাটোয়ায় আমাদের হোটেলের উদ্দেশে রওনা দিলাম। রাতে আহার ও বিশ্রামপর্ব সেরে পরের দিন ধীরেসুস্থে বাড়ি ফিরে এলাম। অট্টহাস মন্দিরে মাতৃমূর্তি দর্শন করে আমি খুবই তৃপ্তিবোধ করেছিলাম।
একবার উইক-এন্ড ট্যুরে লালগোলা প্যাসেঞ্জার ধরে আমি ও ত্রিনাথদা জিয়াগঞ্জ গেলাম। জিয়াগঞ্জ স্টেশনে নেমে একটা দোকানে চা-জলখাবার খেয়ে পায়ে-পায়ে পৌঁছে গেলাম এক জৈন-মন্দিরে। এক ধন্যাঢ্য মারোয়াড়ির বাড়িতেই মন্দির। পার্শ্বনাথের মন্দির। বাড়ির সদরদরজা বন্ধ দেখে ফিরে আসার উদ্যোগ করছি; হঠাৎ দেখি, দোতলার ব্যালকনি থেকে এক ভদ্রমহিলা বলে উঠলেন, "আপনারা মন্দির দর্শন করবেন তো? আসুন। এই দারোয়ান, সদরদরজা খুলে দাও।"
আমরা বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করতেই উনি বললেন, "সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে আসুন।"
দোতলায় পৌঁছে দেখি, ভদ্রমহিলা স্বয়ং মন্দিরের দরজা খুলে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছেন। আমরা দেউল ও দেবতা দর্শন করলাম। ভদ্রমহিলা আমাদের প্রসাদ দিলেন। কাজু, কিশমিশ ও মোরব্বা। মহিলা মধ্যবয়সী। অপরূপা সুন্দরী, অভিজাত লাবণ্যে ভরপুর। স্বর্ণালঙ্কারে ভূষিতা। জীবন্ত দেবীদর্শন হলো আমাদের। প্রসাদ নিয়ে আমরা তাঁর কাছ থেকে বিদায় নিলাম। তারপর ওখানকার বিখ্যাত শ্রীকৃষ্ণ মন্দির দর্শন করতে গেলাম। দেবতা বিবিধ স্বর্ণালঙ্কার ও মণিমুক্তায় ভূষিত। বিগ্রহ দর্শনের পরে, মনে খুবই তৃপ্তি অনুভব করলাম। এরপর পায়ে হেঁটে ভাগীরথীর খেয়াঘাটে এসে, নৌকোয় করে পৌছলাম আজিমগঞ্জ। ওপারে গিয়ে ভাগীরথীতে স্নান সেরে নিলাম আমি ও ত্রিনাথদা। তারপর ভাগীরথীর পাড় ধরে পায়ে-পায়ে পৌঁছলাম বড়নগর। যেখানে রানি ভবানী স্থাপিত চারচালা মন্দির। মহাদেব শিবশম্ভু বিরাজ করছেন মন্দিরে। আমরা মন্দিরচাতালে পৌঁছে লিঙ্গ দর্শন করে ফিরতে যাচ্ছি, এমন সময় একজন মহিলা একটা খাতা (ভিজিটরস' বুক) নিয়ে এসে আমাদের অনুরোধ করলেন, "আপনারা দয়া করে এই খাতায় এই মন্দির ও তার ব্যবস্থাপনা বিষয়ে আপনাদের অভিজ্ঞতার কথা লিখুন।"
আমরা তাই করলাম। মন্দিরটি আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া দ্বারা অধিগৃহীত।
এবার একটা ভ্যানরিকশা করে আজিমগঞ্জে ফিরে এসে, একটা খাবারের হোটেলে এলাম। ঝাঁপের হোটেল যাকে বলে, আর কী। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। প্রৌঢ় এক কর্মচারী আদর করে আমাদের কাঠের বেঞ্চিতে বসতে দিলেন। সামনের হাইবেঞ্চে কলাপাতা ও মাটির ভাঁড় দিলেন। ভাঁড়ে জল। কলাপাতা ধুয়ে নিতেই, পাতে ধোঁয়া-ওঠা গরম ভাত ও কলাইয়ের ডাল। সঙ্গে ডাঁটি সমেত বড়ো বেগুনভাজা ও ডালের বড়া। খুবই ক্ষুধার্ত ছিলাম আমরা। সুস্বাদু চিরাচরিত বাঙালি এই পদ তৃপ্তি করে খেতে শুরু করলাম। এরপর এল লাউচিংড়ি। তারপর নদীতে ধরা রুইমাছের ঝোল। বেশ বড়ো সাইজের মাছের টুকরো। আমি একটা গাদা ও একটা পেটির মাছ খেলাম। ত্রিনাথদা মাছ একটাই খেলেন। রোহিত মৎস্য ভোজনের পরে তেঁতুলের চাটনি। আমরা সাদা মিষ্টি দইও খেলাম। মুখটুখ ধোওয়ার পর ভাজা মৌরি দিয়ে মুখশুদ্ধিও হলো। মনে আছে, যা খেলাম তার তুলনায় দাম খুবই কম। প্রচুর লোক খাচ্ছে।
হোটেলের মালিক সদগোপ। বললেন, "স্যার, আপনাদের মা-বাবার আশীর্বাদে হোটেল আমার ভালোই চলছে।"
আমরা হোটেল থেকে বেরিয়ে আবার খেয়াঘাটে পৌঁছে নৌকোয় করে জিয়াগঞ্জ এসে, শ্রীপৎ সিং কলেজটা ঘুরে-ঘুরে দেখলাম। এই কলেজে কৃষ্ণনগরের শ্যামলদা (প্রয়াত শ্যামল রায়) পড়াতেন। খুবই সুনাম ছিল তাঁর। এখন শক্তিনগরের ঋত্বিকের (কবি ও শিক্ষক ঋত্বিক চক্রবর্তী) স্ত্রী দেবযানী ভৌমিক চক্রবর্তী এখানে অধ্যাপনা করছে। শ্রীপৎ সিং কলেজ থেকে স্টেশনের দিকে হাঁটতে শুরু করলাম। সূর্য ক্রমশ ঢলে পড়ছে পশ্চিমদিগন্তে। আমরা বাজারে এক মিষ্টান্ন ভাণ্ডার থেকে কাঁচাগোল্লা কিনে নিলাম বাড়ির জন্য। জিয়াগঞ্জের কাঁচাগোল্লা খুবই বিখ্যাত। কেনার আগে একটু চেখেও দেখলাম। এরপর স্টেশনে পৌঁছে টিকিট কেটে ডাউন লালগোলা প্যাসেঞ্জারের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। নির্দিষ্ট সময়ই ট্রেন এল। আমরা সিটও পেলাম বসার। ফিরতি যাত্রাও ভালো হলো। যথাসময়ে ত্রিনাথদা কৃষ্ণনগরে নামলেন, আমি পরের স্টেশন বাদকুল্লায়। রাত ন'টায় পৌঁছে গেল ট্রেন। যথাসময়ে বাড়ি। দিদির খুব পছন্দ হলো জিয়াগঞ্জের কাঁচাগোল্লা।
আর একবার উইক-এন্ডে বর্ধমান গেলাম। বর্ধমান স্টেশনের কাছেই একটা হোটেলে উঠলাম আমরা। দুই শয্যাবিশিষ্ট ঘর, অ্যাটাচড বাথ। ভালো ব্যবস্থা। হোটেলের ডাইনিং হলে সুন্দর ব্যবস্থা খাবারের। সকালে গিয়েছিলাম। দুপুরে হোটেলে পৌঁছে স্নানাহার সেরে বেরিয়ে পড়লাম। প্রথমে গেলাম বর্ধমানের বিখ্যাত ১০৮টি লিঙ্গবিশিষ্ট শিবমন্দির দর্শন করতে। ঘুরে-ঘুরে আমি ও ত্রিনাথদা ১০৮টি লিঙ্গ দর্শন করলাম। মন্দিরচত্ত্বরে কিছুক্ষণ বসে, বাইরে এসে রাস্তার ধারের এক চায়ের দোকানে চা-বিস্কুট খেয়ে বাসে করে রওনা দিলাম কাঞ্চননগরের উদ্দেশে। কাঞ্চননগরে বিখ্যাত কালীমন্দির কঙ্কালীমা-কে দর্শন করলাম। মন্দিরচাতালটি পরিক্রমা করলাম। পঞ্চমুণ্ডির আসন দেখলাম। সবকিছু মিলেমিশে এক গা-ছমছমে অনুভূতি হলো। এরপর হেঁটে-হেঁটে বর্ধিঞ্চু গ্রামটির ভিতর দিয়ে এসে পৌঁছলাম বাসস্ট্যান্ডে। বাস ধরে হোটেল।
পরের দিন ভোরে ট্রেন ধরে বোলপুর-শান্তিনিকেতন। স্টেশন থেকে রিকশা করে ভুবনডাঙা পেরিয়ে বিশ্বভারতী পৌঁছে দর্শনীয় স্থান কিছু দেখে নিলাম। এরপর একটা টি-স্টলে চা-বিস্কুট খেয়ে রবীন্দ্রভবন দর্শন করে, খোলা আকাশের নিচে দাঁড় করিয়ে রাখা রামকিঙ্কর বেইজ-এর সুজাতা, কলের বাঁশি ইত্যাদি ভাস্কর্য এবং কলাভবন চত্ত্বর ঘুরে দেখে হেঁটে-হেঁটে পৌঁছে গেলাম সুবিশাল এক দিঘির কাছে। সেখানে আমাদের কাঁধঝোলা থেকে তেল, গামছা ইত্যাদি বের করে প্রাণ ভরে দিঘির কাচ-স্বচ্ছ জলে স্নান করে নিকটবর্তী এক হোটেলে এলাম। মাটির দেওয়াল। হোগলার ছাউনি। শালপাতার থালা, মাটির ভাঁড়ে পানীয় জল। গরম ভাত, বেগুনভাজা, ডাল, বাটামাছের ঝাল, টমাটোর চাটনি ও সাদা মিষ্টি দই সহকারে বিলম্বিত মধ্যাহ্নভোজ সেরে প্রান্তিক স্টেশন। এবার ট্রেনে করে বর্ধমান। তারপর ব্যান্ডেল। ব্যান্ডেল থেকে নৈহাটি। নৈহাটি থেকে কৃষ্ণনগর লোকাল ধরে বাড়ি। বর্ধমান ও শান্তিনিকেতন ভ্রমণ বেশ মনের মতোই হলো। জীবনে প্রথম শান্তিনিকেতন গিয়েছিলাম অবশ্য সড়কপথে। জয়ের (কবি জয় গোস্বামী) বন্ধু অতুলের গাড়িতে। আমাদের সঙ্গে বজাইও ছিল। আমি আমার মতো ঘুরেছি। একা-একাই। কারণ, জয় একজন বিখ্যাত সাহিত্যিকের বাড়িতে ছিল। আর, অতুল ও বজাই একটু অন্যভাবে এনজয় করেছে। শান্তিনিকেতন আমাকে একেবারে আনন্দে বুঁদ করে রেখেছিল। যে-কোনো জায়গায় প্রথমবার বেড়াতে যাওয়ার আনন্দই আলাদা।
প্রসঙ্গত মনে পড়ছে, জীবনে প্রথম দীঘায় বেড়াতে যাওয়ার কথা। সেবার পাড়া থেকে সন্ধ্যারাতে বাস ছাড়লো। তখন উত্তর সুরভিস্থানে মিলন সংঘের কাছে আমাদের বাড়ি। নীহারদা-র (শিক্ষক নীহারেন্দু মজুমদার, প্রয়াত) নেতৃত্বে পাড়ার লোকজন মিলে দীঘা ভ্রমণ। সঙ্গে মহিলারাও ছিলেন। ভোরবেলা দীঘা পৌঁছেই সি-বিচে আমরা। আমি জীবনে সর্বপ্রথম সমুদ্র দেখছি। সে এক অনিন্দ্যসুন্দর অভিজ্ঞতা। বিচের উপর দিয়ে সিগাল, করমোর্যান্ট...আরও কত-কত সামুদ্রিক পাখি উড়ে বেড়াচ্ছে। সমুদ্রের আলতো ঢেউ (তখন তো ভাটা) পা ডুবিয়ে দিচ্ছে। আবার জল সরেও যাচ্ছে। ট্রাউজার্স হাঁটু পর্যন্ত গুটিয়ে নিয়েছি। তবুও এক-একটা ঢেউ হাঁটু ছাপিয়ে যাচ্ছে কখনো-সখনো। জল সরে যেতেই দেখি, পায়ের কাছে বিচিত্র রঙ ও আকৃতির ঝিনুক, লাল কাঁকড়া...আরও কত সামুদ্রিক জীব। অনেকক্ষণ সি-বিচে ছিলাম। তারপর হালকা সমুদ্রস্নান সেরে (আমি তো সাঁতার জানি না, তাই ভয়ে-ভয়ে) হোটেলে এসে আবারও স্নান করে ফ্রেশ হয়ে খাদ্যের সন্ধানে ঝাঁপের হোটেলে। সে তো ১৯৭৪-৭৫, খাবার সস্তা। এক বড়ো ঝাঁপের হোটেলের বেঞ্চিতে বসে ভাত খাওয়া শুরু হলো। পেটচুক্তি খাওয়া। অর্থাৎ, যে যত পারো খাও। সাধারণ খাবার একেবারে। গরম ভাত, মুসুরির ডাল, আলু-পটলের তরকারি, কী একটা সামুদ্রিক মাছ, তেঁতুলের অম্বল। আমার তো তোফা খাওয়া হলো। তো, একটা মজা হলো। আমাদের দলে বলাই নামে একটা ছেলে ছিল। কৃষক-সন্তান। সে নিজেও মাঠে বাবার সঙ্গে কাজ করে। পেটানো চেহারার জোয়ান ছেলে। আমাদের প্রত্যেকের খাওয়া শেষ। বলাই কিন্তু খেয়েই চলেছে।
হোটেল-মালিক তাঁর নেয়াপাতি ভুঁড়িটি নিয়ে ধুতির কাছা সামলে বলাইয়ের কাছে এসে বলছেন, "বাবা, তোমরা মোট ৩২ জন খেলে আমার হোটেলে। তরিতরকারি তো সব শেষ। শুধু হাঁড়িতে অল্প ভাত আর কড়াইয়ে অল্প একটু ডাল পড়ে আছে।"
বলাই অম্লানবদনে বললো, "কিচ্ছুটি লাগবে না। শুধু ভাত আর ডাল-ই দিতে বলুন। আর, পেঁয়াজ কেটে দিতে বলুন।"
তাই হলো। ভাত ও ডাল শেষ হলো ওদের ভাঁড়ারের। বলাইয়ের খাওয়াও শেষ হলো। নীহারদা দয়াপরবশ হয়ে হোটেল-মালিককে কিছু টাকা বেশি দিতে চাইলেন। নিলেন না তিনি। বললেন, "না-না কথা, কথা। পেটচুক্তি খাওয়া। বেশি নিলে আমার অধর্ম হবে। আমি অবশ্য ছেলেটির খাওয়া দেখে আনন্দই পেয়েছি। আবারও এসো বাবা।"
মনে-মনে বলছি, আবারও বলাইয়ের সঙ্গে! এরপর তো হোটেলের লোক আমাদের দেখেই বলবে, না-না, ভাত নেই! অন্য হোটেলে দেখুন।
অপরাহ্নে আবার আমরা সমুদ্রসৈকতে। এখন তো জোয়ার চলছে। সমুদ্রের রঙ পাল্টে গিয়েছে। আমরা সমুদ্র থেকে নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে উচ্ছল ঢেউয়ের খেলা দেখছি। ধীরে-ধীরে সূর্য বড়ো একটা বল হয়ে সমুদ্রে ডুবে গেল। আহা, সৈকতে সূর্যাস্তের সে কী মনোহরণ সুরেলা দৃশ্য! আমি বাকরুদ্ধ। বাড়ি ফিরে কবিতাও লিখেছিলাম। হারিয়ে ফেলেছি।
আরও একটা কথা বলতে ভুলে গিয়েছি। ভোরে, তারপর সকালে গভীর সমুদ্র থেকে মৎস্যজীবীরা তাদের নৌকো করে একে-একে ফিরছে। নৌকো বোঝাই কত বিচিত্র রঙ ও আকৃতির মাছ। ধীবরেরা নৌকো টেনে নিয়ে এসে মাছ বেছে-বেছে বিভিন্ন পাত্রে রাখছে। কিছু মাছ দেখলাম ফেলেও দিচ্ছে। সে এক দৃশ্য! সত্যি, সমুদ্রের কাছে না-এলে এসব দৃশ্য থেকে বঞ্চিতই তো থাকতাম!
সন্ধ্যারাতে আমাদের বাস ছাড়লো। রাত ন'টা নাগাদ আবারও একটা হোটেলে ভাত খেলাম। এবার বলাই একটু কম খেল। তাও অন্তত এক কেজি চালের মতো ভাত! সঙ্গে ডাল, তরকারি, ডিমের ঝোল। ভোররাতে বাড়ি ফিরলাম। দীঘা ভ্রমণ আমার ভালোই হলো। জীবনে এই সর্বপ্রথম বাড়ির বাইরে কোথাও বেড়াতে যাওয়া। খরচও সাধ্যের মধ্যে। ভ্রমণসঙ্গীরাও সব ঠিকঠাক। অতএব সব মিলিয়ে আমার বেশ ভালো একটা অভিজ্ঞতা হলো। মনে আছে, বাড়ির জন্য দীঘা থেকে কাজুবাদাম কিনে এনেছিলাম। বাড়ির সবাই খুব খুশি।
বাড়ির সবাইকে নিয়ে একবার গয়া, বুদ্ধগয়া, রাজগীর, নালন্দা, পাওয়াপুরী, বেনারস বেড়াতে গিয়েছিলাম। সঙ্গে অলোক (কবি ও শিক্ষক অলোক বিশ্বাস), ওর স্ত্রী চন্দ্রলেখা ও দুই কন্যা কাশ্মীরা আর কীর্তিকা ছিল। আর আমাদের পরিবার থেকে দিদি, আমি ও দুই ভাগ্নে জয়ন্ত এবং রাজু। বেশ চমৎকার ভ্রমণ হয়েছিল, কিন্তু রাজগীরে আমি একটু অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম। ডায়েরিয়া হয়েছিল হঠাৎ। যে-হোটেলে ছিলাম, তার মালকিন এক ভদ্রমহিলা, অপূর্ব ব্যবহার। তিনি আমার চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছিলেন। ভদ্রমহিলা তরুণী, সুন্দরী, কলকাতা পুলিশের ইন্সপেক্টর। তখন ছুটিতে ছিলেন। তাঁর স্বামীর আকস্মিক মৃত্যু হওয়ায়, মৃত স্বামীর এই হোটেলটি দেখভাল করার জন্য মাঝেমধ্যে ছুটি নিয়ে কলকাতা থেকে রাজগীরে চলে আসতেন। সুস্থ হয়ে উঠে আমি রাজগীরের উষ্ণ প্রস্রবণে স্নান করতে গিয়েছিলাম। স্নান শেষে শরীর ও মনে পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠি। রাজগীর থেকে বারাণসী। সেখানে বিশ্বনাথ মন্দির, মা অন্নপূর্ণার মন্দির, দশাশ্বমেধ ঘাটে সন্ধ্যারতি দর্শন করে মন আনন্দে ভরপুর হয়েছিল। বাবা বিশ্বনাথ দর্শন খুব সুন্দরভাবে হলো, আর মা অন্নপূর্ণাকে দেখে আমি অশ্রু ধরে রাখতে পারিনি। একেই বলে আনন্দাশ্রু।
এর পরেও ত্রিনাথদা-র সঙ্গে বারাণসীতে একাধিকবার গিয়েছি। প্রতিবারই আনন্দে আমার মন ও আত্মা পরিপূর্ণ হয়েছে। মা গঙ্গার ধারে খুব ভোরে ও সন্ধ্যায় ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থেকেছি দুই বন্ধু। কখনও বিড়লাদের অতিথিশালায়, কখনো-বা বাঙালিটোলার ছোটো হোটেলে থেকেছি। নিরামিষ আহার ভক্ষণ করেছি। তৃপ্তিতে মন ভরে গিয়েছে। আর গঙ্গার ধারে পুরি, ছোলার ডাল, জিলাপি ও রাবড়ির স্বাদ এ-জীবনে ভোলার নয়।
(ক্রমশ)
Comments
Post a Comment