অর্বাচীন একা-একা হাঁটে। কোনো দিক নেই, নির্দেশ নেই। হাঁটতে-হাঁটতে ভাবে, শুধু ভাবে। ভাবনার কোনো ইতি নেই। এই যেমন সে ভাবছে, নির্বাচন আসছে। নির্বাচন নামক একটি গোলাকার পিণ্ড যে ধেয়ে আসছে, সেটা সে বুঝতে পারে খবরের কাগজে চোখ রাখলেই। নির্বাচন মানেই নানা দলের নানারঙের চুলকানির শুরু। বিটেক্স মলম লাগিয়েও চুলকানি সারে না। কারও-কারোও গায়ে দাদের মতো গুটি-গুটি চাক বেঁধে যায়। কত তার বাহার। কত রঙ।
একা-একা হাসে অর্বাচীন। হাসতে-হাসতেই সে ভাবে, নির্বাচন এলেই এক-একজনের দম বন্ধ হয়ে আসে। শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। কেউ আবার দলের মধ্যে গণতন্ত্র খুঁজে পায় না। কেউ-কেউ আবিষ্কার করে, সে যে-মই বেয়ে তরতর করে উপরে উঠছিল, আসলে সে ওঠেনি; ওই মই বেয়ে অন্য কেউ উঠেছে। সে যেমন নিচে ছিল, তেমন-ই নিচেই আছে। এই বোধোদয়ের পর অমনি সে সোঁদরবনের বাঘ হয়ে যায়। হুঙ্কার ছাড়ে, টেলিগ্রাম, টেলিগ্রাম...গণতন্ত্র বিপণ্ণ...ফ্যাসিস্ত ফ্যাসিস্ত...
এদিকে খবরের কাগজ আর নানা কিসিমের খবরমাধ্যম রটিয়ে দিল...আরে ভাই, ওর সামনে সোনার খাঁচায় টাটকা মাংস ঝুলানো আছে। ঢুকলো বলে।
মানুষের এক-দুই-তিন জল্পনার মধ্যেই বাঘ গিয়ে ঢুকলো সাজানো খাঁচায়। সাংবাদিকরা ছুটলো। মুখের সামনে লাঠি বাঁধা শব্দযন্ত্র ধরে সাজানো প্রশ্ন করলো। বাঘ কৃত্রিম হাসি আর সামান্য রাগ মিশিয়ে গোল-গোল উত্তর দিল।
নিন্দুকেরা বললো, এ তো নির্বাচনের খেলা রে ভাই, নির্বাচনের খেলা। দোকানদারের ব্যাটা যেভাবে মাঠ চষছিল, তাতে রাজপুত্তুর কালো মেঘের আভাস পাচ্ছিল। অমনি সে কোম্পানিকে বললো, ওকে খাঁচায় বন্দি করো।
কোম্পানি ক'দিন টোপ দিয়ে যখন টের পেল এ বড়ো কঠিন ঠাঁই, তখন রাজপুত্তুরের কাছে নালিশ জানালো, স্যার, মালটা বড়ো টেঁটিয়া স্যার।
রাজপুত্তুর বললে, ধুস, অ্যাদ্দিন কাজ করছো, আর কী করতে হবে, আমায় বলতে হবে? শোনো, ভয় দেখাও, অবিরত ভয়। বাপের ব্যবসা বন্ধ করে দাও। মেয়ে যখন স্কুলে যাবে, তখন তাকে ভয় দেখাও। লোভ দেখাও। রাতের অন্ধকারে দু-চার ঘা বসিয়ে দাও। বলো, "হয় তুমি আমাদের পতাকা ধরো, নয় মরো"। ইলোপ করো। যন্তরমন্তর ঘরে ঢুকিয়ে দাও। মগজধোলাই করো।
নিন্দুকেরা বললো, এ তো নির্বাচনের খেলা রে ভাই, নির্বাচনের খেলা। দোকানদারের ব্যাটা যেভাবে মাঠ চষছিল, তাতে রাজপুত্তুর কালো মেঘের আভাস পাচ্ছিল। অমনি সে কোম্পানিকে বললো, ওকে খাঁচায় বন্দি করো।
কোম্পানি ক'দিন টোপ দিয়ে যখন টের পেল এ বড়ো কঠিন ঠাঁই, তখন রাজপুত্তুরের কাছে নালিশ জানালো, স্যার, মালটা বড়ো টেঁটিয়া স্যার।
রাজপুত্তুর বললে, ধুস, অ্যাদ্দিন কাজ করছো, আর কী করতে হবে, আমায় বলতে হবে? শোনো, ভয় দেখাও, অবিরত ভয়। বাপের ব্যবসা বন্ধ করে দাও। মেয়ে যখন স্কুলে যাবে, তখন তাকে ভয় দেখাও। লোভ দেখাও। রাতের অন্ধকারে দু-চার ঘা বসিয়ে দাও। বলো, "হয় তুমি আমাদের পতাকা ধরো, নয় মরো"। ইলোপ করো। যন্তরমন্তর ঘরে ঢুকিয়ে দাও। মগজধোলাই করো।
তাই হলো। রাজপুত্তুরের কোম্পানি চিত্রনাট্য তৈরি করে বাঘের মগজ ধোলাই করলো। বাঘ পার্ট মুখস্থ করে হুঙ্কার ছাড়লো। কোম্পানি বললো, এখন কদিন তোমার দলের বিরুদ্ধে হুঙ্কার ছাড়ো। আমরা পদত্যাগপত্র লিখে রাখছি। আমাদের উপদেষ্টা চোরঘোষদা যেদিন বলবে, আমরা পদত্যাগ পত্র বাজারে ছেড়ে দেবো। তারপর দেখবে খেলা কোনদিকে ঘোরে।
বাঘ কিছুক্ষণ গুম মেরে থেকে বললো, ঠিক আছে, তাই হোক।
বাঘ কিছুক্ষণ গুম মেরে থেকে বললো, ঠিক আছে, তাই হোক।
অর্বাচীন নির্বাচনের সময় দলবদল তো কম দেখলো না। ভোট এলেই অনেকের দম বন্ধ হয়ে আসে, হাঁসফাঁস করে। তারপর পতাকা পাল্টায়। কিছুদিন পর নতুন দলে কল্কে না-পেয়ে সুড়সুড় করে পুরোনো দলে ফিরে আসে। এসব মাদারি খেলা সে অনেক দেখেছে। তবে এবার বাঘ আর রাজপুত্তুরের খেলাটা যেন জম্পেশ নাটক হয়ে গেল। বাঘ একাই হুঙ্কার ছেড়ে গেল। তার পুরোনো দল তেমন কোনও প্রতিক্রিয়া দিল না। বড়ো গণমাধ্যমগুলো খুব চেষ্টা করলো, কিন্তু ঠিক জমাতে পারলো না। বাঘ একাই হুঙ্কার ছেড়ে গেল, আর ওদিকে পু্রোনো দল তাকে ছেঁড়া কাঁথার মতো ময়লার গাড়িতে ফেলে দিল। বাঘেরও হুঙ্কার কমতে শুরু করলো। সে জানে, পুরোনো দলে ফেরা সম্ভব নয়। ওই দলের দরজা একবার বন্ধ হলে আর খোলে না। যে-দলে নাম লেখালো, সেখানে দম বন্ধ হলে তার বড়দা-র কাছে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই। বাঘ এটা জানে। সে অবশ্য এখনও নতুন খাঁচার গুণগান গেয়ে যাচ্ছে। তবে অর্বাচীনের বিলক্ষণ বিশ্বাস, খুব শিগগিরই বাঁড়ুজ্জে বামুন পৈতে তুলে বলবে, এবার তুই ইঁদুর হ'।
বাঘের কী হবে?
বাঘ নেংটি হয়ে সোঁদরবনে ঘুরঘুর করবে। এর-ওর বাড়ির মাছের টুকরোটা নিয়ে দৌড়াবে। কারও বাড়ি ঢুকে দলিল কুচি-কুচি করবে। ওর বড়দা-র মতো হিটলারকে লেনিন বানিয়ে দেবে।
সোঁদরবন ইঁদুরের উৎপাতে অতিষ্ঠ হয়ে উঠবে। বাঘ মনে-মনে ভাববে, জমি চষে মাঠভর্তি যে-ধান লাগিয়েছিলাম, তার গোড়া এবার আমাকেই কাটতে হবে। নইলে বিপদ, বিপদ!
ইঁদুর বিষণ্ণ। সমাজমাধ্যম থেকে ভ্যানিশ। খবরের কাগজে দু'য়ের পাতায় দিনপঞ্জির নিচে এককলম চারলাইনের খবর হয়ে যাবে। বড়ো-বড়ো খবরের কাগজের সাংবাদিকরা তাকে দেখে একভাঁড় চা খাইয়ে ঘরের খবরের খোঁজ নেবে। তারপর চরম উপেক্ষায় পড়ে থাকবে সোঁদরবনের একপ্রান্তে।
অর্বাচীন এসব ভাবে। ভাবতে-ভাবতে হাঁটে। হাঁটতে-হাঁটতেই তার মনে একটি পংক্তি গুনগুন করে— তাহাকে হারাইয়া প্রমাণ করিতে হইবে সে আর জনগণের নেতা নয়।
Comments
Post a Comment