শহরের কথা বলতে গেলেই চলে আসে ফেলে আসা দিনগুলোর কথা। আমার যখন বেড়ে ওঠা, তখনও জলঙ্গি নদীতে অনেক স্রোত বয়ে যেত, বিকেলের শেষ আলো নদীর জলে ঝিকিমিকি করতে-করতে অভ্যর্থনা করত পরের দিনটিকে। জলঙ্গির পাশ দিয়ে পুরোনো রাস্তা গোয়াড়িবাজার, যেখানে আজও মানুষগুলোর আন্তরিকতায় পুরোনো দিনের স্পর্শ পাওয়া যায়। শহরের অন্যতম উৎসব জগদ্ধাত্রী পুজো-সহ নানা পুজোর উপাচার-সহ শহরের বর্জ্য জমে-জমে ও প্রবাহের পথে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে ঐতিহাসিক নদীর মৃতপ্রায় অবস্থা আজ হতাশা জাগায়। তবু এখন অনেক সামাজিক সংগঠন এগিয়ে এসেছে নদী বাঁচাতে, সেখানে প্লাস্টিক বা বর্জ্য যাতে না-ফেলা হয়—সেই আন্দোলনে সামিল হয়ে; এ আশাব্যঞ্জক।
ছোটোবেলা থেকে দেখে আসা শহরের রাস্তা অলিগলি পরিচিত হলেও আশেপাশে নতুনত্ব ছোঁয়ায় আজ তারা নবীন হয়ে উঠেছে। এই শহর সংস্কৃতির শহর, সেই প্রাচীন আমল থেকেই রাজার পৃষ্ঠপোষকতায় তৈরি হয়েছে এই শহরের সংস্কৃতির ভাণ্ডার, যা আজও অফুরান। এখানে ইতিহাসের কথা লিখতে আসা নয়, কারণ এই ইতিহাস সকলে জানেন। আমার বেড়ে ওঠার পথে শহরের নিবিড় সান্নিধ্যসুখ বলতে গেলে সেই ছোটোবেলাটাই ঘুরেফিরে আসে। দাদুর মুখে শোনা, দাদুদের অল্প বয়সে পোস্টঅফিসের মোড়ে একটা প্রকাণ্ড শিশুগাছের নিচে জগদ্ধাত্রী পুজো হতো। ঘূর্ণিতে মূর্তি তৈরি হতো আর শুনেছি সেখানে দেবীমূর্তির মাথাটি আলাদাভাবে তৈরি হতো আর সবশেষে দেবীর গ্রীবার উপর বসিয়ে দেওয়া হতো। তারপর হতো চক্ষুদান। তখনকার ঘূর্ণিতে ইলেকট্রিক আসেনি। একটি ছোটো গ্রাম, যা আমার দেখা ছোটোবেলাতে সামান্য উৎকর্ষের ছোঁয়া পেলেও আজকের দিনে দাঁড়িয়ে জগদ্ধাত্রী পুজোতে সবথেকে বেশি মনোযোগের দাবিদার। ঐতিহ্যমণ্ডিত সব পুজোগুলোই শহরের মধ্যে হলেও থিমভিত্তিক পুজো আজ সবই ঘূর্ণিতেই। যদিও সেখানে ঘরে-ঘরে পালদের পৈতৃক ব্যবসা, আজ জীবনের প্রয়োজনে একই কাজে ব্যাপৃত না-থেকে অন্য জীবিকাতেও ছড়িয়ে গিয়েছেন তারা।
আমার শহর বরাবরের নজরকাড়া এই জগদ্ধাত্রী পুজোর পরের দিনের শোভাযাত্রার জন্য। কৃষ্ণনগরের পুজোর পরের বছর প্রচলিত চন্দননগরের পুজো আলোকশিল্পে অভিনবত্ব দেখালেও প্রতিমা নির্মাণে, দেবীমূর্তির মুখাবয়বে বা সিংহ-প্রতিকৃতি নির্মাণে কৃষ্ণনগর শহরের সেরার শিরোপা কেড়ে নেওয়ার প্রতিপক্ষ আর কখনোই তৈরি হবে না। এসব ঐতিহ্য দেখতে-দেখতে শুনতে-শুনতে বেড়ে ওঠা এই শহরে যা নিজের কাছে ভীষণই গর্বের যে, আমিও একজন কৃষ্ণনাগরিক।
কৃষ্ণনগর নামটি উঠলেই সঙ্গে-সঙ্গে উচ্চারিত হয় কৃষ্ণনগর কলেজিয়েট স্কুলের নাম। বঙ্গের গৌরব ব্যারিস্টার মনমোহন ঘোষের বাড়িটিই কলেজিয়েট স্কুল, যা তিনি দান করেছেন। ১৮৪৬ সালে তিনজন ইউরোপীয় এবং দশজন ভারতীয় শিক্ষক নিয়ে অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান স্থাপত্যে লাল ইট দিয়ে তৈরি কৃষ্ণনগর কলেজিয়েট স্কুল। প্রথম অধ্যক্ষ ছিলেন শিক্ষাবিদ স্যার ডি এল রিচার্ডসন। এই বিদ্যালয়ে পড়িয়েছেন রামতনু লাহিড়ী, মদনমোহন তর্কালঙ্কার, বেণীমাধব দাসের মতো পণ্ডিতেরা।
মহারাজা রুদ্র রায়ের প্রপৌত্র মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায় ছিলেন নদিয়া রাজবংশের উল্লেখযোগ্য রাজা। কৃষ্ণনগরের আগে নাম ছিল রেউই গ্রাম। এই গ্রামের অধিবাসীরা সকলেই কৃষ্ণভক্ত ছিলেন ও তাদের জীবিকা ছিল গোপালন ও দুগ্ধবিপণন। মহারাজা রুদ্র রায় রেউই থেকে কৃষ্ণনগর নামকরণ করলেন। এরপর কৃষ্ণচন্দ্র মহারাজার সময়ে (১৭২৮-১৭৮২) এই শহরকে কেন্দ্র করেই বাংলার শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতির চর্চা হয়েছিল।
নদিয়ারাজের দেওয়ান কার্তিকেয়চন্দ্র রায়ের পুত্র দ্বিজেন্দ্রলাল রায় এই শহরের ভূমিপুত্র। তাঁর জন্মভিটের ভগ্নাবশেষ আজও আছে স্টেশনের পাশেই। আছে দ্বিজেন্দ্র পাঠাগারও। কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর জীবনের উল্লেখযোগ্য তিনটি বছর কাটিয়েছিলেন যে-বাড়িটিতে, আজ সেই গ্রেস কটেজ হেরিটেজ স্বীকৃতি পেয়েছে। সাহিত্যিক প্রমথ চৌধুরীর আদিবাড়ি রবীন্দ্র-স্মৃতিধন্য রানিকুঠিও হেরিটেজ আখ্যা পেয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই বাড়িটিতে কিছুদিন ছিলেন। কৃষ্ণনগর শহরের ঐতিহ্য বলে শেষ হওয়ার নয়। আজকের পর্বে যে-সরপুরিয়া সরভাজার উল্লেখ দিয়ে শেষ করছি, সেই মিষ্টিমুখ নিয়ে আবারও পরের পর্বে দেখা হবে।
(ক্রমশ)
Comments
Post a Comment