শর্মিষ্ঠা ঘোষ

ছোটোবেলায় মা বকলে বম্মার পেছনে গিয়ে লুকিয়েছি। জেঠুমুনির সাইকেলের হ‍্যান্ডেলে চড়ে কতদিন গার্লস স্কুলে গেছি। ক্লাস সিক্সের রেজাল্টের দিন‌ও রেজাল্ট নিয়ে ফিরেছি জেঠুমুনির সাইকেল চড়ে। পড়তাম ওইপারের গার্লস স্কুলে। ওই স্কুল বাড়ি থেকে অনেক দূরে, কিন্তু আমার মাও পড়েছে এখানে। তাছাড়া বাবার মাসতুতো দিদি রত্না রায় এই স্কুলের শিক্ষিকা। তাই বাড়ির কাছের পার্বতী স্কুলে প্রথমে মা নিয়ে গেলেও বাবা নিয়ে গেল ওইপারের গার্লসেই। ক্লাস সিক্সে আমার দু'বেণী ঝোলানো লম্বা চুল কাটা হয়েছিল জেঠুমুনির সাথে গিয়ে রায়বাড়ির নিচের জেন্টস সেলুনে। রায়বাড়ি এখনও দাঁড়িয়ে আছে লাইনবাজারের আগে গার্লস স্কুলের মোড়ে । ওইবাড়ির এক ছেলে জেঠুমুনির বন্ধু ছিলেন। প্রদীপ নাম সম্ভবত। চৌকোপানা মুখ। সাইকেল চড়ে প্রায়ই আসতেন জেঠুর কাছে। ওদের বাড়িতে কালীপুজোয় গুষ্টিসুদ্ধ প্রসাদ খেতে গেছি। দোতলা বাড়ি। গোটা-গোটা আম কেটে দিত। ওদের-ই পুকুর ছিল। ওই অঞ্চলের বিখ্যাত পুকুর। এখনও খানিকটা থাকতে পারে। উকিলপাড়া এখন ঘিঞ্জি হয়েছে আগের তুলনায়। অনেক ফাঁকাই বুজে এখন বড়ো-বড়ো আবাসন। তো, সেই পুকুরের নাম ছিল রায়দিঘি। পুকুরে মাছ চাষ হতো। জেঠুমুণির ছিল মাছ ধরার নেশা। বঁড়শি ছিল। হুইল লাগানো। মাছের চার তৈরি হতো পিঁপড়ার ডিম, পাঁউরুটি, কেঁচো—এসব দিয়ে। বড়ো-বড়ো রুই-কাতলা উঠতো প্রায়‌ই। আর সেদিন বম্মা এত্তো বড়ো বঁটি নিয়ে উঠোনে বসবে মাছ কাটতে। আমরা কাজিনরা ঘিরে রাখবো। দেখবো। কী নিপুণভাবে অতবড়ো মাছ কেটে পিস করছে বম্মা। বাড়ির সকলের জন্য একপিস অন্তত বরাদ্দ। আর একটা মজার খবর না-দিলেই নয়। এসবের বহুবছর পর যখন বম্মা, জেঠুমুণি কেউই আর নেই; কলকাতায় নবনীতা দেবসেনের 'ভালোবাসা' বাড়িতে আলাপ হয় 'স‍ই' সংগঠনের সদস্য বিশিষ্ট লেখিকা স্বপ্নাদি-র সাথে, জানা হয় স্বপ্নাদি রায়গঞ্জের ওই রায়বাড়ির মেয়ে। পৃথিবীটা গোল যে!

ফিরি সেলুনে। তখন এখানে কোথায় বিউটিপার্লার! প্রথম খুললো থানা রোডে, 'গ্ল্যামারাস' নাম। আরেকটা লিচুতলায়। আমাদের এপারে প্রথম খুললো সুপার মার্কেটে। 'ড্রিমগার্ল' নাম। ড্রিমগার্ল মানেই মানুষ তখন বুঝতো হেমা মালিনী-কে। একবার বারোবিঘা মাঠে যাত্রা এসেছিল। সুপ্রিয়া দেবী এসেছিলেন। আর এসেছিলেন হেমা মালিনী। যাত্রার আগে শিবতাণ্ডব জাতীয় একটি ক্লাসিক বেসড নৃত্য পরিবেশন করেছিলেন তিনি। এত ছোটো ছিলুম যে, এর বেশি মনে নেই। আমার তখন ক্লাস এইট। তার আগে বাড়িতে কাঠের বাক্স নিয়ে নাপিতভাই আসতেন। ভাইবোনরা জলচৌকিতে বসে তার কাছে চুল কাটতুম। সে পাইকারি হারে বাটি ছাঁট দিত। শেষ তাকে বাক্স হাতে দেখেছি বোধহয় আমার বিয়ের সময়। ববিদি তখন 'ড্রিমগার্ল'-এ জয়েন করেছিলেন পাহাড় থেকে এসে। পাশেই ছিল মিলুদের দোকান। মিলু, মানে প্রলয়, আমার সহপাঠী; বিদ্যাচক্র স্কুলের একাদশ, দ্বাদশে। ওর বাবা আর দাদা দোকানে বসতেন। ওর দাদার সাথে বিয়ে হয় এই ববিদির। পরবর্তীতে ববিদি নিজের পার্লার খোলেন। কয়েক বছর আগে 'ড্রিমগার্ল' উঠে যায়। ববিদির পার্লার আগে ছিল 'কালার ল্যাব'-এর পাশে। আমার বিয়ের সময় ববিদি সাজিয়েছিলেন আমায়। আমার মেয়ের কান ফুটোও হয়েছে ওখানে। এখন সেই পার্লার বিধাননগরের গলিতে। রায়গঞ্জে 'হাবিবস' চলে এসেছে বেশকিছু বছর আগেই। আমার এক কলিগের পরিবারেরও 'হাবিবস'-এর ফ্রাঞ্চাইজি আছে। 'নীলডেভিডস'ও আছে এখন রায়গঞ্জে। আমার মেয়েরা কাঠের বাক্স হাতে এই নাপিতভাইকে দেখেইনি কখনও। বেঁচে থাকলে তিনিও হয়তো ফিরে গেছেন বিহারে, তাঁর ছেড়ে আসা গ্রামে।
(ক্রমশ)

Comments