অরুণাংশু জেমস বিশ্বাস

সকাল থেকে কিছুতেই কোনো কাজে মন বসাতে পারছে না তনয়া। রান্নাঘরে বারবার সব কাজে ভুল হয়ে যাচ্ছে। ছেলের টিফিন, স্বামীর অফিস যাওয়ার আগে গরম ভাত আর মাছের ঝোল সবই কেমন যেন আজ অসহ্য লাগছে। রান্নাঘরে ব্ল্যাক গ্র্যানাইটের কাউন্টার-টপের উপর রাখা মোবাইল ফোনটার দিকে বারবার চোখ রাখতে গিয়ে কখনও গরম ভাতের হাঁড়িতে ছ্যাঁকা খেয়েছে আবার কখনো-বা তরকারিতে দু'বার নুন দিয়ে ফেলেছে। ছেলেকে একরকম দায়সারাভাবেই স্কুলে পাঠালো তনয়া। তারপর অরূপ স্নানঘরে ঢুকতেই দৌড়ে মোবাইল ফোনটা অন করে হোয়াটসঅ্যাপটা চেক করলো। রজতের প্রোফাইল থেকে একটা ম্যাসেজ এসে বসে আছে, সেটা খুলে পড়লো তনয়া—"আই উইল পিক ইউ আপ অ্যাট ইলেভেন থার্টি শার্প"। কাটা মুরগির মতো হৃদপিণ্ডটা ছটফটিয়ে উঠলো তনয়ার।

অরূপ অফিসে চলে যাওয়ার পর উত্তেজনায় ডাইনিং টেবিলের চেয়ারে কিছুক্ষণ বসলো তনয়া। মনে পড়ে গেল রজতের সাথে ওর প্রথম দেখার দিনটা। তনয়ার স্কুলের বেস্টি ছিল ঋতু। হায়ার-সেকেন্ডারির পর আর যোগাযোগ  ছিল না। ছয়মাস আগে এক মলে হঠাৎ ঋতুর সঙ্গে দেখা। এতদিন পর বেস্টির সাথে হঠাৎ দেখা মুহূর্তের আবেগ আনলেও সেই টানটা আর অনুভব করলো না তনয়া। কিন্তু ঋতু যখন তার স্বামী রজতের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল, তখন রজতের কাটা-কাটা চেহারা আর রিমলেস প্রগ্রেসিভ গ্লাসের ভিতর টানা-টানা চোখদুটো তনয়াকে টেনেছিল। সে রাতে রজতের চোখদুটো তনয়াকে ঘুমাতে দেয়নি। ঋতুর সঙ্গে মোবাইল নাম্বার দেওয়া-নেওয়া হয়েছিল সেদিন। তারপর আস্তে-আস্তে যোগাযোগ বাড়তে থাকে। ঋতুর ছোটো ছেলের জন্মদিনে প্রথম ঋতুদের ফ্ল্যাটে গিয়েছিল তনয়া। ঋতুর ছেলের জন্মদিনের পুরো পার্টিটা জুড়ে তনয়া শুধু রজতকে শিকার করার চেষ্টা করেছিলো। আর ফাঁদ হিসাবে ব্যবহার করেছিল ফিনফিনে সরু স্ট্র্যাপের লাল টুকটুকে প্যান-নেক স্লিভলেস ব্লাউজ আর তার সঙ্গে একই রঙের ট্রান্সপারেন্ট নেটের শাড়ি। অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করেছিল মিশকালো আইলাইনার লাগানো অদ্ভুত মায়াবী চোখদুটোকে। সেই চোখদুটো থেকে ছুঁড়ে দেওয়া অব্যর্থ দৃষ্টিবাণ থেকে সেদিন কিছুতেই নিজেকে রক্ষা করতে পারেনি রজত। তিরবেঁধা পাখির মতো তনয়ার কাছে ধরা দিয়েছিল সে। তনয়া বুঝেছিল, বয়সটা তার চল্লিশ ছুঁতে চললেও রূপ আর আবেদনের ধার কিছুমাত্র কমেনি। সে-ধারে এখনও সে যে-কোনো পুরুষমানুষের হৃদপিণ্ডকে ফালাফালা করে দিতে পারে। সেদিনের পর থেকে তনয়া আর রজতের জীবনে শুরু হয়েছিল একটা নতুন অধ্যায়, যে-অধ্যায়ের নাম 'পরকীয়া'। লুকিয়ে ফোনকল, চ্যাট আর নিদেনপক্ষে ছুটির দিনে ঋতুর ফ্ল্যাটে তনয়ার হঠাৎ আবির্ভাব হয়ে গিয়ে রজতকে চোখের দেখাটুকু; এইটুকুই ছিল ওদের পরকীয়ার দৌড়। কিন্তু দিন-কে-দিন দুটো মন আর শরীরের খিদে বাড়তে থাকে। হৃদয় একাত্ম হওয়ার পর এবার শরীর একাত্ম হতে চায়। ওরা ঠিক করে, একদিন ওরা সংপৃক্ত হবে। দু'টো মন দু'টো শরীর মিলেমিশে একাকার হয়ে যাবে। তবে চেনা ঘেরাটোপে নয়। অন্য কোনো জায়গায়, নতুন কোনো পরিবেশে। চাপা উৎকণ্ঠায় দিন গুনতে-গুনতে আজকে এসেছে সেই দিনটা।

তনয়া দেওয়াল-ঘড়িটার দিকে তাকালো, সবে সাড়ে-ন'টা। এখনও পাক্কা দু'ঘণ্টা। অনেক সময়। তনয়া স্নান সেরে নিজেকে যতটা সম্ভব সুন্দর আর আবেদনশীল করে সাজালো। গায়ে ঢাললো দামি সুগন্ধী। তারপর ফ্ল্যাটে তালা দিয়ে পূর্বনির্ধারিত জায়গায় দাঁড়ালো রজতের অপেক্ষায়। সাড়ে-এগারোটার কিছু আগেই রজতের হিউনডাই এক্সটার এসে দাঁড়ালো তনয়ার সামনে। সতর্কচোখে চারিদিক দেখে গাড়িতে উঠে পড়লো তনয়া। গাড়ির দরজা বন্ধ করতেই গোটা পৃথিবীটাকে বাইরে ফেলে রেখে একান্ত ব্যক্তিগত একটা জগতের মধ্যে যেন আবদ্ধ হলো দু'জনে। রূপকথার নায়কের রথের মতো সাত সমুদ্র তেরো নদী, তেপান্তরের মাঠ পেরিয়ে হাইওয়ের উপর দিয়ে তীব্রগতিতে ছুটে চললো রজতের শ্যাওলা রঙের হিউনডাই এক্সটার। তনয়া রজতের গলায় আর কানে চুমু দিয়ে কাঁধে মাথা রেখে ধরা গলায় বললো—"আমাকে উড়িয়ে নিয়ে চলো।" রজতের সারা শরীরে তখন যেন লাভার স্রোত বইছে। তনয়া আবার বললো—"চারটের আগে কিন্তু ফিরতে হবে।" রজত কী যেন বলতে গেল তনয়াকে...কিন্তু হঠাৎ কী যে ঘটে গেল, রজত ঠাহর করতে পারলো না! গাড়িটা একবার চরকির মতো উল্টোদিক থেকে আসা একটা গাড়ির ধাক্কা লেগে পাক খেয়ে দু'তিনবার পালটি খেয়ে হুড়মুড়িয়ে পড়লো রাস্তার পাশে নিচু জমিতে। রজত তনয়াকে শেষবারের মতো পাশের সিটে দেখলো, সে উল্টে যাওয়া গাড়িটাতে সিটবেল্ট বাঁধা অবস্থায় বাদুড়ের মতো ঝুলে আছে। গাড়ির উইন্ডস্ক্রিনের ভাঙা কাঁচের টুকরো এসে ওর মুখটা রক্তাক্ত আর ক্ষতবিক্ষত করে ফেলেছে। রজতের জীবিতকালের এটাই ছিল শেষ দেখা দৃশ্য।

এর পাঁচবছর পরের কথা। তনয়া এখন সর্বাঙ্গে পঙ্গু। সে হুইলচেয়ারে বসে থাকে সারাদিন। তার ছেলে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে বেঙ্গালুরুতে চলে গেছে। অরূপ অফিসের পর বাকি সময়টা সারাক্ষণ তনয়ার সঙ্গেই থাকে। নিজেহাতে তনয়ার সমস্ত দেখভাল করে, শুধু অফিসের সময়টুকু একটা কাজের মেয়ের হাতে তনয়াকে রেখে যায়। শুধু অরূপের একটা কড়া নির্দেশ তাকে এবং এ-বাড়িতে আসা প্রত্যেকটি মানুষকে অক্ষরে-অক্ষরে পালন করতে হয়; আর তা হলো—কোনোভাবে যেন তনয়াকে কোনো আয়না দেখানো না-হয়। কারণ, পাঁচবছর আগের সেই দুর্ঘটনায় তনয়া তার দু'চোখের দৃষ্টি চিরতরে হারিয়েছিল। রজতের ব্রেন ডেড হয়ে যাওয়ার পর ঋতুই অরূপকে বলেছিল, রজতের চোখদুটো তনয়ার চোখে প্রতিস্থাপন করতে। অরূপ সে-কথা মেনে নিয়েছিল। কিন্তু, রজতের চোখদুটো তনয়াকে  দেখুক, সেটা সে আজও মেনে নিতে পারেনি। 

Comments