বড়ো আতান্তরে পড়েছে অর্বাচীন। দিনে তিনবার বিষম খাচ্ছে, চারবার হাঁচছে। চারবার মানে চার গুণ ছয় চব্বিশবার। মানে, একবার হাঁচি শুরু হলে ছ'বার হাঁচবে। তো, দিনে চারবার এমন হাঁচি হলে হিসেব করুন, বারোঘণ্টায় চারবার যদি হয়, তাহলে তিনঘণ্টা অন্তর একবার করে হাঁচি হবে। এর মাঝে ফাঁক পেলেই একবার করে বিষম খাচ্ছে। অর্বাচীন ভেবে দেখেছে, মাসখানেক হলো তার এই অবস্থা। কিন্তু ভেবে পাচ্ছে না, কেন এমন হলো। সে রোদে ঘোরে বটে, তবে ছাতা মাথায়। বাড়ি ফিরে ঠান্ডা জল খায় না। শরবত খায়। বৃষ্টিতেও ভেজেনি। তবুও হ্যাঁচ...হ্যাঁচ...হ্যাঁচ...চো হয়েই চলেছে।
বহুবছর বাদে অর্বাচীন এই হ্যাঁচচো-র খপ্পরে পড়েছে।। তখন সে পূর্ণ যুবক। বছর তিনেক সরকারি চাকরিতে যোগ দিয়েছে। অফিসের কতিপয় প্রৌঢ় এবং কচি মেয়েদের নজর তার দিকে। তখনও হাতে ছাতা থাকতো। চোত-বোশেখের রোদ্দুরে সকলেই যখন ছাতা মাথায় চলেছে, অর্বাচীন তখন হাতে ছাতা দোলাতে-দোলাতে মাথায় গায়ে রোদ্দুর খেতে-খেতে চলেছে। কেউ-কেউ আড়চোখে তাকিয়ে ফিক করে হেসে পাশ কাটিয়ে গেছে। কোনো সুন্দরী পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় আলতো করে ছুঁড়ে দিল, পাগল। তো, একদিন দুপুর নাগাদ অফিসে শুরু হলো হাঁচি। ঘর কাঁপিয়ে হাঁচি। ছোটো ঘর। দশটা টেবিলে দশজন। সেই দশজনের একজন মৌটুসি। অর্বাচীন হাঁচে আর সে জোরে জোরে গোনে, এক...দুই...তিন...
হাঁচি থামলেই বলতো, বাঁচা গেল!
একটু কোণের দিকে বসতেন গোপালদা। তিনি হাসতেন কম, সবসময় গম্ভীর মুখে বসে থাকতেন। অফিসে নাম হয়ে গিয়েছিল 'হাঁড়িমুখো গোপালদা'। তিনি নিদান ছুঁড়ে দিতেন—নেট্রাম মিউর ২০০, নাক্সভম ২০০ পাল্টাপাল্টি দিনে তিনবার, সাতদিন।
অর্বাচীন কোনো উত্তর না দিয়ে চুপ করে বসে থাকতো। কারণ সে জানতো, কথা বললেই খোরাক হবে। খোরাক যে হয়নি, তা নয়। একদিন তো গ্লাসের জলে চুমুক দিতেই বিষম খেল। বেশ কাশি হচ্ছে। হঠাৎ একটা মোলায়েম হাত পিঠ চাপড়াতে লাগলো। কাশি থামতেই দেখে, পাশের দপ্তরের তন্বী। অবশ্য সে তন্বী নয় মোটেই। বেশ স্থূল। গায়ের রঙ অনেকদিন পালিশ না-হওয়া কাঠের মতো। অর্বাচীন তার দিকে তাকিয়ে একটু হাসতে গিয়েও পারলো না। সে গিয়ে বসে পড়েছে গোপালদার সামনে। এদিকে পাশের টেবিলের অজয়দা খোঁচা মারলো, কী মোলায়েম হাত!
গোপালবাবু শুধু দপ্তরের বড়োবাবু নন, তিনি হোমিওপ্যাথিও করেন। অফিসের অনেকেই তার কাছ থেকে ওষুধ নেন। ভালোও হয়ে যান। অর্বাচীনকেও অনেকবার ওষুধ বলেছেন। নিজে থেকেই বলেন। কিন্তু সে কোনোদিন ওষুধ সেবন করেনি। বহুবছর আগে শোনা একটা বাক্য তার কানে সেঁটে আছে, মরি তো মরবো বদ্যির হাতে, হাতুড়ের হাতে নয়। এটা সে অক্ষরে-অক্ষরে পালন করে।
অর্বাচীন কোনো উত্তর না দিয়ে চুপ করে বসে থাকতো। কারণ সে জানতো, কথা বললেই খোরাক হবে। খোরাক যে হয়নি, তা নয়। একদিন তো গ্লাসের জলে চুমুক দিতেই বিষম খেল। বেশ কাশি হচ্ছে। হঠাৎ একটা মোলায়েম হাত পিঠ চাপড়াতে লাগলো। কাশি থামতেই দেখে, পাশের দপ্তরের তন্বী। অবশ্য সে তন্বী নয় মোটেই। বেশ স্থূল। গায়ের রঙ অনেকদিন পালিশ না-হওয়া কাঠের মতো। অর্বাচীন তার দিকে তাকিয়ে একটু হাসতে গিয়েও পারলো না। সে গিয়ে বসে পড়েছে গোপালদার সামনে। এদিকে পাশের টেবিলের অজয়দা খোঁচা মারলো, কী মোলায়েম হাত!
গোপালবাবু শুধু দপ্তরের বড়োবাবু নন, তিনি হোমিওপ্যাথিও করেন। অফিসের অনেকেই তার কাছ থেকে ওষুধ নেন। ভালোও হয়ে যান। অর্বাচীনকেও অনেকবার ওষুধ বলেছেন। নিজে থেকেই বলেন। কিন্তু সে কোনোদিন ওষুধ সেবন করেনি। বহুবছর আগে শোনা একটা বাক্য তার কানে সেঁটে আছে, মরি তো মরবো বদ্যির হাতে, হাতুড়ের হাতে নয়। এটা সে অক্ষরে-অক্ষরে পালন করে।
সে-সব অনেকদিনের কথা। রিটায়ারমেন্টের এতবছর পর গোপালবাবুকে আর কোথায় পাবে! তাছাড়া হাঁচিও তাকে আর জ্বালাতন করেনি। সেই আবার হাঁচি জেগে উঠলো। সঙ্গে সেই বিষম লাগা। নির্বাচনের দামামা বাজতেই ওরা আবার মঞ্চে হাজির। পাগলা দাশুর মতো বলে উঠলো, আবার আসিয়াছি ফিরিয়া।
এখন অর্বাচীন বিষম খাচ্ছে। খবরের কাগজে চোখ রাখলেই বিষম খাচ্ছে। এদিকে বোশেখ এসে গেল। এবারও বোশেখের চড়া রোদ্দুরে ভোট হবে। ভোট উৎসব। তা, এবার সেই উৎসব ঘেঁটে ঘ। ওই যে নিবিড় সংশোধন। তা, শেষ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্ট এই নিবিড় সংশোধনকে নিজের কোলে তুলে নিল। ব্যস। আরও কেলোর কীর্তি শুরু হয়ে গেল। আদালত একটা করে নিদান দেয় আর অর্বাচীন বিষম খায়। এই যে বিচারাধীন নামে একটা খুড়োর কল বানালো, এটা আসলে গিলোটিন।
অর্বাচীন এক দুপুরে একটু বেশি খেয়ে ফেলেছিল। বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই তন্দ্রা এসে গেল। চোখ বুজে দেখলো, রাজা ষোড়শ লুই সিংহাসনে বসে আছেন। তার সামনে একটা গিলোটিন। সৈন্যরা একজন-একজন করে নাগরিককে নিয়ে আসছে, তার মুণ্ডুটা গিলোটিনে ঢুকিয়ে দিচ্ছে। তারপর ঘ্যাচাং। লুই সাহেব সিংহাসনের উপর উঠে নাচছে, তোমার ভোট নাই রে তোমার ভোট নাই।
অর্বাচীন দেখলো, অনেকগুলো লুই সাহেব হাতে হাত ধরে ঘুরছে আর সুর করে বলছে, তাই রে নাই রে নাই রে / তাই রে নাই রে নাই। একটু খেয়াল করে দেখলো, সেই ঘেঁটে ঘ করা মহিলাও ওর মধ্যে ঢুকে পড়েছে। সবাই বলছে উনিই নারদ। কেন? না, নির্বাচন কমিশন বললো, লোক দাও, ভোটার তালিকা সংশোধন করবো। দিচ্ছি দেবো করে, দিল। তারা ঠিকসময়েই ভালো কাজ করলো। এবার কমিশন বললো, এক হাজার কম্পিউটার অপারেটর দাও।
এই নারী লুই বললো, দেবো না। তোর বাপের কী। শালা...আমাদের মরা লোকগুলোকে বাদ দিয়ে দিলি? ভূতুড়ে ভোটারদেরও বাদ দিলি? দেবো না।
কমিশন বললো, এআই লে আও।
ব্যস। সব খিচুড়ি হয়ে গেল। ধুপধাপ বাদ।
অর্বাচীন দেখলো, অনেকগুলো লুই সাহেব হাতে হাত ধরে ঘুরছে আর সুর করে বলছে, তাই রে নাই রে নাই রে / তাই রে নাই রে নাই। একটু খেয়াল করে দেখলো, সেই ঘেঁটে ঘ করা মহিলাও ওর মধ্যে ঢুকে পড়েছে। সবাই বলছে উনিই নারদ। কেন? না, নির্বাচন কমিশন বললো, লোক দাও, ভোটার তালিকা সংশোধন করবো। দিচ্ছি দেবো করে, দিল। তারা ঠিকসময়েই ভালো কাজ করলো। এবার কমিশন বললো, এক হাজার কম্পিউটার অপারেটর দাও।
এই নারী লুই বললো, দেবো না। তোর বাপের কী। শালা...আমাদের মরা লোকগুলোকে বাদ দিয়ে দিলি? ভূতুড়ে ভোটারদেরও বাদ দিলি? দেবো না।
কমিশন বললো, এআই লে আও।
ব্যস। সব খিচুড়ি হয়ে গেল। ধুপধাপ বাদ।
দেওয়াল ঘড়িতে ঘণ্টা বাজতেই ঘুম ভাঙলো অর্বাচীনের। এক গেলাস জল খেয়ে ঢেঁকুর তুললো। তারপর নিজের মনকে সান্ত্বনা দিল—যাক বাবা, আমার আর গিন্নির নামটা তো আছে!
Comments
Post a Comment