প্রাণেশ সরকার

মনে পড়ে, ত্রিনাথদা-র সঙ্গে আমার প্রথম বড়ো ভ্রমণ কর্নাটকে। সেখানে ছিলাম মোট ২৪ দিন। প্রথমে ব্যাঙ্গালোরে, যার বর্তমান নাম বেঙ্গালুরু। চমৎকার শহর। আমরা বাসস্ট্যান্ডের অনতিদূরে একটা হোটেলের দোতলায় রাস্তার দিকের একটা ঘরে ছিলাম। অ্যাটাচড বাথরুম, কমোড, গিজার—সবই ছিল। খেতাম রাস্তার ধারের একটা হোটেলে। বেশ বড়ো ডাইনিং স্পেস। দক্ষিণ ভারতীয় খাবার-ই, ইডলি বা দোসা খেতাম। রাতে রুটি ,সব্জি পাওয়া যেত। আমরা সকালে আটটার মধ্যে বেরিয়ে প্রাতঃরাশ সেরে রাজধানী-শহরের দর্শনীয় স্থানগুলি, যেমন কুবন পার্ক (শহরের কেন্দ্রে ৩০০ একর জমি জুড়ে গড়ে ওঠা), বিধান সৌধ, লালবাগ তথা বোটানিক্যাল গার্ডেন, গ্লাস হাউস ইত্যাদি ঘুরে-ঘুরে দেখলাম। পরেরদিন দেখতে গেলাম বিশ্বেশ্বর ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড টেকনিক্যাল মিউজিয়াম। কস্তুরবা রোডে এই মিউজিয়াম। সর্বাধুনিক টেকনোলজির ঝকঝকে নিদর্শন। মিউজিয়ামটি দেখে বাইরে রাস্তায় বেরিয়ে আমরা পেয়ারা কিনে খেলাম। এত বড়ো সুস্বাদু পেয়ারা আগে কখনও পাইনি কোথাও। 

পরেরদিন ব্যাঙ্গালোর বাসস্ট্যান্ড থেকে সরকারি ব্যবস্থাপনার ট্যুরে বাসে করে ১৬০ কিমি দূরে শ্রবণবেলগোলায় গেলাম। পাথরমূর্তির শহর শ্রবণবেলগোলা। দিগম্বর জৈনদের তীর্থ। ইন্দ্রগিরি ও চন্দ্রগিরি, এই দুই পাহাড়ের মাঝে। চূড়ায় উঠলাম খালিপায়ে। চূড়ার একপাশে তীর্থঙ্কর আদিনাথের মন্দির। চত্ত্বর পেরিয়ে আরও কিছুটা উঠে চোখে পড়লো জৈন তীর্থঙ্কর বাহুবলী গোমতেশ্বরের মূর্তি। ইন্দ্রগিরি পাহাড়ের চূড়ার অংশ কুঁদে ১৭ মিটার উঁচু দণ্ডায়মান এই অপরূপ সুন্দর নগ্ন মূর্তি তৈরি হয়েছিল ৯৮৩ সালে গঙ্গা রাজবংশের রাজা রচামল্লের সেনাপতি চামুন্দ্রায়া কর্তৃক। ভাস্কর অরিস্টোনমি এই লাবণ্যময় ভাস্কর্য নির্মাণ করেন। সারা বিশ্বের মানুষ প্রতিদিন এই মূর্তি দেখতে আসেন। কালের প্রভাবে ফাটল ধরেছে মূর্তিটিতে, আর গায়ে পড়েছে ছোপ। 

প্রতি ১২ বছর অন্তর বাহুবলীর মহামস্তকাভিষেক অনুষ্ঠিত হয়। অভিষেক অর্থাৎ স্নান করানোর সময়ে মূর্তির পিছনে ভারা বাবাঁধা হয়। পুরোহিতেরা পুণ্যলগ্নে হাজার ঘড়া দুধ, নারকেলজল, আখের রস, মধু, দই এবং পঞ্চামৃতের সঙ্গে চাল, কলা, স্বর্ণচূর্ণ ও রৌপ্যমুদ্রা দিয়ে স্নান করা গোমতেশ্বরকে। হাজার-হাজার ভক্তের সমাগম হয় তখন। আগামী মহামস্তকাভিষেক হবে ২০২৯-এ। 

আমি এই ভাস্কর্য দেখে অভিভূত। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে আমি ও ত্রিনাথদা প্রাণভরে গোমতেশ্বরকে দেখছিলাম। আমাদের সঙ্গে ছিলেন একজন প্রৌঢ়া। মারোয়াড়ি মহিলা। একাই এসেছিলেন। তাঁর মনের জোর দেখে আমরা বিস্মিত। প্রসঙ্গত বলি, কর্নাটক ভ্রমণের তিনবছর পরে তামিলনাড়ু ভ্রমণের সময় চেন্নাইয়ে সরকারি কন্ডাক্টেড ট্যুরের জন্য ওদের অফিসের সামনে অপেক্ষা করছি। একজন ব্রিটিশ ট্যুরিস্ট এগিয়ে এসে আলাপ করলেন আমাদের সঙ্গে। আজই ওঁর তামিলনাড়ু ভ্রমণ শেষ হবে। ইংল্যান্ডে ফেরার তখনও একসপ্তাহ দেরি আছে ওঁর। আমার কাছে জানতে চাইলেন, এই সময়ে কাছাকাছি কোথায় যাওয়া যায়। আমি সঙ্গে-সঙ্গে ওঁকে গোমতেশ্বরের মূর্তি দেখে আসতে বললাম। রুটচার্ট করে দিলাম। ঠিক মনে পড়ছে না, সম্ভবত ওঁর নাম John Wytt; জনের ঠাকুর্দা দীর্ঘদিন মাদ্রাজে ব্যবসা করেছেন। তামিলনাড়ুর আদি নাম মাদ্রাজ। জন দেশে ফিরে আমাকে চিঠি লিখেছিলেন। আমিও উত্তর দিয়েছিলাম। চিঠিতে জন ত্রিনাথ ঘোষ-কে Mr. Ghost নামে উল্লেখ করেছিলেন। আমি পত্রপাঠ ওঁকে Ghost নয় Ghosh বলে জানিয়ে দিই। জন শ্রবণবেলগোলা দর্শন করে অভিভূত হয়েছিলেন। চিঠিতে বারবার ধন্যবাদ জানিয়েছিলেন আমাকে। 

শ্রবণবেলগোলা থেকে ফেরার পথে আমরা প্রথমে যাই বেলুর। আজ থেকে প্রায় ৯০০ বছর আগে হোয়সলরাজ বিষ্ণুবর্ধন বেলুরে তাঁর রাজধানী প্রতিষ্ঠা করেন। তারপর চোলরাজ শাসিত তালকাল্ড দখল করে মন্দির নির্মাণ করেন। কালের প্রভাবে আজ নগরীর বাকি স্থাপত্যকর্ম বিলীন, কিন্তু রয়ে গিয়েছে হোয়সল রাজবংশের অমর স্থাপত্যকর্ম অনিন্দ্যসুন্দর চেন্নাকেশব মন্দির। তারার আকারের ১.৫ মি উঁচু ভিত্তিভূমির উপর শিখরহীন মন্দির সোপস্টোনে তৈরি। উত্তর, দক্ষিণ ও পূর্ব— তিনমুখে তিন প্রবেশদ্বার। মন্দির জুড়ে নানান স্থাপত্যকর্ম জীবন্তভাবে রূপ পেয়েছে। ভিত্তিমঞ্চের পাথর জুড়ে তালে-তালে চলা সারিবদ্ধ ৬০৮টি হাতির পাল। রামায়ণ, মহাভারত ও পুরাণকাহিনিও রূপ পেয়েছে। ব্র‍্যাকেট ফিগারে আকর্ষণীয় নানা নারীমূর্তি রয়েছে বিচিত্র সব ভঙ্গিমায়। বিব্রত কুমারী সালভঞ্জিকার শাড়ি টানছে বাঁদর। পোষা টিয়ার সঙ্গে আলাপরতা শূরাসুন্দরীর কাপড়ে উঠেছে কাঁকড়াবিছে। ভীত মন্দাকিনীর মূর্তিগুলি দেখার মতন। আর গর্ভগৃহে প্রায় দু'মিটার উঁচু চেন্নাকেশবের মূর্তি। একদা পূজিত হতেন হোয়সল রাজ্যের সমৃদ্ধি ও রক্ষাকর্তা রূপে। মন্দিরজোড়া অনিন্দ্যসুন্দর শিল্পকর্ম উৎসর্গীকৃত হয়েছে দেবতার উদ্দেশে। এই মন্দির তৈরি করতে ১০০ বছর লেগেছে। চেন্নাকেশব মন্দিরের পশ্চিমে রয়েছে বীরনারায়ণ মন্দির। এর কারুকার্যও সুন্দর। 

বেলুর থেকে ১৬ কিমি দূরে হালেবিদ। একদা সম্পন্ন নগরী ছিল। ১৩২৬ সালে দিল্লির দুই সুলতান আলাউদ্দিন খিলজি ও মহম্মদ বিন তুঘলকের হানায় নগরটি ধ্বংস হয়। সামান্যই রক্ষা পায় সেদিন। এর মধ্যে হোয়সলেশ্বর মন্দির ও কেদারেশ্বর মন্দির অন্যতম। ১১২১ সালে হোয়সলরাজ বিষ্ণুবর্ধনের সেনাপতি কেতমাল্লা নির্মাণ করেন হোয়সলেশ্বর মন্দির। এটি শিবমন্দির। আর কেদারেশ্বর মন্দির ১২১৯ সালে দ্বিতীয় বল্লাল ও পত্নী অমিনাভ কেটালা দেবী কর্তৃক নির্মিত হয়। হোয়সলেশ্বরে দ্বিমূর্তি রয়েছে শিবের—হোয়সলেশ্বর ও শান্তালেশ্বর। স্থপতি ছিলেন যকনাচার্য, কিন্তু দীর্ঘ ৮০ বছরেও সম্পূর্ণ হয়নি মন্দির। স্থাপত্যশৈলী বেলুরের মন্দিরের অনুরূপ। পাথর কুঁদে মূর্তিও রয়েছে নানা মন্দিরদ্বারে। কেদারেশ্বরের দক্ষিণদ্বারে দ্বারপালিকার ২ মিটার মূর্তির সূক্ষ্মতা নজর কাড়ে। প্যানেলের কাছে রামায়ণ, মহাভারত ও পুরাণ কাহিনির জীবন্ত রূপ ছাড়াও রয়েছে অনবদ্য ভাস্কর্য শ্রীকৃষ্ণের কালিয়দমন, লক্ষ্মীনারায়ণ। সুন্দরী নারীদের কেশচর্চা ও প্রসাধন দৃশ্যের মূর্তিও রয়েছে প্যানেলে। সমস্ত কিছু ঘুরে-ঘুরে সময় নিয়ে দেখলাম। মন তৃপ্তিতে পরিপূর্ণ হলো। ইতিহাস বাঙ্ময় হয়ে আছে এখানকার স্থাপত্যে, ভাস্কর্যে। প্রতিটি পাথরখণ্ড জীবন্ত হয়ে উঠেছে অনুভবী দর্শকের চোখে। বেলুর থেকে আবারও বাসে করে ব্যাঙ্গালোরে ফিরে এলাম বাসস্ট্যান্ডে। পায়ে হেঁটেই হোটেলে ফিরে ফ্রেশ হয়ে আমরা এ-ক'দিন যে-রেস্তোরাঁয় খেয়েছি সেখানেই নৈশভোজ সেরে নিয়ে ঘরে ফিরে গভীর ঘুম। সারাদিন বেশ ধকল গেছে। পরদিন সকাল আটটার মধ্যে স্নান সেরে, হোটেল ছেড়ে দিলাম। পথে ব্রেকফাস্ট—দোসা, গরম জিলাপি ও কফি। কর্নাটক কফির জায়গা। প্রায় প্রতিদিনই কফি খেয়েছি আমরা। বাসস্ট্যান্ড থেকে বাসে উঠলাম। এবারের গন্তব্য মহীশূর বা মাইসোর। 

ব্যাঙ্গালোর থেকে বাসে ১৪০ কিমি দূরে প্রাসাদপুরী মহীশূর শহর। আমরা বেলা দুটো নাগাদ মহীশূরে পৌঁছে বাসস্ট্যান্ডের কাছে একটা ছোটো হোটেলের দোতলায় প্রধান সড়কমুখী একটি ঘরে ঠাঁই পেলাম। নিকটবর্তী একটি রেস্তোরাঁয় গিয়ে দুই বন্ধু একটা করে দোসা খেয়ে হোটেলরুমে এসে বিশ্রাম নিতে শুরু করলাম। কখন ঘুমিয়ে পড়েছি! বিকাল পাঁচটা। এর মধ্যেই ত্রিনাথদা বাইরে গিয়ে বেশ কিছু কমলালেবু নিয়ে এসেছে। দুটো লেবু খেলাম। স্থানীয় লেবু। বেশ মিষ্টি। বিছানা ছেড়ে হাতমুখ ধুয়ে বাইরে বেরিয়ে পড়লাম দু'জন। মহীশূর কী প্রাণবন্ত শহর! স্থির করলাম, আমরা আগামীকাল রাজপ্রাসাদ, চামুণ্ডেশ্বরী মন্দির, জগমোহন প্যালেসের সুন্দর ভবনে জয় ছামরাজেন্দ্র আর্ট গ্যালারি ইত্যাদি দেখবো। প্রধান রাস্তা দিয়ে ধীরে-ধীরে হাঁটতে শুরু করলাম। একটা কফিস্টলের সামনে দাঁড়িয়ে বিস্কুট ও কফি খেলাম। এরপর হেঁটে-হেঁটে সুবিশাল ও সুসজ্জিত স্যান্ডালউড এম্পোরিয়ামে গেলাম। ভবনটিতে প্রবেশ করতেই চন্দনের সুগন্ধে বিমোহিত হয়ে গেলাম। চন্দনকাঠের অসংখ্য সামগ্রী, মূর্তি, খাট, আসবাবপত্র, ধূপকাঠি, পুজোর জন্য লাল চন্দন, শ্বেতচন্দন ইত্যাদি। আমি বাড়ির জন্য ধূপকাঠির প্যাকেট ও লাল চন্দন কাঠ ও শ্বেতচন্দন কাঠ কিনলাম। ত্রিনাথদাও এইসবই নিলেন। দেখি, একটা সুদৃশ্য চন্দনকাঠের খাট প্যাকিং হচ্ছে। জাহাজে করে আমেরিকা যাবে। এক প্রবাসী বাঙালি ভদ্রলোক কিনে রেখে গেছেন। আমি ম্যানেজারকে জিজ্ঞাসা করাতে উনি জানালেন, ১৬ লক্ষ টাকা দাম। বাঙালি ভদ্রলোক সম্পূর্ণ দাম মিটিয়ে দিয়ে গেছেন। আমি মনে-মনে বললাম, বাঃ! এম্পোরিয়াম থেকে বেরিয়ে আমাদের হোটেলের উদ্দেশে হাঁটা শুরু করলাম। হোটেলে ঢোকার আগে একটা রেস্তোরাঁয় খেয়ে নিলাম। ইডলি, সম্বর, পাঁপড়ভাজা ও জিলাপি। হোটেলে ফিরে দুই বন্ধু গল্প করতে-করতে ঘুমিয়ে পড়লাম।
(ক্রমশ)

Comments