শর্মিষ্ঠা ঘোষ

ছোটোবেলায় ভাবতুম, আর্নিকা একটি সর্বরোগহর ঔষধবিশেষ। আমার এরকম ধারণার কারণ আমার বড়োমা মানে জেঠিমা। পড়ে গেলে ছড়ে গেলে ব‍্যথা পেলে ভয় পেলে সবেতেই কাচ্চাবাচ্চাদের এক ডোজ আর্নিকা খাইয়ে দিত নিজের ঘর থেকে। বড়োমার ঘর বলে যেটি আমার মাথায় গ্রথিত আছে, এই বুড়োবয়সে এসে বুঝি, সে-ঘর ছিল টেনেটুনে দশ বাই বারো। তাতে একটা কাঠের খাট, একটা কাঠের আলমারি (ঠিক এটার যমজ আমার মায়েরও একটা আছে। বাবারা বলতো, জাটুলদার কাঠের দোকান থেকে বানানো। সে-কাঠগোলা আমিও দেখেছি স্কুলবেলা পর্যন্ত।), একটা কাঠের মিটসেফ যেটা কভার দেওয়া থাকতো এবং মাথাটা টেবিল হিসেবে ব‍্যবহার হতো, একটা কাঠের চেয়ার, একটা ড্রেসিংটেবিলের টুল—যার ওপর থাকতো বড়মার সিঙ্গার সেলাইমেশিন। দাদাভাইয়ের ছোটোবেলার একটা ছবি এই চেয়ারের ওপর দাঁড়িয়ে স্টিলফ্রেমে বাঁধানো। খুব ভালো সেলাইফোঁড়াই করতো বড়োমা। ছোটোবেলায় বড়োমার হাতে তৈরি ফ্রক পরেছি অনেক। সোয়েটার তো পরেছি বুড়োবয়স পর্যন্ত। এমনকি আমার বরকেও একটা হাতকাটা সোয়েটার বানিয়ে দিয়েছিল বিয়ের পরে। কিন্তু ঘরে কোনো ড্রেসিংটেবিল ছিল না। একটা কাঠের ফ্রেমের ছয় ইঞ্চি বা আট ইঞ্চির আয়না রাখা থাকত মিটসেফের মাথায়। আমার বড়োমাকে 'বম্মা' ডাকতাম। তিনি কলকাতার না-হলেও শহরতলির মেয়ে। বেলঘরিয়ায় ভাইদের সংসার থেকে বিয়ে ঠিক হয়েছিল। বিয়ের বেনারসি কিনতে গিয়ে জেঠুমুনির সাথে আলাপ। পালিয়ে চলে এসেছিল এই গণ্ডগ্রামে। এখানে মাটির বাড়ি। উদ্বাস্তুর কঠোর সংগ্রামের সংসার। কাদাজলে পিছলে পড়ে কিডনি বার্স্ট করে। কেটে বাদ দিতে হয়। সেজন্য বেশিক্ষণ টয়লেট না-গিয়ে থাকতে পারতো না। বহুবার পিকনিক গিয়ে বম্মা-র জন্য টয়লেটের ব‍্যবস্হা করতে হয়েছে বনবাদাড়ে। বম্মা আমার দেখা সেরা স্টাইলিস্ট। খুব সামান্যতে অসাধারণ। বম্মার হাঁটাচলা, খাবার ধরন ছোটোবেলায় নকল করতুম। বম্মা-র আমি বড়ো মেয়ে। জেঠুমুণির কালিন্দী, কালিয়া। শ‍্যামবর্ণ কিনা। ভাইকে ডাকতো 'দারা সিং'। ছোট্টবেলায় ওর হাত দেখে প্রেডিক্ট করেছিল, ও একদিন বিদেশ যাবে। কী জানি মজা করতো কিনা! নাকি সিরিয়াসলি চর্চা করতো! তবে ভাই এখন বিদেশে ডেইলি প্যাসেঞ্জার প্রায়। জেঠুমুণি ছিল বইপোকা। ইনস্টিটিউট লাইব্রেরির কোনো বই বাকি রাখেনি পড়তে। সাহিত্যচর্চাও নাকি একটুআধটু করেছে কমবয়সে। সাহিত‍্যিক সম্পাদক তপনকিরণ রায় ওঁদের মাসতুতো ভাই। তাঁর কাছেই জানা। বড়োমার সারাবছর গ্লিসারিন সোপ, আলাদা বালতি, আলাদা মগ। অসাধারণ রান্নার হাত। বাড়ির যে-কোনো অনুষ্ঠান, আমাদের জন্মদিনের পায়েস, মাংস, পিকনিকের ডিমকষা, মাংসের ঝোল, রায়দিঘি থেকে জেঠুর ধরে আনা বড়ো-বড়ো রুই কাতলা এইয়া বড়ো বঁটি নিয়ে বসে বাড়ির সবার জন্য পিস-পিস করে কাটা, রান্না করা। শুঁটকি মাছ, তেল কই, চিংড়ির মালাইকারি রান্না করে লোকজনের আবদারে খাওয়ানো বম্মা ছাড়া হতো না। জেঠুমুনি কখনও কোনো ভালো খাবার বাটিতে করে আমাদের একটু না-পাঠিয়ে খায়নি। ছোটোবেলায় জেঠুর জলখাবার দুধ-রুটির একটা ভাগ পেতুম আমরা। চোখ নাক চোখা-চোখা, চুল মাথাভর্তি, কোঁকড়া। পোশাক ফিটফাট। কাচা ইস্তিরি করা। অনেক জামাকাপড় ছিল না। তবে পরিষ্কার ছিল। অনেক ঘাটের জল খেয়ে সিনেমা হলে ম্যানেজারি করতো। খানবাবু, অনাথবাবু, অর্ধ রায়চৌধুরী-বাড়ির শেয়ার ছিল হল দুটোতে। টিনের ট্রাঙ্কে করে সিনেমার রিল আনতে তৎকালীন বম্বে, অধুনা মুম্বাই গেলে ফেরার পর আমরা পেতুম চকোলেট, স্নোয়ের কৌটো (কোনোদিন মাখা হয়নি; পেতাম, ওতেই আনন্দ), চটি। আশা টকিজ আর গীতাঞ্জলি—দুটো চালু হলে ম‍্যানেজারি করতো শেষজীবনে। তখনও চেইনে সিনেমা রিলিজ করতো সারা দেশে। লোকে ব্ল‍্যাকে টিকিট কাটতো। আর ছিল কমল টকিজ। রেল কলোনিতে। এটা তুলনায় পুরোনো হল। আশপাশের পরিবেশটা সন্ধ্যার পর একটু কেমন লাগতো। এটার উল্টোদিকে ছিল রাঙাজেঠুর বন্ধুর কাটলেট আর গোরা বরফ, রঙিন ঠান্ডাই-এর দোকান। রাঙাজেঠু ছোটবেলায় আমাদের নিয়ে গিয়ে কাটলেট খাইয়েছে। এ-হলের মালিকানা নাগবাড়ির কি? ওইরকম‌ই শুনেছি বোধহয়। রামা রেডিও হাউসের উল্টোদিকে ছিল মহাবীর টকিজ। এখন যেখানে মুথূট ফাইনান্স, বিলিতি মদের দোকান, তার পাশেই। এর পাশ দিয়ে একটা রাস্তা সুভাষগঞ্জের দিকে গেছে। কাঠের সিঁড়ি লাগানো, বন্ধ হল দেখেছি জন্ম ইস্তক। একবার নাকি অগ্নিকাণ্ড হয়েছিল ওই হলে। চালু হয়নি আর কখনও। সিনেমা হলে প্রজেক্টর রুমের পাশেই ছিল জেঠুর অফিস। সেখানে বসে প্রজেক্টর রুমে রিলের চাকা ঘুরিয়ে সিনেমা দেখানো হয় কীভাবে, দেখেছি সে-সব‌ও। আশা টকিজে কাজ করতো ছোটোকাকুও। ভালো ফুটবল খেলতো। ব্যবসা করার জন্য সার্টিফিকেট জমা দিয়ে লোন নিয়েছিল জেঠু, ছোটোকাকুর নামে। সুপার মার্কেট তৈরি হচ্ছে তখন। এটার আসল নাম ইন্ডাস্ট্রিয়াল মার্কেট। এখানে একটা ঘর‌ও নিয়েছিল। কিন্তু সে-ব্যবসা দাঁড়ায়নি। গীতাঞ্জলি ছিল নবীনতম হল। খানবাবুদের। এখানে হাউসফুল হয়েছিল 'শত্রু'। সিট নেই। চেয়ারে বসেও সিনেমা দেখেছি। আম্মার সাথে সব কাজিন মিলে। লোকে আইটেম ডান্সে পর্দায় পয়সা ছুঁড়তো। সিটি দিত। বচ্চন, মিঠুনের অ্যাকশান দৃশ্যে আওয়াজ দিত, "গুরু, গুরু"। ওরকম জুলপি, বাবরি চুল রাখতো। এখন একটা‌ও হল নেই। শহরে কল্যাণীদের মাল্টিপ্লেক্স হয়েছে। এসি। ঝকমকে। করোনা পিরিয়ডের পর আর হলগুলো খোলেনি। কর্মচারীবৃন্দ কোথায় কীভাবে বেঁচে আছে, জানি না। কাকু,জেঠু—দু'জনেই চলে গেছে করোনার অনেক আগেই।
বন্ধ হয়ে পড়ে থাকা আশা টকিজ। খেয়াল করলে, প্রবেশপথের ওপরের ওই অসাধারণ ম্যুরালটা এখনও বোঝা যায়। 

(ক্রমশ)

Comments