সমরেন্দ্র মণ্ডল

অর্বাচীনের মনটা ভালো নেই। কেমন যেন স্যাঁতসেঁতে। মনে হচ্ছে আকাশের মুখ গম্ভীর। তারই মাঝে বিদ্যুৎ চমকানোর মতো একটা খুশি-খুশি ভাব ফুরফুর করছে। এই যে রাজ্যে ক্ষমতার বদল হলো, তা নিয়ে কত আলোচনা। কেউ-কেউ তো বলে দিলেন, আমেরিকা আর ভ্যাটিকানের একটা চক্র  ক্ষমতার যেন বদল না-হয় তার খুব চেষ্টা করেছিল। তাদের সেই চক্রান্ত ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু তামিলনাড়ু, কেরলমে তারা সফল।

নিজের মনেই ফিকফিক করে হাসে অর্বাচীন। নিজেকে শুনিয়েই বলে, বুঝলে হে অর্বাচীন, এরা কেউ মানুষের মন পড়তে পারে না। ওই যে একটা কথা আছে না, নারীর মন দেবতাও বুঝতে পারেন না, কু তো মনুষ্যা? তা আমি বলি কি, কোনো মানুষের মনই দেবতারা বুঝতে পারে না, তা অন্য কেউ তো দুচ্ছাই। মানুষের মন হলো পিংপং বল। কখনও ব্যাটে লাগবে, কখনও ছিটকে বেরিয়ে যাবে, তুমি  বুঝতেই পারবে না।
 
এই যেমন ভোটের ফল বেরোনোর দিন এবং সন্ধ্যার ঘটনা। সকাল পেরিয়ে যাওয়ার পর সূর্য যখন বেশ তাপ দিচ্ছে, অর্বাচীন ওদের পাড়ার কাছাকাছি মন্টাদার চায়ের দোকানে একপাত্তর চা নিয়ে লোকের মুখবাহিত নির্বাচনী  সংবাদ শুনছিল। বৈশাখের মেঘলা আকাশের মতো চারদিক থমথমে। হঠাৎ দুই যুবক ঝড়ের বেগে ঢুকে বললো, মন্টাদা দুটো চা দাও। কাউন্টিং সেন্টারে যাবো।
মন্টাদা বড়ো ফ্লাক্সের মাথায় চাপ দিয়ে দুটো কাগজের কাপে চা ঢেলে ওদের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করলো, খবর কী?
 — দিদি জিতছে। আমরা আছি আমরা থাকবো।
ঝটপট চা গলায় ঢেলে বাইক হাঁকিয়ে দু'জনে প্রস্থান করলো।
সন্ধ্যা তখন উত্তীর্ণ। চারিদিক থমথম করছে। যেন বনধ চলছে। মন্টাদার চায়ের দোকান হালকা। অর্বাচীন দোকানে ঢুকে অভ্যাসমতো এককোণে বেঞ্চিতে বসলো। মন্টাদা গালে পান হাসি দিয়ে চায়ের কাপ এগিয়ে দিয়ে বললো, বড়দা চা।
চায়ের কাপ হাতে অর্বাচীন ভাবে, কেন যে মন্টাদা তাকে 'বড়দা' বলে, কে জানে! বছর দশেক হয়ে গেল এই দোকানে ঠেক নেওয়ার। প্রথম থেকেই সে 'বড়দা' সম্বোধন করে। তা যা বলে বলুক, খিস্তি না-দিলেই হলো। 
এসব যখন সে ভাবছে এবং মন্টাদা মোবাইলে ভোটের ফল শুনছে আর নিজের মতো মন্তব্য করে যাচ্ছে, ঠিক তখনই  সকালের সেই দুই যুবক হুড়মুড়িয়ে দোকানে ঢুকে পড়লো। দোকানে তখন অর্বাচীন ও মন্টাদা ছাড়া আরও তিনজন আছে। তাদের মধ্যে দুই মধ্যবয়সী ইট-বালির হিসাব কষছে, অন্যজন প্রৌঢ়। তিনি একা-একা ফিকফিক করে হাসছেন। সম্ভবত তিনি গঞ্জিকায় আচ্ছন্ন হয়ে আছেন। আগত যুবকদ্বয়ের হাতে লাড্ডুর প্যাকেট। সকলকে লাড্ডু দিতে শুরু করলো। অর্বাচীন চোখ তুলে দেখলো, তাদের কপালে গেরুয়া তিলক। বাইকের ফুল বদলে গিয়েছে।
মন্টাদা মৃদু হেসে বলল, কীরে, পাল্টি?
সহাস্যে যুবকদের উত্তর, আমরা আছি আমরা থাকবো। যে আসবে আমরা তার।
বাইক চালিয়ে তারা হুস করে বেরিয়ে গেল। মন্টাদা বললো, দেখলেন বড়দা!
অর্বাচীন সিগারেটে টান দিয়ে বললো, ধুস।
পথ ক্রমশ নির্জন হচ্ছে। শুরু হয়েছে বাইকের দাপাদাপি আর নির্দিষ্ট স্লোগান। নানারকম খবর ঢুকছে দোকানে অর্বাচীন আরেক কাপ চা নিয়ে ভাবতে বসলো, এই যে যারা জয়ী হলো, ক'দিন আগেই তো তাদের পতাকা বাঁধার লোক ছিল না। মিছিলে গোটা কুড়ি বাইশ মুখ দেখা যেত। এখন এত লোক, বিশেষত যুবক, এল কোথা থেকে! শয়ে-শয়ে বাইক ছুটছে। এরা কারা! এতদিন কোথায় ছিল!
চায়ের দাম মিটিয়ে অর্বাচীন দোকান থেকে বেরোতে যাবে, মন্টাদা বললো, সাবধানে যাবেন বড়দা।  বাঁদরগুলো লাফালাফি শুরু করেছে।
ঠিক আছে—বলে সে দোকান থেকে বেরিয়ে দেখে বিজয়ী দলের একটা মিছিল আসছে। রাস্তার পাশে সরে দাঁড়ালো সে। জনাবিশেক মধ্যবয়সী পুরুষ শান্ত-সংযত মিছিল করছেন। তাদের পাশ দিয়ে হুসহাস বাইক বেরিয়ে যাচ্ছে চিৎকার করে স্লোগান দিতে-দিতে।  এমনকি মিছিলের দিকে ছুঁড়ে দিচ্ছে রামধ্বনি।

অর্বাচীন বাড়ি ফিরে টিভি-তে চোখ রাখলো। বিজয়ী দলের সভাপতি বলছেন, এরা আমাদের দলের কেউ নয়। পরাজিত দলের কর্মীরা রঙবদল করে এই তাণ্ডব চালাচ্ছে। এটা আমাদের সংস্কৃতি নয়। পুলিশকে বলেছি, প্রশাসনকে বলেছি, রঙ দেখবেন না; এদের অ্যারেস্ট করুন।
অর্বাচীন ভাবলো, যাক আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় এরা বেশ কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছে। সে একটু আশ্বস্ত হলো। টিভি বন্ধ করে মোবাইল ঘাঁটবে বলে যেই মনস্থ করেছে, অমনি ফোন বেজে উঠলো। হাতে তুলে নিতেই দেখলো তার এক পুরনো বন্ধু। সবুজ বোতাম ছুঁয়ে কানে দিতেই ওপাশ থেকে  জিজ্ঞাসা করলো, কীরে কেমন বুঝছিস?
—কিছুই ঠিক বুঝতে পারছি না। ওদের সভাপতি যা বললেন...
—ধুস, ওসব বলতে হয়। একে বলে ইমেজবিল্ডিং। ডানহাত ওপরে তুলে বলবে এসব বরদাস্ত করবো না। ওদিকে নিচে বাঁহাত এগিয়ে যাওয়ার ভঙ্গিতে বলবে, চালিয়ে যাও। সব দেখা আছে।
—একটু আগেই দেখলাম, পুলিশ রাস্তায় নেমে পড়েছে।
—ভালো!
হঠাৎ কোথাও বিনামেঘে বাজ পড়লো কড়-কড়-ক্বড়াৎ।
অর্বাচীন বললো, ঝড় উঠেছে। ফোন কেটে গেল। 


Comments