প্রাণেশ সরকার

পরদিন সকালে উঠে স্নানটান সেরে রাস্তার পাশের ধাবায় ডিমটোস্ট ও কফি খেয়ে প্রথমে গেলাম মহীশূর প্যালেসে। রাজপ্রাসাদটি ইন্দো-সেরাসেনিক স্থাপত্যের এক অনিন্দ্যসুন্দর নিদর্শন। ১৮৯৭-এর অগ্নিকাণ্ডে প্রাসাদের এক অংশ সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়। ১৮৯৭-এই বর্তমান প্রাসাদটি ওদিয়ার রাজার হাতে তৈরি শুরু হয় এবং ১৯০৭ সালে শেষ হয়। কল্যাণমণ্ডপে ছবি, দেওয়ালচিত্রে দশেরা উৎসবের দৃশ্য, রুপোয় মোড়া দরজা, হাতির দাঁতের প্যানেল আর ফরাসি ঝাড়বাতি দিয়ে সাজানো ঝলমলে দরবার হল। দশেরা উৎসবের ১০ দিন ধরে রত্নখচিত সোনার সিংহাসনটি প্রদর্শিত হয়। আলোকমালায় ঝলমল করে রাজপ্রাসাদ। আমরা ঘুরে-ঘুরে সবকিছু দেখলাম। 

এরপর গেলাম জগমোহন প্যালেসের জয় ছামরাজেন্দ্র আর্ট গ্যালারিতে। রবি বর্মা ও শ্বেতস্লা রোয়েরিকের আঁকা নানা ছবির পাশাপাশি রাজপরিবারের শিল্পীর আঁকা ছবিও স্থান পেয়েছে গ্যালারিতে। রোয়েরিকের আঁকা 'দিয়া হাতে নারী' ছবিটি আমাকে মুগ্ধ করে দিল।

এবার গেলাম চামুণ্ডি হিলে, চামুণ্ডেশ্বরী দেবীর মন্দির দর্শন করতে। পায়ে হেঁটে পাহাড়ের উপরে মায়ের মন্দিরে পৌঁছলাম। ৪০ মিটার উঁচু গোপুরম নিয়ে চামুণ্ডেশ্বরী মন্দির ২০০০ বছরের পুরোনো। মন্দিরে পৌঁছনোর জন্য ১০০০ সিঁড়ি রয়েছে। পাহাড়ের উপর থেকে দূরের মহীশূর নগরীর সৌন্দর্য চমৎকার। প্রায় একঘন্টা মন্দিরপ্রাঙ্গণে অতিবাহিত করার পরে আমরা নিচে নেমে এলাম ধীরেসুস্থে।

নিচে নেমে একটি রেস্তোরাঁয় আমরা মধ্যাহ্নের আহার সেরে নিলাম, ইডলি ও মিষ্টি দিয়ে। তারপর কফি। এরপর চলে এলাম মহীশূর থেকে ১৬ কিমি দূরে শ্রীরঙ্গপাটনায়। কাবেরী নদীর মাঝে ব-দ্বীপে শ্রীরঙ্গপাটনা ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় স্থান। অষ্টাদশ শতকে এই দুর্গনগরীর পতন ঘটে। অতর্কিত আক্রমণে বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করে নিহত হন টিপু সুলতান। টিপুর মৃত্যুর স্থানটি আজ দর্শনীয়। আমরাও দেখলাম সেই স্থানটি। টিপুর বীরত্ব স্মরণ করলাম সশ্রদ্ধচিত্তে। 

কাছেই প্রসিদ্ধ বিষ্ণুমন্দির শ্রীরঙ্গনাথস্বামী মন্দির। বিশাল দক্ষিণী শৈলীর মন্দিরে দেবতা কালো কষ্টিপাথরের সর্পসজ্জায় অনন্তশয়ানে বিষ্ণুমূর্তি। মন্দিরের দেবতা শ্রীরঙ্গনাথস্বামীর থেকেই শহরের নাম হয়েছে শ্রীরঙ্গপাটনা। বিষ্ণুর মূর্তি দর্শন করে তৃপ্তিতে মন ভরে গেল আমার।

এবার আমরা হোটেলে ফিরে এসে ঘন্টাখানেক বিশ্রাম নিলাম। তারপর ফ্রেশ হয়ে চললাম যেখানে দশেরা উৎসব হয় অর্থাৎ মহীশূর রাজপ্রাসাদের সামনে বিশাল ময়দানে, যেখানে মেলা বসেছে। ভারতবর্ষের প্রত্যেকটি প্রদেশ থেকে স্টল দেওয়া হয়েছে এই মেলায়। পশ্চিমবঙ্গ থেকেও হস্তশিল্পের একটি সুন্দর স্টল রয়েছে। আমরা মেলায় মনের আনন্দে অনেকক্ষণ ঘুরে বেড়ালাম। মেলায় পাঁপড়ভাজা ও কফি খেলাম। এরপর হোটেলে ফিরে এলাম। রাতে বাইরে বেরিয়ে হালকা খাবার খেয়ে নিয়ে হোটেলে ফিরে এসে, পরের দিনের ভ্রমণসূচি স্থির করলাম। উটি যাবো এবার। উটকামন্ড বা উধাগামণ্ডলম। তামিলনাড়ুর মধ্যে, নীলগিরি পর্বতমালায় অবস্থিত। 

পরেরদিন সকাল আটটার মধ্যে বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছে সরকারি কন্ডাক্টেড ট্যুরের টিকিট কেটে রওনা দিলাম উটি সফরের উদ্দেশ্যে। উটির পথে দুটি বিখ্যাত রিজার্ভ ফরেস্ট— বান্দিপুর ন্যাশনাল ফরেস্ট (কর্নাটক) এবং মধুমালাই বা মুড়ুমালাই ফরেস্ট (তামিলনাড়ু)। একসাথে ছয়টি গাড়ি যাচ্ছে আমাদের মতো ট্যুরিস্ট নিয়ে। সঙ্গে গাইড ও বন্দুকধারী সিকিউরিটির দল। প্রথমে বান্দিপুর ফরেস্ট, যার সৌন্দর্যে প্রাণ জুড়িয়ে গেল। রোজউড, টিক, চন্দন ইত্যাদি গাছের সমাহার। পথে প্রচুর হরিণ ও ময়ূর দেখলাম। দু'বার হাতির দলের দর্শন পেলাম। গাড়ির কনভয় দাঁড়িয়ে পড়লো। গাইড আমাদের কোনো শব্দ করতে নিষেধ করলো। পথে থেমে, কিছুক্ষণ পরে হাতির দল গভীর অরণ্যে প্রবেশ করলো। আমাদের কনভয় চলতে শুরু করেছে। চন্দনগাছ দেখে মনে পড়লো, চন্দনদস্যু বীরাপ্পন এই ফরেস্টেই চন্দনগাছ কেটে নিত। অত কুখ্যাত চন্দনকাঠ মাফিয়া ভারতবর্ষে ছিল না আর। সংবাদপত্রে পড়েছিলাম বীরাপ্পন সম্বন্ধে। যাইহোক, এবার আমাদের গাড়ির কনভয় মুড়ুমালাই অরণ্যে প্রবেশ করলো। সবুজ আরও গাঢ় এখানে। বেশ কিছু জীবজন্তু, পাখি চোখে পড়লো। শীত করতে লাগলো। নীলগিরি রেঞ্জে ঢুকে পড়ছি, ঠান্ডা তো হবেই। আমাদের কোনো ধারণা ছিল না যে, নীলগিরিতে যেতে হবে। আমি তো জিন্সের ট্রাউজার্স আর সুতির ঢোলা পাঞ্জাবি পরেছি, নিচে সাধারণ সুতির গেঞ্জি। উটি লেকে পৌঁছনোর আগে একটা জায়গায় পশমের টুপি কিনলাম, কানঢাকা। শীত থেকে একটু তো বাঁচলাম দুই বন্ধু! 

উটি লেকে পৌঁছে মন ভরে গেল। মনোরম সৌন্দর্য লেকের। লেকের দু'পাশে পাহাড়চূড়া। অনেকে বোটিং করছে লেকে। আমরা বোটিং করিনি। একটা রেস্তোরাঁয় মশলাদোসা ও কফি খেলাম। সমস্ত দক্ষিণ ভারত ভ্রমণে এত ভালো দোসা আর কোথাও পাইনি আমি।

এরপর উটির সুবিখ্যাত বোটানিক্যাল গার্ডেনে গেলাম। দু'কোটি বছরের পুরোনো ফসিল-গাছটি দেখে আমরা তো বিস্ময়ে হতবাক। পাহাড়ি ঢালে ২২ একর এলাকা নিয়ে গার্ডেনের বিস্তার। ওখানে এক কাশ্মীরি মুসলমান দম্পতিকে দেখলাম। আলাপ হলো। এত সুদর্শন মানুষ ও সুন্দরী মানবী আমি জীবনে খুব কমই দেখেছি। উদ্যানে, বলতে ভুলে গিয়েছি, গাছ ছেঁটে পশুপাখি ও ভারতের যে-মানচিত্র করা হয়েছে, তা মন মাতিয়ে দেয়। যা-যা দেখার, সব দেখে গাড়িতে ফিরে এলাম। এবার আবার ফিরতি পথের যাত্রা। শেষবিকেলের আলোয় পাহাড়ে একটা নেকড়েও দেখলাম। হাতির দল ফেরার পথেও রাস্তা জুড়ে দাঁড়িয়েছিল। ধীরে-ধীরে অরণ্যে ঢুকেও গেল একে-একে। আমরা সন্ধ্যা সাতটা মহীশূর ফিরে এলাম। এরপর হোটেল৷ একটু তাড়াতাড়ি নৈশ-আহার এবং নিদ্রামগনের পালা।

পরেরদিন সকালে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো, আজ শিবসমুদ্রম দেখতে যাবো। মহীশূর থেকে ৮০ কিমি দূরে। বাস বড়োরাস্তায় নামিয়ে দিয়ে চলে গেল। অন্য কোনো গাড়ি পাচ্ছি না। একজন পুলিশ সাব-ইন্সপেক্টর এগিয়ে এসে আমাদের সমস্যা জেনে বললেন, "একটা পুলিশের জিপ আসছে, আমি বলে দিচ্ছি, আপনাদের শিবসমুদ্রমের কাছে নামিয়ে দেবে। একঘন্টা সময় পাবেন আপনারা; ফেরার পথে জিপটি আবার আপনাদের নিয়ে এসে এইখানে নামিয়ে দেবে। এখান থেকেই মহীশূরগামী বাস পেয়ে যাবেন।"
ভদ্রলোকের এই আচরণে মুগ্ধ হয়ে গেলাম। শিবসমুদ্রমের কাছে অরণ্যময় পাহাড়ি পরিবেশে জিপটি নামিয়ে দিল আমাদের। আমরা শিবসমুদ্রমে পৌঁছে অবাক হয়ে দেখি, কাবেরী নদী ৯১ মিটার উঁচু থেকে জলপ্রপাতের আকারে ঝাঁপিয়ে পড়ছে গিরিখাদে। দু'ধারায় সৃষ্টি করছে গগনচুক্কি ও বরাচুক্কি নামের দুটি ফলস। মাঝে শিবসমুদ্রম ব-দ্বীপ। সত্যি বলতে কী, এমন প্রাকৃতিক দৃশ্য জীবনে কখনও দেখিনি। আমি বিস্ময়ে, আনন্দে একেবারে অভিভূত হয়ে গেলাম। যাইহোক, নির্বিঘ্নেই মহীশূর ফিরে এলাম। পরেরদিন ম্যাঙ্গালোর যাওয়ার পরিকল্পনা ঠিক হলো। 
(ক্রমশ)

Comments