শৈল, টাকি, থাকি, রাখি, পাখি। ডাকনাম। ভালোনাম লীলাবতী, বিভাবতী, প্রভাবতী, শোভারানি, আভারানি; আর বঙ্গেশ্বর, ভবেশ্বর, ব্রজেশ্বর। এই হলো পাঁচ মেয়ে তিন ছেলে। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের প্রফেসর ডাক্তার বানেশ্বর রায়ের। বঙ্গেশ্বর স্বাধীনতা সংগ্রামী। আন্দামান জেলে ছিলেন। মেজমেয়ে, যার ভালোনাম বিভাবতী, আমার ঠাকুমা তথা আম্মা, তাঁর বিয়ে হলো বরিশালের হোমিওপ্যাথ ডাক্তার নারদবিলাস ঘোষ রায়ের সঙ্গে। আইতে সাল যাইতে সাল, তার নাম বরিশাল। জল দিয়ে ঘেরা। যেন ভেনিস। সেই গ্ল্যামার অবশ্য তার ছিল না। তারপর দেশভাগ। তারপর অবিভক্ত পশ্চিম দিনাজপুর, অধুনা উত্তর দিনাজপুরে এসে আর্থিক অনটন ও সংগ্রামের জীবন। তখন এখানে পুরোই বনজঙ্গল চতুর্দিকে। বড়ো-বড়ো আম, কাঁঠাল, বেল ইত্যাদির বৃক্ষ। আর ছিল তুলসীর বন। সেই থেকে তুলসীপাড়া। বন কেটে মানুষ বসতি করছে। আমার জন্মের আগে, আমার বাপের বাড়ির জায়গাতেও বড়ো-বড়ো এরকমই জঙ্গল ছিল। আমি যখন হাঁটতে শিখেছি কি শিখিনি, তখন শুরু হয় আমাদের বাড়ি তৈরি। সে-সময় আমাদের পাশের সিংবাড়িতেও কাজ চলছে। আমাদের বাড়ির সদ্য তৈরি একতলার ছাদে খেলতে-খেলতে আমি একটা ইটের টুকরো নাকি ফেলে দিয়েছিলাম। নিচে পাশের বাড়িতে কাজ করা এক মিস্ত্রির মাথায় গিয়ে সেটি পড়ে, তার মাথা ফেটে যায়। এসব গল্পই আমার বাবার কাছে শোনা। বাবাদের ছোটোবেলায় রায়গঞ্জের বিখ্যাত ডাক্তারদের মধ্যে ছিলেন ডক্টর উদয়ন রায়, ডক্টর সত্যেন রায়, সুশীলবাবু। ছোটোবেলায় ডাক্তার উদয়ন রায়ের চেম্বারে বাবার সাথে দু-একবার গেছি বিভিন্ন কারণে ডাক্তার দেখাতে। তিনি অবিবাহিত ছিলেন। একটি বেড়ার বাড়িতে বাস করতেন। তাঁর সেই ভগ্নপ্রায় বাড়ি মিলনপাড়ায় এখনও দেখা যায়। বাবাদের ছোটোবেলার ডাক্তার উদয়ন রায় বাবাদের বাড়িতে একবার রোগী দেখতে এসে বাবার দাদুর ছবি দেয়ালে টাঙানো দেখে জিজ্ঞেস করেন, ইনি কে? আমার ঠাকুমা যখন জানান ইনি তাঁর বাবা, ডাক্তার উদয়ন রায় জানান, তিনি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ডাক্তার বানেশ্বর রায়ের ছাত্র। সেই সময় তাঁদের ভিজিট ছিল দু'টাকা। তিনি বাবাদের পরিবারে রোগী দেখতে এসে আর কখনও ভিজিট নিতেন না। সুশীল ডাক্তারবাবু আমার ভাইকে উদ্ধার করেছিলেন টাইফয়েডের হাত থেকে। আরেকবার ভাইয়ের কপালে একটি ফোঁড়া হয়ে ইনফেকশন হয়ে গোটা মুখ ফুলে চোখ বুজে গেছিল। তখন ট্রিটমেন্ট করে ভালো করেছিলেন ডাক্তার সত্যেন রায়। এসব কথাই বেশিরভাগ শোনা আমার বাবা-মায়ের কাছে গল্পচ্ছলে, কারণ আমার সবকথা মনে রাখার মতো বয়স ছিল না সেটা। আমি যখন স্কুলে পড়ি, তখন আমার দেখা ডক্টর বৃন্দাবনচন্দ্র বাগচি এবং নাক-কান-গলার ডাক্তার কল্যাণ সিনহাকে। তাঁর চেম্বার ছিল থানা রোডের অশোকা রেস্টুরেন্টের উল্টোদিকে আরেকটু এগিয়ে বাগচি ওয়াচ কোং-এর আশপাশে। বাবারা অবশ্য বলতো, ডাক্তার কল্যাণ সিং। আমার যখন মাস দশেক বয়স, সদ্য হাঁটছি, সেইসময় মা তেল মাখিয়ে রেখেছে স্নান করাবে বলে আর আমি গেট খোলা পেয়ে বেরিয়ে গেছি। কারোর একটা ছাড়া বাঁদর ঘুরে বেড়াচ্ছিল। সে এসে খুবলে দেয় পিঠে। আমার বম্মা আর মা আমায় নিয়ে যায় এই ডাক্তার কল্যাণ সিং-এর কাছে। সেই থেকে ডাক্তারবাবু আমাকে 'বাঁদরচাটা' বলে ডাকতেন। আমার বাবা-জেঠাদের সাথে ডাক্তারবাবুর ভালোই আলাপ ছিল। পরবর্তীকালে বাবার সেন্ট্রাল ব্যাঙ্কে যখনই ডাক্তারবাবু আসতেন, বাবাকে জিজ্ঞেস করতেন, "বাঁদরচাটা কেমন আছে?" ডাক্তার বৃন্দাবনচন্দ্র বাগচি-র সঙ্গে রায়গঞ্জের সাহিত্যজগতের যোগাযোগ ছিল। পরবর্তীকালে জানা যে তিনি 'শনিবারের সাহিত্য বাসর' ইত্যাদির অন্যতম উদ্যোক্তা ছিলেন, যেটা সিনহা শু হাউস-এ শুরু করেছিলেন আমার ক্লাসমেট লোপামুদ্রা সিনহা-র বাবা। রায়গঞ্জ ইনস্টিটিউটে তৎকালীন সংস্কৃতিজগতের কেষ্টবিষ্টুরা আড্ডা মারতেন। ইনস্টিটিউট মঞ্চে একাধারে নাটক হতো। বন্দর এলাকার জমিদার গোস্বামীবাড়ির ছেলেরা এতে অগ্রণী ভূমিকা নেন। রায়গঞ্জ টেন ক্লাস গার্লস এই গোস্বামীবাড়ির উদ্যোগ। আবার এই গোস্বামীবাড়ির বড়োবউ সুনন্দা গোস্বামী ম্যাডাম রায়গঞ্জ গার্লসে আমার দিদিমণি। পরবর্তীকালে আরও যোগাযোগ হবে তাঁর সঙ্গে তাঁর ম্যাগাজিন 'চৈতন্য'-র সূত্রে। তিনি কলকাতার বাংলা আকাদেমি মঞ্চে 'চৈতন্য'-র একটি অনুষ্ঠানে যেখানে কমলেশ গোস্বামী সম্পাদিত 'রায়গঞ্জের ইতিহাস'-এর প্রকাশ হয়েছিল, সেখানেই আমার দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ 'স্পর্শবিন্দু'-র মোড়ক উন্মোচন করবেন। আর ছিল ইনস্টিটিউট লাইব্রেরি, যার মেম্বার ছিলেন আমার জেঠুমুনিও। এই লাইব্রেরির কত যে বই পড়েছি আমি জেঠুমুনির কল্যাণে, তার ইয়ত্তা নেই। তার মধ্যে বিশেষ করে মনে রয়ে গেছে 'মৃচ্ছকটিক' আর 'আ প্যাসেজ টু ইন্ডিয়া'-র কথা; কারণ এ-দুটো বই অর্ধপঠিত অবস্থায় কেড়ে নিয়েছিল। কারণ সেগুলো বড়োদের বই। আর আমার বয়স তখন নয়-দশ। রায়গঞ্জ ইনস্টিটিউটের লাইব্রেরির কথা উঠলে, আরও দু'জনের কথা আমার খুব মনে পড়ে। এক হচ্ছেন তপনকিরণ রায়, বাবার মাসতুতো দাদা, যিনি একাধারে গল্পলেখক এবং সম্পাদক। তাঁর উদ্যোগে তৎকালীন রায়গঞ্জে বেশ কিছু সাহিত্যসভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। শক্তি, সুনীল, পূর্ণেন্দু পত্রী, অমিতাভ দাশগুপ্ত ঘুরে গেছেন রায়গঞ্জে। থেকে গেছেন তাঁর ব্যবস্থাপনায় তাঁর উকিলপাড়ার বাড়িতেও। তিনি সদা মিষ্টভাষী, চিরকুমার, সাদা ধবধবে পাজামা-পাঞ্জাবী পরিহিত, কাঁধে একটি ঝোলা— যাতে থাকতো নানা ম্যাগাজিন। তাঁর শেষজীবনে একটি সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম 'শব্দের মিছিল' ব্লগজিনের জন্য। আর ছিলেন কবি নীরদ রায়, যিনি একাধারে রায়গঞ্জের সাহিত্যজগতের উজ্জ্বল নক্ষত্র এবং সেন্ট্রাল ব্যাঙ্কে আমার বাবার কলিগ। যাঁর নতুন বই বেরোলে বাবাকে এক কপি গিফট করতেন এবং অবধারিত সেটা আমার হাতে এসে পৌঁছতো। সেই থেকে তাঁর লেখার সঙ্গে আমার পরিচয়। পরবর্তীকালে 'আনন্দমেলা'-র হয়ে তিনি আমার সাক্ষাৎকার নিতে আমাদের বাড়িতে আসবেন, আমি যখন দশম শ্রেণির ছাত্রী তখন; আমার স্কুল রায়গঞ্জ গার্লস সম্পর্কে তাঁর যে-লেখা বেরোবে, তার জন্য। রায়গঞ্জ করোনেশন স্কুলকে নিয়েও তিনি লিখেছেন 'আনন্দমেলা'য়। করোনেশানের সে-সময় দশম শ্রেণির প্রথম ছাত্র ছিল সন্দীপ সারদা। ওদের হার্ডওয়ার এবং রঙের দোকান আজও আছে বিবিডি মোড়ে। ওর বাবার নাম ছিল শংকর সারদা। যাঁকে আমি কাকু বলে ডাকতাম। কাকুকে শেষ দেখেছি আমার নিজের বাড়ি যখন রঙ করার জন্য আমি ওই দোকানে যাই তখন, আর সন্দীপ সম্ভবত এখন বিদেশে থাকে।
(ক্রমশ)
উপভোগ্য গদ্য
ReplyDelete