মহীশুরে এসে বিখ্যাত মাইসোর জ়ু দেখবো না, তাই কি হয়! অতএব, পরেরদিন বেলা ১০টায় বাসে চেপে চলে এলাম মহীশুর চিড়িয়াখানায়। কয়েক একর জমি জুড়ে বিশাল চিড়িয়াখানা। ঢুকেই প্রথমে চোখে পড়লো জিরাফ এনক্লোজ়ার। দুটো জিরাফ দেখতে পেলাম আমরা। খুব ভালো লাগলো। এরপর একে-একে নানা জায়গায় নানা পাখি, নানা পশু। সাদা বাঘ, সিংহ, হাতি, গন্ডার, জ়েব্রা। কুমিরের ডেরা। সব এনক্লোজ়ারের মধ্যে। এনক্লোজ়ারের মধ্যে বিস্তর ফাঁকা জায়গা, যাতে পশুরা স্বাধীনভাবে ঘোরাফেরা করতে পারে। বেশ আমোদিত হলাম চিড়িয়াখানাটি দেখে। ওই যে বললাম, চিড়িয়াখানায় ঢুকে প্রথমেই যাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছিল, সেই সুদর্শন জিরাফদ্বয়কে নিয়ে বাড়ি ফিরে একটি কবিতাও লিখেছি। কবিতাটি আমার 'স্তম্ভগাথা ও অন্যান্য কবিতা'-য় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
জিরাফ, মাইসোর জু
সুদর্শন জিরাফের গায়ে সূর্যের সাত রং পিছলে যেতেই আমারও মনে হল
জিরাফেরা ঈশ্বরের কাছাকাছি আছে। ঘাস খাচ্ছে খুঁটে খুঁটে যথারীতি বিরতি রেখেই।
আহা ঘাস—সে হচ্ছে প্রভুর রুমাল। প্রভু খুব দয়াপরবশ। এ প্রবাসে
দশ টাকা টিকিটের ফলে বিদেশি একজোড়া অপরূপ জিরাফের দেখা পাওয়া
সৌভাগ্য নয়! আমি সেই বঙ্গদেশ থেকে এ কথা জানার পর জিরাফদ্বয়ের
এনক্লোজার ছিঁড়ে ফেলা চিঁ-চিঁ আহ্লাদ। আহ্লাদে আকাশের দিকে উঁচু গলা ছুঁড়ে দিয়ে
আবারও নামিয়ে একজন বলে ওঠে, তাহলে তো ধর্মে আছো, জিরাফেও আছো।
(জিরাফেরা কবিতা পড়ে, তাও আবার শক্তি চাটুজ্জের! এ কথা জেনে মনে
কতখানি ফূর্তি হল বলো?) ফূর্তিটাই সারকথা ভাই, ফূর্তি লোটার জন্য
লোকে কত দূরদেশে যায়, মদ্য পান করে, জুয়োটুয়ো খেলে, ঘোড়ারোগে
সর্বহারা হয়ে ক্লাউনের বেশে গিটার বাজায়। আমি শুধু মাইসোরে, চিড়িয়াখানায়!
জিরাফের দেখা পেয়ে পদ্যটদ্য, ধম্মটম্ম শক্তিটক্তি হল। ওপাশে বাঘ ডাকছে
সম্বরেরা পালাচ্ছে দুদ্দাড়। আমাকেও যেতে হবে। এত ফূর্তি পেটে সওয়া ভার।
পরেরদিন স্নান সেরে হোটেল ছেড়ে দিয়ে বাসস্ট্যান্ডে এসে ওখানেই বাসের টিকিট কেটে সিট বুক করে, ব্রেকফাস্টে ইডলি ও কফি খেয়ে বাসে চড়ে বসলাম। রাস্তার দু'পাশের দৃশ্য দেখতে-দেখতে দুপুর দুটোয় ম্যাঙ্গালোর শহরে চলে এলাম। আরব সাগরের তীরে বন্দরনগরী ম্যাঙ্গালোর। পৌঁছেই থাকার জন্য ছোটো একটা হোটেলে রুম বুক করে ব্যাগপত্তর রেখে আমরা এক রেস্তোরাঁয় মধ্যাহ্নভোজ সেরে, বাসে করে চলে এলাম মঙ্গলাদেবীর মন্দিরে। পরেরদিনই কালীপুজো। মন্দিরটি সুন্দর সাজানো হয়েছে। পুরোহিতরা ভীষণ ব্যস্ত। আমরা দেবীদর্শন সেরে মন্দির থেকে বেরিয়ে, মনোরম পাহাড়ি প্রাকৃতিক পরিবেশে ঘেরা শহরটি দেখতে থাকলাম। তারপর বিকেলবেলা চলে গেলাম উল্লাল বিচে। সমুদ্রসৈকতে কিছুক্ষণ কাটিয়ে সন্ধ্যা উত্তীর্ণ হতেই হোটেলে ফিরে বিশ্রাম। হোটেলে ঢোকার সময়ে রাতের খাবার প্যাকেট করে নিয়ে এসেছিলাম। রাত ন'টা নাগাদ খাবার খেয়ে বিছানায়। গভীর ঘুম। আগামীকাল হসপেট যাবো। হাম্পি দেখতে। বিজয়নগর সাম্রাজ্যের ধ্বংসাবশেষ দেখতে — দ্য গোল্ডেন রুইন্স অফ হাম্পি।
সকাল আটটায় হসপেটগামী বাসে উঠলাম। ওটার সময় এক ভদ্রলোককে বাসে উঠতে সাহায্য করলাম, ওঁর বাঁ-হাতে প্লাস্টার। আমার পাশের সিটেই ওঁর সিট। আলাপ হলো। বাঙালি। যাদবপুরের মানুষ। মাল্টিন্যাশনাল এক কোম্পানিতে কাজ করেন। মেরিন ইঞ্জিনিয়ার। সাংহাইয়ে এক জাহাজের বয়লার ঠিক করার সময়ে হাতে একটা রড পড়ায় এই দুর্ভোগ। এখন ফিরছেন সাংহাই থেকে। যাবেন চিকমাগালুর। ওখানে ওঁর বাড়ি ও কফি প্ল্যান্টেশন আছে। স্ত্রী কলকাতার এক কলেজে পড়ান। ছেলে চিকমাগালুরে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে। ছেলের পড়াশোনার সুবিধার জন্য চিকমাগালুরে বাড়ি কিনেই ফেলেছেন! বন্ধুর পরামর্শে কফি প্ল্যান্টেশন। ভদ্রলোক আমাদের কাছে বিদায় নিয়ে চিকমাগালুরে নেমে গেলেন। বাস আবার চলতে লাগলো। পথে মাডিকেরি। আমাদের বাসপথ থেকে একটু দূরে। আমরা হসপেট পৌঁছলাম বিকাল চারটে নাগাদ। দীর্ঘ জার্নি। মাঝে মধ্যাহ্ন আহারের বিরতি ছিল ৪০ মিনিট। হসপেট এক সাবডিভিশনাল শহর। সুন্দর শহর। তুঙ্গভদ্রা নদীর তীরে এর অবস্থান। আমরা একটা চমৎকার হোটেলে উঠলাম। থাকা ও খাওয়া সবকিছুরই ব্যবস্থা আছে এখানে। রুমে লাগেজ রেখে ফ্রেশ হয়ে ডাইনিং হলে কফি খেতে এলাম। ম্যানেজার আমাদের টেবিলে এগিয়ে এসে একজন বয়কে ইঙ্গিত করতেই, সে আমাদের জন্য দু'প্লেট প্রসাদ নিয়ে এল। কালীপুজো আজ। দক্ষিণে ওদের আজ মহালক্ষ্মী পুজো। সেই পুজোর প্রসাদ। লুচি, হালুয়া, বরফি, লাড্ডু, ফলফলারি। সে এক এলাহি ব্যাপার! এসবের সদব্যবহার করার পরে কফি খেলাম। কফির দামও নিলেন না! আর বললেন, "আজ আপনারা শুভদিনে এলেন। রাতের ডিনারও আমাদের পক্ষ থেকে।" মনে-মনে বললাম, বাঃ, হসপেটে তো আপ্যায়ন হচ্ছে খুব আমাদের! জয় হাম্পি।
এবার পায়ে হেঁটে তুঙ্গভদ্রার তীরে গিয়ে বিখ্যাত এই নদীর সঙ্গে আলাপ-পরিচয় হলো কিছুটা। আগেই অবশ্য হয়েছিল শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিখ্যাত উপন্যাসের হাত ধরে। বেশ কিছুক্ষণ পর হোটেলে এসে বিশ্রাম করছি। রুমবয় এসে দরজা নক করলো। ত্রিনাথদা দরজা খুলতেই সে দু'প্লেট রাতের খাবার ঘরের টেবিলে নামিয়ে দিল। এত পরিমাণ খাবার! আমরা একটা প্লেট ফিরিয়ে দিয়ে ওকে বললাম, একটা খালি প্লেট দিয়ে যাও। ও তাই করলো। জলের জগ ও গ্লাস তো ছিলই। খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। পরেরদিন হাম্পি।
হসপেট হচ্ছে হাম্পির তোরণদ্বার। আমরা হসপেট থেকে ১৩ কিমি দূরে হাম্পি পৌঁছলাম বেলা ১০টায়। সেবার দিল্লি থেকে প্রচুর ট্যুরিস্ট এসেছিলেন বিজয়নগর সাম্রাজ্যের ধ্বংসাবশেষ হাম্পি দেখতে। এঁরা আমাদের বাসেই সহযাত্রী ছিলেন। আমরা প্রথমেই গেলাম বিরূপাক্ষ মন্দির দেখতে। বিরূপাক্ষ অর্থাৎ শিব। মন্দিরের পুবের গোপুরমটি ৫০ মিটার উঁচু। অলিন্দমণ্ডপ অপূর্ব কারুকার্যময়। ১৫০৯ সালে রাজা কৃষ্ণদেব রায় এটি নির্মাণ করান। এবার দেখলাম জেনানা মহল। মহলের ওয়াচ টাওয়ার, দ্বিতল লোটাস মহল সত্যিই দেখার মতো। পাশেই রয়েছে কুইন বাথ। একদা রানিদের স্নানাগার। বর্তমানে অবশ্য জল নেই, শুকনো খটখটে। বিঠাল মন্দিরও দেখলাম। বিজয়নগর স্থাপত্যের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন। এর মিউজিক্যাল পিলারে আঘাত করলে, সঙ্গীতের সুর বাজে। হাম্পির এইসব অত্যাশ্চর্য স্থাপত্য দেখে আমি গভীরভাবে মুগ্ধ হয়েছিলাম। বাড়ি ফিরে বেশ কিছুদিন পরে হাম্পি নিয়ে দুটি কবিতাও লিখেছিলাম। কবিতাদুটি আমার 'স্তম্ভগাথা ও অন্যান্য কবিতা'-য় আছে। কবিতাদুটি আমি এখানে উদ্ধৃত করছি।
হাম্পি [কর্নাটক ভ্রমণ, হেমন্ত, ১৪০৯]
এক
গণেশ তো পাথরের। বিরূপাক্ষ তাও। তুমি তো পাথর নও
তন্বী ট্যুরিস্ট, দিল্লী প্রবাসিনী, সাথী গুর্জর। হাম্পিতে ঘুরে দেখছ
পুরানো প্রাসাদ কীভাবে হয়ে ওঠে গাইডের হাতে কখনও রুদ্রবীণা
আর পাখোয়াজ। আড়াল খুঁজছ তুমি সে আমরা বুঝি
(বাকিরা কি মনে মনে আড়াল খোঁজেনি!) আর তাই পূজ্যপাদ পণ্ডিতের
সাথে ইতিহাস চর্চা নিয়ে মগ্ন হতে হতে কখন যে দলছুট সূর্যের রথ
পার হয়ে এইখানে আবছা পিলারে একটু থেমে আছি সে খেয়াল নেই।
হঠাৎই চোখে পড়ে নগ্ন যক্ষিণী যক্ষকে বাহুপাশে শুষে নিচ্ছ যেন
কিন্তু হে যক্ষিণী পাথরের নও, শিবানী অগ্নিহোত্রী, তরুণী ট্যুরিস্ট
পাথরে মিশে যাচ্ছ মিশে যেতে যেতে তুমিও কি পাথরের
এই মন্দিরে চিরকাল চুম্বনে জেগে রবে আর গুর্জর যুবকের তৃষ্ণা জাগাবে!
হাম্পির স্বর্ণাভ ধ্বংসাবশেষ দেখে পরিপূর্ণ সন্তোষ নিয়ে হোটেলে ফিরে এলাম আমরা। শেষ অপরাহ্নবেলায় তুঙ্গভদ্রার কাছে গেলাম। তুঙ্গভদ্রা ড্যাম দেখলাম। সন্ধ্যাশেষে হোটেলে ফিরে হোটেলের বিল মিটিয়ে ওদের বলে দিলাম, আগামীকাল ব্রেকফাস্ট করে আমরা বাদামি-র উদ্দেশে বেরিয়ে যাবো।
পরদিন সকাল ন'টার বাস ধরে চললাম হসপেট থেকে ১৬৭ কিমি দূরে বাদামি-র উদ্দেশে। বাসে ছ'ঘন্টার পথ। পথে লাঞ্চব্রেক। ঠিক সময়ে বাদামি পৌঁছে হোটেলে রুম বুক করে নিলাম। কফি খেয়ে বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে বসলাম দুই বন্ধু। বাদামভাজা খেতে-খেতে যাত্রীদের গতিবিধি নিরীক্ষণ করতে লাগলাম। যথাসময়ে হোটেলে ফিরে নৈশ আহার ও বিশ্রাম। পরেরদিন সকালে পাট্টাডাকাল ও আইহোলির পুরাকীর্তি দেখতে গেলাম। বাদামি গুহামন্দির দেখে বিস্ময়ে হতবাক হয়েছি। এসথেটিক্সের চূড়ান্ত পর্যায় হলো বাদামি-র গুহাচিত্র। চালুক্য রাজাদের হাতে নির্মিত হয় এই অত্যাশ্চর্য সুন্দর।
হোটেলে ফিরে খাওয়াদাওয়া সেরে বিশ্রাম। সন্ধ্যায় বাসস্ট্যান্ডের টি-স্টলে কফি খেলাম ও কিছু সময় কাটিয়ে হোটেলে ফিরলাম। পরেরদিন সকালে রওনা দিলাম বিজাপুরের উদ্দেশে। বিজাপুর হলো আমাদের কর্নাটক ভ্রমণের শেষ অধ্যায়। বাদামি থেকে ১৩২ কিমি দূরে।
বাসেই গেলাম। পৌঁছলাম বেলা আড়াইটেয়। পথের ধারে একটা ধাবায় রুটি ও ডালফ্রাই খেলাম। এরপর কফি খেয়ে ওই ধাবাতেই মিনিট দশেক বসে, বেরিয়ে পড়লাম বিজাপুরের দর্শনীয় স্থান দেখতে। প্রথমেই টাঙ্গায় চেপে চলে গেলাম গোলগম্বুজ দেখতে। আদিল শাহ-র সমাধিসৌধ এটি। গম্বুজের উচ্চতা ৫১ মিটার। মেঝের আয়তন ১৭০০ বর্গমিটার। ডোম অর্থাৎ গম্বুজটির পরিধি প্রায় ৩৮ মিটার। বিশালতায় পৃথিবীর দ্বিতীয়। বৃহত্তমটি রোমের সেন্ট পিটার্স ব্যাসিলিকা-র ডোম, ৪২ মিটারের। চারকোণায় চারমিনার রয়েছে। এর ওপর থেকে শহরের সৌন্দর্য অবলোকন করলাম আমরা। এরপর গেলাম জামে মসজিদ দেখতে। ১০৮১০ বর্গমিটার এলাকা জুড়ে দীর্ঘসময় ধরে নির্মাণকার্য চললেও মসজিদটি অসমাপ্ত। মহাত্মা গান্ধী রোডে চকচকে বিশাল কামান মালিক-ই-ময়দান অর্থাৎ রণক্ষেত্রের প্রভুও দেখলাম।
সন্ধ্যাবেলায় বাস ধরে আমরা মহারাষ্ট্রের আওরঙ্গাবাদ চলে এলাম। রাতে পৌঁছে এক পাঞ্জাবি শিখ ভদ্রলোকের হোটেলে থাকলাম। খেলাম রাস্তার ধারের ধাবায়। আগামীকাল কন্ডাক্টেড ট্যুরে অজন্তা যাবো আমরা।
(ক্রমশ)
Comments
Post a Comment