শর্মিষ্ঠা ঘোষ

চরকা তাঁত এবং থেলো হুঁকোর একটা ছেলেবেলাও আছে আমার। একদা আমাদের তুলসীপাড়ার আরেকটা নাম ছিল আমার ছোটোবেলায়। তাঁতিপাড়া। কারণ, বেশ কয়েক ঘর তন্তুবায় সম্প্রদায়ের মানুষ বাস করতেন এই পাড়ায়। করতেন বলা ভুল, এখনও করেন; তবে তাঁদের সেই পেশা আর নেই। তাঁরা নানা চাকরি এবং ব্যবসায় প্রবেশ করেছেন। সেইসঙ্গে আর দেখা মেলে না তাঁদের ব্যবহৃত তাঁত, চরকা, মাকু এবং হুঁকোর। চরকাগুলোর একটা দিক গাঁথা থাকতো মাটির মধ্যে। দুটো পার্ট। টাকায় গান্ধীর চরকা তো দেখেছেন সবাই। আরেকদিকে হাতল ঘোরালে চরকা ঘুরতো। তাতে পেঁচানো হতো নানারঙের সুতো। রঙের বালতিতে চুবিয়ে সুতো রঙ করা হতো। তারপর সেই সুতো লাছি বানিয়ে মেলে দেওয়া হতো রোদে শুকানোর জন্য। আর ছিল পায়ে-টানা তাঁত। উপর থেকে লম্বা একটা টানা মতো ঝুলতো। পায়ে ছিল প্যাডেল টাইপের কিছু। হাত এবং পা একসাথে কাজ করতো। মাকু চলতো খটাখাট। বোনা হতো রঙবেরঙের তাঁতের শাড়ি। গামছা। লুঙ্গি। তাঁতঘরের হতো মাটির মেঝে, খড়ের চাল, চারদিকে খোলা। তন্তুবায় বসতেন উঁচু একটা বাঁশের সরু মাচায়। পরনে সাদা লালচে হয়ে আসা খেটো ধুতি, খালি গা বা ফতুয়া। বিড়ি টানতে-টানতে তাঁত চালাতেন পুরুষরা। মহিলারা চরকায় সুতো কাটতেন বা প্যাঁচাতেন। সেই ছোটোবেলায় যদি জানতাম যে এগুলো একসময় জাদুঘরে চলে যাবে, ভালো করে দেখে রাখতাম তার কার্যপ্রণালী। ক্যামেরা বা মোবাইল তো ছিল না, কাজেই ছবিও তোলা নেই। সবটুকু ছবি স্মৃতি থেকেই আঁকি। আমাদের পাড়ার চলাচলের রাস্তাগুলো তখনও ছিল এর বাড়ির উঠোন তার বাড়ির রান্নাঘর কিংবা গোয়ালঘরের পাশ দিয়ে। প্রায় সব বাড়িতেই একটা-দুটো গরু-ছাগল থাকত। আর ছিল মুরগি পোষার চল। লোকের মুরগি পাড়ায়-পাড়ায় ঘুরে সন্ধ্যায় নিজের কোটরে ঢুকতো। সকালবেলা ঘুম ভাঙতো মোরগের কোঁকরকোঁ ডাকে। বাছুর খুঁটোয় বেঁধে সকালবেলা একটা লোহার বালতিতে কালিগাইয়ের দুধ দুইতে বসতো আম্মা, মানে আমার ঠাকুমা। সংক্রান্তির দিন পিটুলি গুলে তার পিঠে গোল-গোল ছাপ এঁকে দিত। আমার ছোটোবেলায় আমার বাবাও নাকি এক গরু কিনে হাজির করেছিল, মেয়ে খাঁটি দুধ খাবে বলে। সে অতি দুষ্টু। মায়ের একবার হাত অনেকটা কেটে যায় তার পাল্লায় পড়ে। একবার বাছুর মরে যায়। তখন চামারেরা চামড়ার ভেতর ভুষি-খড় পুরে স্টাফ করে দিয়েছিল। অবশেষে গোশালায় সেই গরু দান করে দেয় বাবা। মাঝেমাঝে তাকে দেখতে যেত। দুঃখ করতো, ওরা পেট ভরে বোধহয় খেতে দেয় না বলে। এই গরুর গোবরে ঘুঁটে দিতেন বাড়ির মহিলারা। গুল, কয়লা আর ঘুঁটে দিয়ে মাটির তোলা উনুনে রান্না হতো। আমাদের পাড়ার প্রথম গ্যাস আমার বম্মার। সাদা রঙের ওভেন। ওরকম ওভেন খুব একটা চোখে পড়েনি কোথাও। পিকনিক হলে বা ব্যাপার বাড়ি, উঠোনে গর্ত করে খড়ির উনুন হতো। পাড়ায় পানাদা-দের মুদিদোকানে খড়ি বিক্রি হতো। পানাদা ছিল দাদাভাই, মানে আমার জ্যাঠতুতো দাদার বন্ধু। আম বা কাঁঠালকাঠ কুইন্টাল হিসেবে বিক্রি হতো ওদের দোকানে। আম্মা মারা গেলে রাতে পানাদা এসেছিল। দোকান থেকে সিগারেট এনে দিয়েছিল আমার চেইনস্মোকার জেঠুমুনিকে। ধাক্কা খেয়েছিলাম, শোকও নেশা কাটাতে পারে না জেনে। জেঠু মারা গেছিল গলায় ক্যান্সার হয়ে। আরেকটা জিনিস বিক্রি হতো রেশন দোকানের ডিলারের বাড়ির পাশে। কয়লার গুঁড়ো। কেজি হিসেবে কিনে আনা হতো। তার সাথে কাঠের গুঁড়ো মিশিয়ে টিনশিটের ওপর গোল-গোল বড়ির মতো ছোটো-ছোটো গুল দিতেন মহিলারা। সেই গুল‍ও ব্যবহার হতো উনুন জ্বালাতে। সকাল হলেই সব বাড়ি থেকে কুণ্ডলী পাকিয়ে উঠতো সাদা ধোঁয়া। আঁচ বাড়ানোর জন্য একটু নুনের ছিটে দিয়ে দেওয়া হতো। আর আঁচ পড়ে গেলে, পড়ন্তবেলায় ঢিমে আঁচে হতো বেগুনপোড়া, জল বা দুধ গরম। শীতকালে ভাতের হাঁড়ি বসিয়ে রাখা হতো গরম রাখার জন্য। হাতে তো ক্যামেরাও ছিল না তখন যে, ছবি তুলে রাখবো। যতটুকু দেখাশোনা, সবই ওই স্মৃতির ঘরে রাখা। পাড়ায় তন্তুবায় সম্প্রদায়ের বয়স্ক মানুষেরা খেতেন হুঁকো। কালোরঙের নারকেলের খোল, তার সঙ্গে একটা ফুটখানিক লম্বা ডান্ডা, তার মধ্যে বাঁশির মতো ফুটো, যেটা দিয়ে ধোঁয়া টানলে গড়গড় শব্দ হতো। হুঁকোতে থাকতো দুটো থাক, যার তলায় জল এবং ওপরে টিকার আগুন। এখন আমরা আধুনিক হুঁকাবারে যে রকম গড়গড়া দেখি, ব্যাপারটা তারই আদি সংস্করণ বলা যায়। এত লম্বা নল তাতে থাকতো না আর লোকজনও গদিতে আসিয়ান হয়ে টানতো না মোটেই। মহিলা-পুরুষ নির্বিশেষে হাঁটু মুড়ে কুঁজো হয়ে বসে হুঁকো টানতো। গলায় কন্ঠি, নাকে-কপালে তিলক। বোষ্টম। দিনেরবেলা চরকা কাটতেন, তাঁত বুনতেন। গান করতেন সন্ধ্যাবেলা। শেষ এরকম নারকেলের মালার হুঁকো দেখেছি রায়গঞ্জ মোহনবাটী বাজারে অনিলবাবু নামে এক চালের দোকানের মালিকের কাছে। তবে ছবি তুলবো বলতে লজ্জা লেগেছে। সুকুমার রায়ের স্কেচে ওরকম হুঁকোমুখো দেখতে পারেন।
(ক্রমশ)



Comments