বর্ষা এসে গেল। জর্জ বিশ্বাসের কণ্ঠে ''বহু যুগের ওপার হতে'' শুনতে-শুনতে অর্বাচীন ভাবলো, বর্ষা কি এখনও বহুযুগের ওপার থেকে আসে? কী জানি! আগে হয়তো আসতো, এখন আর আসে না। এখন, এই যুগে, কাছাকাছি কোনো স্টেশন থেকে বোধহয় আসে। তাহলে, এই যে আবহাওয়া দফতর বলে, বর্ষা আসতে এবার একটু দেরি হবে; জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে কেরলে ঢুকবে, তার দিন সাতেক পরে বাংলায় ঢুকবে; তার মানেটা কী?
— ধুস, বুজলেন না মশই? আরে বাপু, আন্দামান থেকে ভায়া কেরল এই বাংলায় ঢুকবে। অতটা পথ, দেরি তো একটু হবেই! তা নিয়ে হাপিত্যেশ করার কী আছে? তারপর ধরুন, মাঝখানে কত কী ঘটতে পারে! পথ অবরোধ হতে পারে। রেললাইনের উপর গাছ পড়তে পারে বা কেউ শুয়ে পড়তে পারে বা ধরুন, কত কী ঘটতে পারে। কত হ্যাপা বলুন দিকি!
— ট্রেনও তো লেট করতে পারে।
— মানে!
— আরে মশই, কেরল থেকে বর্ষাদেবী আসবেন, তা ট্রেন যদি লেট করে তাহলে তো তাঁর আসতেও দেরি হবে।
— তার মানে বলছেন, পলাশীর যুদ্ধের মতো? লালগোলা প্যাসেঞ্জার একদিন পরে পৌঁছানোর জন্য সিরাজ হেরে গেল?
— ঠিক তাই। তবে এবার কিন্তু বর্ষা মোটামুটি ঠিক সময়েই এসেছে। অবশ্য তার আগে কমাণ্ডো বাহিনী ঝটিকা সফর করে গেল।
— মানে!
— মানে!
— বুইলেন না? আরে মশই ,ওই যে নিম্নচাপ।
— হেঁ-হেঁ, বেশ বলেচেন।
অর্বাচীনের মাথাটা ভোঁ-ভোঁ করছে। মোবাইলে আঙুল দিয়ে ঠেলে গানটা বন্ধ করলো। জর্জ বিশ্বাস ওপরের দিকে যেতেই সুচিত্রা মিত্র গাইতে শুরু করলেন ''শ্রাবণের গগনের গায়''। ধুস, শ্রাবণ আসতে দেরি আছে। আগে আষাঢ় আগে বিদায় হোক। আবার আঙুল ঠেললো। এবার হেমন্ত ''তুমি রবে নীরবে''...ধুস, আমি তো নীরবেই আছি। গিন্নি এখন রান্নাঘরে ব্যস্ত। এখানে আমি একা। কথা কইবার তৃতীয় লোক নেই। তা নীরবে থাকবো নাকি শ্লোগান দেবো? ধুত্তোর!
বাইরে রিমঝিম বৃষ্টি পড়ছে। সঙ্গে ভ্যাপসা গরম। বারান্দায় বসে মোবাইল ঘাঁটছি। অমনি কিন্নরীকণ্ঠে ''রিমঝিম বরষে..."। আঃ কতদিন পর! অর্বাচীনের মনে একটা পালক বুলিয়ে দিল। এই সময়ে এমন রোমান্টিক গান না-হলে জমে! বৃষ্টির হালকা ছাট আসছে। মনের মধ্যে যেন মুড়ি-চানাচুরের খুশবু ছড়িয়ে পড়েছে। মনটা তাক ধিন তাক ধিন করছে। ঠিক সেই সময় কাঁসার বাসন ঝনঝন করে ফেলার মতো ভেসে এলো, তোমার কি আর কোনো কাজ নেই? সক্কালবেলা গান শুনতে বসেচো?
— এমন বর্ষায় গান না শুনলে...
— গান শুনলেই পেট ভরবে? বাজার করতে হবে না? বাজার না-করলে গিলবে কী?
— এমন বর্ষায় গান না শুনলে...
— গান শুনলেই পেট ভরবে? বাজার করতে হবে না? বাজার না-করলে গিলবে কী?
অর্বাচীন মোবাইল ঘসে সময় দেখে। আরিব্বাস ন'টা বাজতে চললো! বাজারে টাটকা মাছ আর একটাও থাকবে না। এরপর গেলে গতকালের বরফের মাছ গছিয়ে দেবে। নাঃ, এবার উঠতেই হবে।
ঠিক সেই সময় ঘরের ভিতর থেকে হাঁক এল, খেয়ে নিয়ে বাজারটা করে এসো।
একটু থমকে গেল অর্বাচীন। তারপর মোলায়েম স্বরে বললো, আজ তোমার কী হলো বলো দিনি। সকাল থেকেই বাজ পড়ার মতো মেজাজ!
— মেজাজ আবার কোতায় দেকলে?
— ও বাবা, এ যদি মেজাজ না-হয় তালে মেজাজ কাকে বলে!
ওপার থেকে উত্তর না-পেয়ে সুড়সুড় করে খাবার টেবিলে গিয়ে বসলো। এই বর্ষার সকালে ফুলকো লুচি দেখে আনন্দে চারপাক ঘুরে নিতে ইচ্ছে হলো। নিজের মনেই বরষে রিমঝিম ভাঁজতে-ভাঁজতে সানন্দে লুচি চালান করলো উদরে।
ওপার থেকে উত্তর না-পেয়ে সুড়সুড় করে খাবার টেবিলে গিয়ে বসলো। এই বর্ষার সকালে ফুলকো লুচি দেখে আনন্দে চারপাক ঘুরে নিতে ইচ্ছে হলো। নিজের মনেই বরষে রিমঝিম ভাঁজতে-ভাঁজতে সানন্দে লুচি চালান করলো উদরে।
বাজারের থলি হাতে জিজ্ঞেস করলো, কী-কী আনতে হবে বলো।
গিন্নি এবার পানের লিপস্টিক মাখানো ঠোঁটে হাসি ছড়িয়ে বললো, একটু ইলিশ পাও কিনা দেখো তো।
গিন্নি এবার পানের লিপস্টিক মাখানো ঠোঁটে হাসি ছড়িয়ে বললো, একটু ইলিশ পাও কিনা দেখো তো।
— পাবো তো বটেই। তবে বারোশো থেকে পনেরোশোর নিচে হবে বলে মনে হয় না। আঠারোশোও হতে পারে।
— তা হোক গে। বছরে একদিন মুখ না-চাখলে হয়!
— তাও আবার বর্ষা, কী বলো?
অর্বাচীন এবার আত্মস্থ হয়ে জিজ্ঞেস করলো, মুগ ডাল আছে?
— মুগ ডাল কী হবে?
— তাহলে তোমার ওই গোবিন্দভোগ চাল আর সোনামুগ ডাল দিয়ে খিচুড়ি, সঙ্গে ইলিশ ভাজা। বর্ষায় জমে যাবে, কী বলো?
— সেজন্যই তো বললাম।
জয় হোক গিন্নি। দ্রুত বাজারের পথ ধরলো। যাই, ভালো ইলিশ তুলতে হবে। মনের মধ্যে ছোটোবেলায় কিশলয় বইতে রবি ঠাকুরের লেখাটা ফিরে এল— আবদুল মাঝি ছুঁচলো তার দাড়ি, গোঁফ তার কামানো...সে এনে দিত ইলিশ মাছের ডিম।
বাজারে ঢুকেই গোঁত্তা খেল। আঠারোশোর নওচে ইলিশ নেই। দামের পারদ একজায়গায় স্থির। ব্যাজারমুখে ইলিশ কিনে বাড়ি ফিরতে-ফিরতে বুঝলো, মনের ভিতর থেকে গান উধাও হয়ে গেছে। গান এখন মেশিনগান হয়ে গুলি চালাচ্ছে ইচ্ছেগুলোর উপর।
অর্বাচীন এবার আত্মস্থ হয়ে জিজ্ঞেস করলো, মুগ ডাল আছে?
— মুগ ডাল কী হবে?
— তাহলে তোমার ওই গোবিন্দভোগ চাল আর সোনামুগ ডাল দিয়ে খিচুড়ি, সঙ্গে ইলিশ ভাজা। বর্ষায় জমে যাবে, কী বলো?
— সেজন্যই তো বললাম।
জয় হোক গিন্নি। দ্রুত বাজারের পথ ধরলো। যাই, ভালো ইলিশ তুলতে হবে। মনের মধ্যে ছোটোবেলায় কিশলয় বইতে রবি ঠাকুরের লেখাটা ফিরে এল— আবদুল মাঝি ছুঁচলো তার দাড়ি, গোঁফ তার কামানো...সে এনে দিত ইলিশ মাছের ডিম।
বাজারে ঢুকেই গোঁত্তা খেল। আঠারোশোর নওচে ইলিশ নেই। দামের পারদ একজায়গায় স্থির। ব্যাজারমুখে ইলিশ কিনে বাড়ি ফিরতে-ফিরতে বুঝলো, মনের ভিতর থেকে গান উধাও হয়ে গেছে। গান এখন মেশিনগান হয়ে গুলি চালাচ্ছে ইচ্ছেগুলোর উপর।
ছাতার ফুটো দিয়ে জল পড়ছে মাথায়। বাতাসে একরাশ রাগ ছুঁড়ে দিল, ধুত্তোর!
Comments
Post a Comment