আওরঙ্গাবাদ থেকে ১০৬ কিমি দূরে অজন্তা। আমাদের পৌঁছতে লাগলো চার ঘন্টা। কন্ডাক্টেড ট্যুরে এসেছি। বাস থেকে নেমে একটা রেস্তোরাঁয় ডিমটোস্ট ও চা খেয়ে অজন্তায় পৌঁছনোর জন্য বিশেষ ছোটো গাড়িতে বসে পড়লাম। অজন্তার গুহার সামনে এসে গাড়ি থেকে নেমে প্রবেশ করলাম। নির্জন অরণ্যপ্রান্তরে পর্বতে এ-পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গুহামন্দির এই অজন্তা। অপরূপ বৌদ্ধ শিল্পকলার সুপ্রাচীন নিদর্শন। দীর্ঘ হাজার বছর অজ্ঞাত থাকার পরে ১৮১৭ সালে কয়েকজন ইংরেজ শিকারির চোখে পুনরাবিষ্কৃত হয়। এরও ২০ বছর পরে কলারসিক ফার্গুসেনের হাতেই প্রকৃতার্থে আবিষ্কৃত হয় অজন্তা। ১৮৪৪ সালে তিনি অজন্তাকে নিয়ে প্রবন্ধ লেখেন। অজন্তার অনুলিপি তৈরি করেন ক্যাপ্টেন গিল। এর ফলে শিল্পরসিকরা সচেতন হয়ে ওঠেন।
অজন্তার সব গুহা পাহাড় কেটে তৈরি। সর্বমোট ৩০টি গুহা আছে। এর মধ্যে ৯, ১০, ১৯, ২৬ ও ২৯ নম্বর গুহা হচ্ছে চৈত্য অর্থাৎ বৌদ্ধ উপাসনাগৃহ বা মন্দির। বাকি ২৫টি হচ্ছে বিহার অর্থাৎ বৌদ্ধ শ্রমণদের আবাসস্থল। তথাগত বুদ্ধ-কে ঘিরেই অজন্তার অপরূপ সৃষ্টি। গৌতম বুদ্ধের জীবনকথা ও জাতকের নানা কাহিনি রূপ পেয়েছে বর্ণময় চিত্র ও ভাস্কর্যে। গুহার দেওয়াল, সিলিং, সর্বত্রই ছবিতে জমজমাট। পাশাপাশি ভাস্কর্যেও সাজিয়ে তুলেছেন অজন্তার শিল্পীরা। ৩০টির মধ্যে সবক'টি দেখার মতো অবস্থায় নেই। অসমাপ্ত বা নষ্ট হয়ে গেছে অনেকগুলো। যেগুলো ভালো অবস্থায় আছে, সেগুলোই দেখলাম আমরা। মন ভরে গেল। বাইরে বেরিয়ে এসেও ঘোর কাটেনি আমার। এ কী দেখলাম! জন্মজন্মান্তরেও বিস্মৃত হবো না। দু'জন জার্মান যুবক অজন্তা দেখে বাইরে কফিশপে বসে ছিল। আমরাও কফি খেতে গিয়ে, আলাপ হলো ওদের সঙ্গে। দু'জনেই স্কুলশিক্ষক—একজন বায়োলজির, অন্যজন ফিজিক্সের। দু'জনেই ছবি আঁকে। দু'জনেই অজন্তার কিছু স্কেচ করেছে। আমার ভালো লাগলো। সুন্দর স্কেচ। ছুটিতে ভারতবর্ষ ঘুরতে এসেছে। প্রথমেই অজন্তা। এরপর ইলোরা যাবে। আমরাও আগামীকাল ইলোরা যাবো। হোটেলে ফেরার বাস ধরে শেষবিকেলে আওরঙ্গাবাদ ফিরে একটা ধাবায় দুটো রুটি, আলুভাজা আর চা খেয়ে হোটেলে ফিরলাম। বিশ্রাম নিতে শুরু করলাম। রাত ন'টায় রেস্তোরাঁয় একটা করে মশলাদোসা খেয়ে, হোটেলে ফিরে ঘুম। গভীর ঘুম।
পরেরদিন স্নান ও ব্রেকফাস্ট সেরে ১০টার বাসে চড়ে ৩০ কিমি দূরে ইলোরায় গিয়ে পৌঁছলাম। ইলোরায় পৌঁছে মনে হলো, অপূর্ব! এমন স্থানও পৃথিবীতে আমার অপেক্ষায় ছিল তাহলে! নিকটবর্তী ইলোরা গ্রামের নামানুসারে এখানকার অনুচ্চ পাহাড়ের গুহামন্দিরমালার নামকরণ করা হয়েছে ইলোরা। পাহাড়িটির আকৃতি অর্ধচন্দ্রের মতো। তার গায়ে ৩৪টি কৃত্রিম গুহা খোদাই করা হয়েছে। ১৩ থেকে ২৯ নম্বর পর্যন্ত হিন্দু গুহা। অবশিষ্টগুলি বৌদ্ধ গুহা। ষোড়শ গুহাটির ভাস্কর্য এখানকার গুহাগুলির মধ্যে অন্যতম। এটি কৈলাস গুহা নামে পরিচিত। প্রবেশপথে দেখা যাচ্ছে অতিকায় দুটি হাতির মূর্তি। হাঁটু গেড়ে বসে। শিব-পার্বতী মুখোমুখি বসে, আর রাক্ষসরাজ রাবণ কৈলাস পর্বতে চাপা পড়ে আছে। কৈলাস মন্দিরটি চাক্ষুষ করা সত্যিই এক অভিজ্ঞতা বটে!
ইলোরা ভ্রমণ শেষে হোটেলে ফিরে এসে, আহার ও সংক্ষিপ্ত বিশ্রাম শেষে হাঁটতে-হাঁটতে স্থানীয় মানুষজনকে জিজ্ঞাসা করে, পৌঁছে গেলাম বিবি-কা-মকবারাতে। ১৬৬৯ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট আওরঙ্গজেব তাঁর পত্নী বেগম রাবেয়া দুরানি-র সমাধি বিবি-কা-মকবারা আগ্রার তাজমহলের অনুকরণে নির্মাণ করান। কারো-কারো মতে, এটি দ্বিতীয় তাজমহল।
বিবি-কা-মকবারা দেখে সন্ধ্যায় হোটেলে ফিরে এলাম। হোটেলমালিক মাঝবয়সী পাঞ্জাবি শিখ ভদ্রলোক আমাদের আলুপকোড়া ও কফি খাওয়ালেন। পয়সা দিতে দিলেন না কিছুতেই।
বললেন, এটা আমার তরফ থেকে সামান্য শুভেচ্ছা।
রাত ন'টা নাগাদ বাইরে রেস্তোরাঁয় রুটি ও পনির খেলাম। হোটেলে ফিরে ব্যাগ গুছিয়ে রাখলাম। পরদিন সকালে এখান থেকে ট্রেন ধরে বাড়ির উদ্দেশে রওনা দেবো।
সকাল ন'টার মধ্যে ফ্রেশ হয়ে, ব্রেকফাস্ট সেরে, লাগেজ নিয়ে একটা টাঙ্গায় চেপে আওরঙ্গাবাদ স্টেশনে এসে হাওড়াগামী ট্রেনে আমাদের রিজার্ভ কোচে উঠে পড়লাম। কর্নাটক ও সঙ্গে আংশিক মহারাষ্ট্র ভ্রমণ ভালোভাবেই সম্পন্ন হলো।
কর্ণাটক ভ্রমণের পর আমরা দুই বন্ধু স্থির করলাম, এবার কেরল যাবো। সেইমতো পরের বছর আমার স্কুলে পুজোর ছুটি পড়লে, একাদশীর দিন কেরলের উদ্দেশে রওনা দিলাম। হাওড়া থেকে গুয়াহাটি-কোচি এক্সপ্রেসে যথাসময়ে তিরুবনন্তপুরমে পৌঁছে গেলাম। ত্রিনাথদা যথারীতি একটা হোটেল বুক করে ফেললেন। আমরা লাগেজ নিয়ে হোটেলরুমে পৌঁছে ফ্রেশ হয়ে হোটেলের বাইরে মধ্যাহ্নের আহার সেরে নিলাম। ইডলি, সম্বর, পাঁপড়ভাজা ও জিলাপি খেলাম তৃপ্তি করে। এরপর হাঁটাপথে যাত্রা শুরু করলাম শহরের কেন্দ্রে অবস্থিত পদ্মনাভস্বামী মন্দিরের উদ্দেশে। সাইডব্যাগে ধুতি নিয়েছি। ধুতি পরে দেবতাকে দর্শন করতে হয় এখানে। অপূর্ব মন্দিরশৈলী। পদ্মনাভস্বামীকে দর্শন করে প্রাণ জুড়িয়ে গেল।
অনুমান করা হয়, যিশুখ্রিস্টের জন্মের প্রায় তিন হাজার বছর আগে ভারতবিখ্যাত পদ্মনাভস্বামী মন্দিরটি প্রতিষ্ঠিত হয়। মন্দিরটির প্রতিটি পাথরের গায়ে দ্রাবিড় স্থাপত্যশৈলীর নিদর্শন লক্ষিত হয়। এর সুউচ্চ গোপুরম অনেক দূর থেকে নজরে আসে। এটি সাততলা। ক্রমে ধ্বংস হয়ে আসা গোপুরমটি দাক্ষিণাত্যের বিশেষ কায়দা-কৌশলে নির্মিত। মন্দিরের কুলশেখর মণ্ডপটি ৩৭০টি গ্রানাইট পাথরের টুকরো দিয়ে তৈরি। পাথর খোদাই করে দৃষ্টিনন্দন কারুকার্যমণ্ডিত সুবিশাল স্তম্ভের ওপর নির্মিত। মন্দিরের চতুর্দিক বেলেপাথরের সুউচ্চ প্রাচীর দ্বারা বেষ্টিত। মন্দিরের ভেতরে কারুকার্যমণ্ডিত বেদীর ওপর অনন্তশয্যায় শায়িত ভগবান বিষ্ণুর অতিকায় অপূর্বদর্শন বিগ্রহ। জানা যায়, শ্রীচৈতন্যদেব শ্রীপদ্মনাভস্বামী মন্দিরটি দর্শন করেছিলেন এবং এখানে কিছুদিন অবস্থানও করেছিলেন। আমরা মন্দিরচত্ত্বর থেকে বেরিয়ে হোটেল অভিমুখে হাঁটতে শুরু করলাম। একটা ঘোরের মধ্যে ছিলাম যেন! হোটেলরুমে পৌঁছে বিশ্রাম নিয়ে সন্ধ্যা উত্তীর্ণ হলে, শহরের কিছু অংশ পায়ে হেঁটে প্রদক্ষিণ করলাম। রাত ন'টায় একটা রেস্তোরাঁয় ঢুকে রাতের খাবার খেয়ে নিলাম দুই বন্ধু। মশলাদোসা আর কফি। এবার হোটেলে ফিরে গল্প করতে-করতে ঘুম।
পরেরদিন সকালে উঠে দেখি, বৃষ্টি হচ্ছে। তুমুল বৃষ্টি। তার মধ্যেই বাসস্ট্যান্ডের উদ্দেশে বেরিয়ে পড়লাম। বাসে চড়েও বসলাম। এবারের গন্তব্য পোনমুড়ি অর্থাৎ সোনার পাহাড়। বাস চলতে শুরু করলো। বৃষ্টিরও বিরাম নেই। বাস ধীরে-ধীরে পাহাড়ে উঠতে শুরু করলো। রাস্তার দু'পাশে নয়নাভিরাম সবুজ। দু-একটি বৃষ্টিভেজা পাখিও চোখে পড়লো। সুন্দর পাখি। বেলা ১১:৩০ নাগাদ কেরল সরকারের ট্যুরিস্ট লজের রেস্তোরাঁয় পৌঁছে একটা করে প্লেন দোসা খেয়ে, দুপুরের খাওয়ার অর্ডার দিলাম। ভাত, ডাল, সবজি, পাঁপড়ভাজা ও চাটনি। বৃষ্টি একটু কমেছে। ছাতা নিয়ে উপত্যকাটি ঘুরে-ঘুরে দেখলাম দুই বন্ধু। বৃষ্টির মধ্যে ট্যুরিস্ট প্রায় নেই। আমরা দু'জন আর একটা দক্ষিণী নবদম্পতি। আলাপও হলো ওদের সঙ্গে। একসাথেই খেলাম আমরা ডাইনিংয়ে। দশ মিনিট বিশ্রাম নিয়ে আবার ফিরতি বাসে উঠে বসলাম তিরুবনন্তপুরমের উদ্দেশে। তিরুবনন্তপুরপম, যার পূর্বনাম ছিল ত্রিবান্দ্রম। বিকাল চারটের বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছে গেলাম। বৃষ্টি থেমেছে। হেঁটে হেঁটে হোটেলে পৌঁছে টানা ঘন্টাদুয়েক বিশ্রাম। এরপর বেরিয়ে একটা রেস্তোরাঁয় রাতের খাবার খেলাম। ইডলি, সম্বর, জিলাপি। আগামীকাল আমরা কোভালম সি-বিচে যাবো।
সকালে ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে স্নানটান সেরে, ব্রেকফাস্ট করলাম রাস্তার পাশের এক কাফেতে। তারপর বাসে উঠলাম। কন্ডাক্টেড ট্যুরে কোভালম যাচ্ছি আমরা। তিরুবনন্তপুরম থেকে ১৫ কিমি প্রায়। ৩৫ মিনিটে পৌঁছে গেলাম পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ সমুদ্রসৈকত কোভালমে। সমুদ্রের গা-ঘেঁষে নারকেলবীথি ও কলাবাগিচা। নির্জন নিরালা শান্ত সুন্দর পরিবেশে কোভালম সমুদ্রবেলার সৌন্দর্য সত্যিই বর্ণনার অতীত। দেশি-বিদেশি পর্যটক প্রচুর। স্নানের পোশাক পরিহিত যুবক-যুবতী সোনালি বালির উপর শুয়ে রৌদ্রস্নান করছে। সে এক দৃশ্য বটে! সমুদ্রস্নানও চলছে যথারীতি। আমরা স্নান করিনি। আমি শুধু মুগ্ধ হয়ে ওই অপরিসীম সৌন্দর্য উপভোগ করেছি।
সমুদ্রসৈকত ধরে পায়ে-পায়ে ১০-১৫ মিনিট হেঁটে লাইটহাউসের পাদদেশে পৌঁছলাম। সুউচ্চ এই লাইটহাউসটির দিকে তাকালে, সীমাহীন নীল সমুদ্র আর কোভালম জনবসতিকে পটে আঁকা ছবির মতোই দেখায়। দুপুর দুটো নাগাদ কোভালম সি-বিচের কাছেই এক রেস্তোরাঁয় মশলাদোসা ও কফি খেয়ে আমাদের বাসে ফিরে এলাম। বাস এরপর আমাদের ভেলি লেগুনে নিয়ে এল। ভেলি নদীর সঙ্গে আরবসাগরের সঙ্গম ঘটেছে এখানে। ভালো লাগলো লেগুনটি। এরপর আমরা তিরুবনন্তপুরমে ফিরে এলাম। বাসটি আমাদের হোটেলেই নামিয়ে দিল।
কোভালমের সৌন্দর্যে যেন এক ঘোর লেগেছিল আমার! কেরল ভ্রমণ সেরে বাড়ি ফেরার কিছুদিন পরে কোভালমকে নিয়ে আমি একটি কবিতা লিখি। কবিতাটি আমার 'স্তম্ভগাথা ও অন্যান্য কবিতা' গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। কবিতাটি এখানে তুলে দিচ্ছি।
কোভালম পর্ব শেষে পরেরদিন আমরা দুই বন্ধু শ্রীজনার্দনস্বামী মন্দিরটি দর্শন করতে গেলাম। সমুদ্রের গায়ের নারকেলবীথি-বেষ্টিত পাহাড়ের ওপর অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত স্থানে অবস্থিত এই মন্দির। ১২৫২ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত। এর স্থাপত্য ও ভাস্কর্যশৈলী প্রাচীন শিল্পরীতির পরিচয় বহন করছে। মন্দিরের বেলেপাথরের গায়ে খোদাইয়ের কাজ দু'চোখ ভরে দেখার মতো। স্থানীয় মানুষের কাছে মন্দিরে অবস্থানরত আরাধ্য চতুর্ভুজ কৃষ্ণ খুবই জাগ্রত। মূর্তিটি শঙ্খ-চক্র-পদ্মপানি। মার্চ-এপ্রিল মাসে এই বিগ্রহকে ঘিরে আরও উৎসব খুবই ধুমধামের সঙ্গে পালিত হয়। এক ওলন্দাজ সাহেব মন্দিরে একটি অতিকায় কাঁসর-ঘন্টা দান করেছিলেন। ১০দিন ধরে একটানা আরও উৎসবে সামিল হন নিকটবর্তী স্থানের পুণ্যার্থীগণ। শ্রীজনার্দনস্বামী মন্দির দর্শন সেরে আমরা সমুদ্রসৈকতে গিয়ে দেখি, এক খ্রিস্টান প্রৌঢ়া ডাব বিক্রি করছেন। আমরা দুই বন্ধু ডাব খেলাম। জল পান করার পরে ডাবের সুস্বাদু নারকেলও খেলাম। এত সুস্বাদু ডাব ও নারকেল জীবনে খাইনি! ভদ্রমহিলার সঙ্গে কথা হলো কিছু। খুবই ভালো লাগলো তাঁর বিনয়ী কথা।
এরপর আমরা কোল্লাম গেলাম। কোল্লমের পূর্বনাম কুইলন। আগেরদিনই আমরা কেরল ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশনের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত কোল্লম থেকে কোট্টায়াম পর্যন্ত ব্যাকওয়াটার ভ্রমণের টিকিট কেটে রেখেছিলাম। জেটি থেকে নির্দিষ্ট সময়ে যন্ত্রচালিত নৌকায় শুরু হলো আমাদের ব্যাকওয়াটার যাত্রা। দেশি-বিদেশি ট্যুরিস্ট সব। জল কেটে নৌকা এগিয়ে যাচ্ছে। দু'পারে নয়নাভিরাম দৃশ্য। নারকেলবিথী, গ্রামীণ জীবনের চলমান দৃশ্য। সবুজে সবুজ। কত বিচিত্র পাখি! সি-গাল, করমোর্যান্ট, পানকৌড়ি, আমার অচেনা হরেক রঙিন ছোটোবড়ো পাখি। ওরাও চলেছে আমাদের সঙ্গে। আমরা উপরের ডেকে বসেছি। আমাদের পাশেই বসে আছেন এক আরব-ফ্রেঞ্চ দম্পতি ও তাদের শিশুকন্যা। বাচ্চাটি চারপাশের শোভা তন্ময় হয়ে দেখছে আর ড্রয়িং খাতায় স্কেচ করছে। আমি কৌতূহলী হওয়ায় সে আমাকে তার স্কেচ খাতাটি দেখতে দেয়। অপূর্ব তার অঙ্কনশৈলী! আমি তো অভিভূত। ওর বাবা-মা দু'জনেই ভাঙা-ভাঙা ইংরেজিতে কথা বলে আমাদের সঙ্গে। বাচ্চাটি ছোটোবেলা থেকেই আঁকে। একটা আঁকার স্কুলেও সে শেখে বলে জানালো ওর মা। প্যারিসে থাকে ওরা। খুব ভালো লাগলো ওদের সঙ্গে আলাপ হয়ে। আরেক বিদেশি দম্পতিও আমাদের সন্নিকটেই বসে ছিলেন। ব্যাকওয়াটার নৌকাভ্রমণ যে খুবই উপভোগ করছেন তাঁরা, তা ওঁদের চোখমুখ দেখলেই বোঝা যায়। প্রচুর বিদেশি ট্যুরিস্ট আমাদের বোটে। বাঙালি বলতে শুধু আমরা দু'জন। একবার কফিব্রেকে আমরা এক দ্বীপে নেমে কফি ও কেক খেলাম। পয়সা লাগলো না। টিকিটের মধ্যেই লাঞ্চ-সহ এসবের দাম ধরা আছে। বোটে উঠে পড়তেই আবারও শুরু হলো জলপথ ভ্রমণ। নীল জলরাশি, সুনীল আকাশ, চারপাশে সবুজের ছড়াছড়ি। সে এক স্বর্গীয় অনুভূতি! বেলা দেড়টা নাগাদ একটা হ্রদে থামলো আমাদের বোট। বোট থেকে নেমে এক সুদৃশ্য রেস্তোরাঁয় আমরা লাঞ্চ সেরে নিলাম। সুস্বাদু খিচুড়ি, পায়েস, পরিশেষে কফি। তোফা লাঞ্চ! লাঞ্চ শেষে আমি সিগারেট ধরিয়ে দ্বীপটা একটু প্রদক্ষিণ করলাম। মনে-মনে ভাবলাম, ভাগ্যিস এই 'গড'স ওন কান্ট্রি'-তে এসেছিলাম; না-হলে কীভাবেই-বা হতো এই অনাস্বাদিতপূর্ব বিরল অভিজ্ঞতা! ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানিয়ে আবারও বোটে এসে নির্দিষ্ট স্থানে বসলাম দুই বন্ধু। প্রায় একঘন্টার মতো এই লাঞ্চব্রেক। এরপর আবারও ব্যাকওয়াটারের জল কেটে সামনে এগিয়ে চললো আমাদের ময়ূরপঙ্খি নাও। বিকাল পাঁচটায় টি-ব্রেক। আবারও এক দ্বীপে নেমে অপরাহ্নকালীন চা-সেবন। অনেকে চা খেতে নামলেন না দেখলাম। আমি ও ত্রিনাথদা অবশ্যই নেমে চা খেলাম। চমৎকার চা। কী ফ্লেভার চায়ের, আহা! না-খেলে মিস করতাম অবশ্যই। আবারও বোট। আবারও জলযাত্রা। ছ'টা নাগাদ কোট্টায়াম বা কোট্টেম-এ পৌঁছলাম আমরা। তখনও সূর্যাস্ত হয়নি। সাতটায় সূর্যাস্ত হয় এখানে, ক'দিন ধরেই দেখছি। যাইহোক, জেটি থেকে নেমে শহরে প্রবেশ করে হোটেল খুঁজতে থাকি আমরা। কোট্টেম বেশ অবস্থাপন্ন শহর। হোটেলের রেটও খুব বেশি এখানে। চার-পাঁচ হাজারের কমে কোনো রুমই পাওয়া যাচ্ছে না! থাকবো তো মোটে একটা রাত। আগামীকাল সকালেই তো আমরা পেরিয়ারের উদ্দেশে বেরিয়ে পড়বো।
হতাশ হয়ে পথের ধারে একটা কাঠের বেঞ্চে বসে আছি দুই বন্ধু। আমাদের পাশে এসে বসলেন এক সুদর্শন তরুণ। আলাপ হলো ক্রমশ। কুয়েতে থাকেন। ইঞ্জিনিয়ার।
আমরা কৃষ্ণনগর, নদিয়ার লোক জানতে পেরে তরুণটি বললেন, আমার দাদা তো ছিলেন কৃষ্ণনগরে। দাদা রোমান-ক্যাথলিক ক্রিশ্চান পাদ্রি। ২০০০ সালে পশ্চিমবঙ্গের ভয়াবহ বন্যায় উনি কৃষ্ণনগর, জালালখালি, রানাঘাট বেগোপাড়া অঞ্চলে সেবামূলক কাজ করেছেন।
শুনে ভালো লাগলো ওর দাদার কথা।
আমার মনে হলো, তাই তো! কৃষ্ণনগর চার্চে, হোলি ফ্যামিলি গার্লস স্কুলে কেরলের প্রচুর রোমান-ক্যাথলিক পাদ্রি, ব্রাদার ও সিস্টার তো আছেনই।
(ক্রমশ)
Comments
Post a Comment