শর্মিষ্ঠা ঘোষ

একদিন মেয়েকে সকালবেলা কম্পিউটারে দিয়ে ফেরার পথে কুড়িয়ে পেলাম একে রাস্তায়। একঝটকায় ফিরে গেলাম ছোটোবেলায় যখন পাথরের স্লেট ইউজ করতাম। প্রাইমারি স্কুল যাবার পথে কুড়িয়ে পেতাম এদের। আমি আর আমার কাজিন স্লেট মোছার জন্য এই ডুমুর ইউজ করতাম। বহুদিন খুঁজে পাইনি এদের আর। আর এটা নিশ্চয়ই সেই গাছটাও নয়। আমাদের ছোটোবেলার সেই গাছের ছানাপোনা হবে। আমি যে-বয়সে বিলং করি, আমরা একটা বিচিত্র ট্রান্জিশনের মধ্যে দিয়ে গেছি। গতকালকেই দেখছিলাম এলভিস প্রিসলি-র ওপর একটা সিনেমা। যে এলভিস প্রিসলি আমার তিনবছর বয়সে মারা গেছেন। যাঁর সম্পর্কে খুব বেশি কিছু জানতাম না। কাল সিনেমাটা দেখে অদ্ভুত একটা মনখারাপ আমার হন্ট করছে। এই মানুষগুলোকে আমরা দেখেছি আর ভেবেছি, এঁদের অনেক খ্যাতি-প্রতিপত্তি। অনেক সম্পদ। তাঁদের জীবনের যন্ত্রণাটা আমাদের সামনে আসেনি। আবার আমি একটা মফস্বলে থাকতাম। এখনও তাই থাকি; কিন্তু এটা এখন পুরোদস্তুর টাউন হয়ে গেছে। বিফোর গ্লোবালাইজেশন যেখানে বাংলা মিডিয়ামে পড়া ছেলেপেলের কাছে এঁরা ছিলেন গ্রহান্তরের জীব। আমাদের মাধ্যমিক, উচ্চ-মাধ্যমিকের সময় মাইকেল জ্যাকসন, ম্যাডোনারা দুনিয়া কাঁপাচ্ছেন। বব ডিলান, রোলিং স্টোন এগুলো নিয়ে আলোচনা করতো মুষ্টিমেয় লোক। যে-কারণে কলকাতা শহরের একটি নামজাদা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অ্যাডমিশন টেস্টে এইজাতীয় প্রশ্নের উত্তরে আমার খুব বেশি কিছু লেখার ছিল না। এখন গ্লোবালাইজেশন এবং জনসাধারণের কাছে অ্যান্ড্রয়েড ফোনের অ্যাক্সেস একটা রেভলিউশন এনে দিয়েছে। গোটা দুনিয়া উন্মুক্ত হয়ে গেছে আমাদের সকলের সামনে। মাঝেমাঝে কেউ-কেউ যে মরাকান্না জোড়েন স্বদেশি ভাষা মরে যাবে বলে, আমার খুব একটা জাস্টিফায়েড লাগে না। কারণ, সময়ের সাথে-সাথে খাপ খাইয়ে না-নিতে জানলে ডাইনোসরের মতন মৃত্যু অনিবার্য। আর যে-বাংলা ভাষায় কোটি-কোটি অনুরাগী এবং প্র্যাকটিশনার গোটা বিশ্বময় ছড়িয়ে আছে, বাংলা ভাষা মরবে কেন? বরং ছড়িয়ে যাবে গোটা পৃথিবীময়। আমি সেই জেনারেশনে বিলং করি যে রেকর্ড প্লেয়ার, ক্যাসেট প্লেয়ার, সিডি, এমপি থ্রি, এমপি ফোর, ইউটিউব, ব্লুটুথ ধাপে-ধাপে পার করেছি। অভিজ্ঞতার ঝুলি আমাদের সম্পদ হতে পারে। গেল-গেল করে কান্নাকাটির কিছু হয়নি।

Comments