সমস্যাটা অর্বাচীনের নয়। এক বন্ধুর। পুরোনো বন্ধু। কত পুরোনো, এখন আর মনে নেই। তবে বন্ধুত্বটা বেশ জুড়ে গিয়েছিল সেইবেলায়। যতদূর মনে পড়ছে, কলেজে পড়ার সময়েই ওদের বন্ধুত্ব হয়। সেই বন্ধুত্ব এমন গাঢ় হয়ে গিয়েছিল যে, অনেকেই তাদের নিয়ে মস্করা করতো। কেউ বলতো ফেভিকল, কেউ বলতো ডেনড্রাইট। সেইকালে একটা বিজ্ঞাপনী বাক্য বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল, "ভাঙা সংসার ছাড়া আর সব কিছুই জোড়া দেওয়া যায় — ডেনড্রাইট"। টিং টং। কেউ-কেউ এই বিজ্ঞাপনী বাক্যটিও ওদের একসঙ্গে দেখলেই চিৎকার করে বলতো। তখন তো আর সেলফোন বা ইলেকট্রনিক মিডিয়া ছিল না, থাকলে ওদের বন্ধুত্ব নিয়ে কত যে মিম বাজারে ছড়িয়ে পড়তো!
সে-সব কবেকার কথা। কলেজ ছাড়ার পর তাদের দু'টি পথ গেছে বেঁকে। অবশ্যই দু'দিকে। কিছুদিন চিঠি চালাচালির পর বিরতি। তারপর নিয়মতান্ত্রিক ছেদ। ক্রমশ শুধু নামটা স্মৃতিধারী হয়ে থেকে গেছে।
জীবন-পুস্তকে এরপর অনেক অধ্যায় লেখা হয়ে গেছে। পুরোনো বন্ধুত্বের ওপর ধুলো জমে গেছে অনেকটা। আজ রাতে সেলফোনের দৌলতে সেই ধুলো ঝেড়ে ফেলে বন্ধুত্বটা আবার ভুস করে জেগে উঠলো।
পরোটা দিয়ে মাংস সাঁটার পর একটুকরো আমলকী মুখে পুরবে কি পুরবে না ভাবছে, ঠিক তখনই ফোনটা বাচ্চাছেলের মতো কঁকিয়ে উঠলো। অচেনা নম্বর। কে জানে কে! কোনো ঠগ হতে পারে। আজকাল তো নানা কায়দায় ঠকাচ্ছে। হয়তো বলবে— কত কী বলতে পারে। ঠগিরা তো এখন হাজার ফন্দি নিয়ে ঘুরছে। কিছু সন্দেহ কিছু ভয় নিয়ে কানে ঠেকিয়ে 'হ্যালো' বলতেই ওপার থেকে প্রশ্ন এল, আমি কি অর্বাচীনবাবুর সঙ্গে কথা বলছি?
— হ্যাঁ। মানে আপনি?
— আমার নাম সন্তোষ কর্মকার। জিবি কলেজ। সেভেন্টিএইট ব্যাচ। নিন্দুকেরা বলতো ডেনড্রাইট।
জীবন-পুস্তকে এরপর অনেক অধ্যায় লেখা হয়ে গেছে। পুরোনো বন্ধুত্বের ওপর ধুলো জমে গেছে অনেকটা। আজ রাতে সেলফোনের দৌলতে সেই ধুলো ঝেড়ে ফেলে বন্ধুত্বটা আবার ভুস করে জেগে উঠলো।
পরোটা দিয়ে মাংস সাঁটার পর একটুকরো আমলকী মুখে পুরবে কি পুরবে না ভাবছে, ঠিক তখনই ফোনটা বাচ্চাছেলের মতো কঁকিয়ে উঠলো। অচেনা নম্বর। কে জানে কে! কোনো ঠগ হতে পারে। আজকাল তো নানা কায়দায় ঠকাচ্ছে। হয়তো বলবে— কত কী বলতে পারে। ঠগিরা তো এখন হাজার ফন্দি নিয়ে ঘুরছে। কিছু সন্দেহ কিছু ভয় নিয়ে কানে ঠেকিয়ে 'হ্যালো' বলতেই ওপার থেকে প্রশ্ন এল, আমি কি অর্বাচীনবাবুর সঙ্গে কথা বলছি?
— হ্যাঁ। মানে আপনি?
— আমার নাম সন্তোষ কর্মকার। জিবি কলেজ। সেভেন্টিএইট ব্যাচ। নিন্দুকেরা বলতো ডেনড্রাইট।
এবার হাসি দেখা গেল অর্বাচীনের ঠোঁটে। ধুলো ঝেড়ে উঠে এল সন্তোষের মুখ। বেশ জোরেই বলল, অ্যাদ্দিন কোথায় ছিলি?
— উবে গিয়েছিলাম। তুইও তো কোনও খোঁজখবর রাখিস নি।
— ফোন নম্বর কোথায় পেলি?
— আজকাল ফোন নম্বর পাওয়া কি খুব কঠিন? তোর ফেসবুক থেকে।
— উবে গিয়েছিলাম। তুইও তো কোনও খোঁজখবর রাখিস নি।
— ফোন নম্বর কোথায় পেলি?
— আজকাল ফোন নম্বর পাওয়া কি খুব কঠিন? তোর ফেসবুক থেকে।
একটু চুপ করে রইলো অর্বাচীন। তারপর জিজ্ঞাসা করলো, বল, কেমন আছিস?
— আছি, মানে খুব সমস্যায় আছি।
— কিসের সমস্যা?
— বলছি। সমস্যাটা খুব জটিল। আরও কয়েকজন বন্ধুকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম। তারা কেউ বলতে পারলো না। ভাবলাম, তুই ঠিক সমাধান করতে পারবি।
—তা সমস্যাটা কী বলবি তো!
— শোন, আমার আলমারিতে বেশ কয়েক রঙের জামা ছিল। সময়ের সঙ্গে-সঙ্গে যখন যেটা দরকার, গায়ে দিতাম। এখন যে রঙ পরতে চাই, সেটা খুঁজে পাচ্ছি না। কিনেছিলাম কিনা, সেটাই মনে করতে পারছি না।
— আছি, মানে খুব সমস্যায় আছি।
— কিসের সমস্যা?
— বলছি। সমস্যাটা খুব জটিল। আরও কয়েকজন বন্ধুকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম। তারা কেউ বলতে পারলো না। ভাবলাম, তুই ঠিক সমাধান করতে পারবি।
—তা সমস্যাটা কী বলবি তো!
— শোন, আমার আলমারিতে বেশ কয়েক রঙের জামা ছিল। সময়ের সঙ্গে-সঙ্গে যখন যেটা দরকার, গায়ে দিতাম। এখন যে রঙ পরতে চাই, সেটা খুঁজে পাচ্ছি না। কিনেছিলাম কিনা, সেটাই মনে করতে পারছি না।
সন্তোষ কথা শেষ করতে-না-করতেই অর্বাচীন জিজ্ঞাসা করলো, তুই কি রাজনীতি করিস?
ওপার থেকে খ্যা-খ্যা হাসির সঙ্গে উত্তর এল, ঠিক ধরেছিস।
— ভোটে দাঁড়িয়েছিলি?
— দু'বারের কাউন্সিলর।
— তুই অবশ্য কলেজেও ভোটে দাঁড়িয়েছিলি। তখন তো লাল জামা পরতিস।
— ভোটে দাঁড়িয়েছিলি?
— দু'বারের কাউন্সিলর।
— তুই অবশ্য কলেজেও ভোটে দাঁড়িয়েছিলি। তখন তো লাল জামা পরতিস।
— তোর মনে আছে দেখছি! কলেজ থেকে বেরনোর পর ওই রঙটা ভালো লাগলো না। সবুজ জামা পরতে লাগলাম। বেশ কিছুদিন পরলাম। তারপর মনে হলো, এই জামার ভবিষ্যৎ নেই। নীল-সাদা জামা পরতে লাগলাম। জামাটা বেশ লাগসই হয়ে গিয়েছিল, বুঝলি! প্রাসাদ বানালাম, সোনা মজুত করলাম, পাহাড়ে একটা হোম-স্টে, কলকাতার কাছেই একটা হোটেলও করলাম। বেশ চলছিল। হঠাৎই জামাটা ছিঁড়ে গেল। ভাবলাম, আবার একটা কিনে নেবো। তা, ওই রঙের জামা আর পাচ্ছিই না! তাছাড়া রঙটা বাজারে ঠিক চলছেও না। যে-রঙ পাচ্ছি, সেটা ঠিক পছন্দ হচ্ছে না। কী করি বল তো?
— আবার লাল জামা দিয়ে শুরু কর।
— না, হবে না। একবার নিজে থেকে ওজামা খুলে ফেললে আর পরা যায় না।
— তাহলে সবুজ জামা।
— চেষ্টা করেছিলাম। হলো না। দোকানদার সম্পত্তির হিসাব চাইছে, জনগণেশের কাছে থেকে ক্যারেক্টার সার্টিফিকেট আনতে বলছে। সম্পত্তির হিসাব না-হয় দিয়ে দিলাম। কিন্তু সার্টিফিকেট? জনগণেশের কাছে গেলেই তো ডিমের ওমলেট খাইয়ে দেবে।
— হুম। জটিল সমস্যা!
কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো অর্বাচীন। তারপর ধীরে-ধীরে বললো, এক কাজ কর। রাতের অন্ধকারে দোকানে চলে যা। লজ্জার মাথা খেয়ে একটা গেরুয়া জামা কিনে নে।
— গিয়েছিলাম। দোকানদার বললো, এটা সবার জন্য নয়। কেন্দ্র যাদের গেরুয়া যোজনা কার্ড দেবে শুধু তাদের জন্য।
— হুঁ। এক কাজ কর। শুনছি, কলকাতায় 'সাদা- কালো কোম্পানি' নামে একটা দোকান আছে। ওখানে নীল-গেরুয়া রঙের জামা পাওয়া যাচ্ছে। দামটা একটু বেশি। নীল-সাদা রঙের জামা আর সম্পত্তির দলিলের জেরক্স জমা দিলেই একটা নীল-গেরুয়া জামা দিয়ে দেবে।
প্রস্তাব শুনেই ওপার থেকে সন্তোষ চিৎকার করে উঠলো, হিপ হিপ হুররে! ইউরেকা, ইউরেকা!
এপারে অর্বাচীন ফোন বন্ধ করে বললো, মর, মর!
সুন্দর লেখা
ReplyDelete