তরুণটি এবার আমাদের সমস্যা শুনে একটি হোটেলের নাম-ঠিকানা দিলেন। বললেন, "আপনারা যান, আমি ফোন করে দিচ্ছি; রিজ়নেবল রেটে হোটেলরুম পেয়ে যাবেন।" আমরা ওঁর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সেই হোটেলে পৌঁছে দোতলায় খুব ভালো প্রশস্ত একটা রুম পেলাম। ২৫০০ টাকা একরাতের জন্য। টাকাপয়সা মিটিয়ে রুমে ঢুকে, ব্যাগপত্তর রেখে, ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে পথের পাশের এক ধাবায় দোসা ও কফি খেয়ে হোটেলে ফিরে ব্যাকওয়াটার ভ্রমণের কথা আলোচনা করতে-করতে ঘুমিয়ে পড়লাম। একটানা ঘুম। ঝরঝরে মন ও শরীর তখন আমাদের। ফ্রেশ হয়ে লাগেজ নিয়ে হোটেল থেকে বেরিয়ে পথের ধারের এক চায়ের দোকানে চা-বিস্কুট খেয়ে, বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছে পেরিয়ারগামী বাসে উঠে বসলাম। বাস সুন্দর চলতে থাকলো। পথের দু'পাশের দৃশ্য অতি মনোরম। মাঝে একবার ব্রেকফাস্ট-ব্রেক। ডিমটোস্ট ও চা খেয়ে, বাসে উঠে এবার একটানা চলে এলাম পেরিয়ার। আমাদের স্বপ্নের গন্তব্য। বাসস্ট্যান্ডেই ছোটো একটা হোটেলে রুম পেয়ে গেলাম। এক হাজার টাকা ভাড়া, ২৪ ঘন্টার জন্য। আমরা তো দু'দিন থাকবো। টাকাপয়সা অগ্রিম মিটিয়ে দিয়ে স্নানটান সেরে বাইরে বেরিয়ে আগামীকাল ভোরে পেরিয়ার লেক ভ্রমণের জন্য টিকিট কেটে নিলাম আমরা। এরপর একটা হোটেলে ইডলি, সম্বর ও জিলাপি খেলাম এবং ওখানে একটা কাঠের বেঞ্চে মিনিট পনেরো বিশ্রাম করে, পায়ে হেঁটে পেরিয়ার অরণ্যের উদ্দেশে রওনা দিলাম। আগেভাগে জায়গাটা তো দেখে আসি। কাল তো বেশ ভোরে আসতে হবে। গভীর অরণ্যের ভিতর দিয়ে পায়ে হেঁটে আমরা লেকের প্রবেশদ্বার পর্যন্ত চলে এলাম। অসাধারণ এই স্থান! ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ স্পট এই অভয়ারণ্য। যাইহোক, ফিরতে শুরু করলাম এবার। আগামীকাল খুব ভোরে তো আবার আসতেই হবে। হোটেলে ঢোকার আগে, পথের পাশে একটা ছোটো দোকানে ডিমের অমলেট, শুকনো আলুর দম-সহ গরম-গরম হাতে তৈরি রুটি খেলাম দুই বন্ধু। শেষে কফি। এবার হোটেলে ফিরে ঘুম।
খুব ভোরে উঠেছি আমরা। ফ্রেশ হয়ে, হোটেল থেকে বেরিয়ে হাঁটতে শুরু করলাম পেরিয়ার লেক ও অভয়ারণ্যের দিকে। মাঝপথে রাস্তায় চা-বিস্কুট খেয়ে নিলাম। পথের দু'পাশেই অরণ্যের সুবৃহৎ বনস্পতি সব। গাছের শাখায় পাখপাখালি সব জেগে উঠতে শুরু করেছে। মূল ফটকে পৌঁছে কাউন্টার থেকে জেনে নিলাম, সকাল সাড়ে-ছ'টায় বোটে উঠতে হবে। বন্দুকধারী সিকিউরিটি গার্ড আমাদের এসকর্ট করে নিয়ে যাবে। আমরা বোটে উঠে পড়লাম। নির্দিষ্ট সংখ্যক ট্যুরিস্ট বোটে উঠতেই মোটরচালিত সেই বোট লেকের জল কেটে ধীরে-ধীরে এগিয়ে চললো পেরিয়ার ওয়াইল্ড লাইফ স্যাংচুয়ারির দিকে। চিরসবুজ অরণ্যে ঘেরা সুবিশাল উপত্যকা জুড়ে পেরিয়ার লেক। ১৮৯৫ খ্রিস্টাব্দে পেরিয়ার নদীতে বাঁধ দিয়ে চাষের জমিতে জলসেচ ও জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজ শুরু করার উদ্দেশ্যে ত্রিবাঙ্কুরের মহারাজা ২৫ কিমি দীর্ঘ লেকটি খনন করান। তিনি এর নাম দেন 'নেলিয়ামপাট স্যাংচুয়ারি'। ১৯৯৫ সালে এর নতুন নাম দেওয়া হয় 'পেরিয়ার ওয়াইল্ড লাইফ স্যাংচুয়ারি'। ১৯৭৮ সালে ভারত সরকার একে অভয়ারণ্যের তালিকাভুক্ত করে। বোট যত এগোচ্ছে, আমার মনে হচ্ছে, এক অত্যাশ্চর্য অবিশ্বাস্য দৃষ্টিনন্দন স্থানে চলে এসেছি। এমন আর একটি অভয়ারণ্য, প্রকৃতপক্ষে, কেবলমাত্র ভারতেই নয়, পৃথিবীর আর কোনো দেশেই দেখা যাবে না।
একটা জায়গায় এসে বোট থেমে গেল। আমরা সবিস্ময়ে সানন্দে লক্ষ করলাম, গভীর অরণ্য থেকে একে-একে হাতি, অতিকায় বাইসন, নীলগিরির বুনোশুয়োর, কাঠবিড়ালি, সম্বর, গাউর, হরিণ প্রভৃতি লেকের পাড়ে এসে জলপান করে হেলেদুলে আবারও গভীর অরণ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল। এ-দৃশ্য দেখে জীবন ধন্য হয়ে গেল। প্রায় আধঘন্টা সময় ধরে আমরা এই অভূতপূর্ব দৃশ্যের সাক্ষী থাকলাম। এরপর বোট আবার জেটিতে ফিরে এল। আমরা বোট থেকে নামার পরেই আরেক দল ট্যুরিস্ট বোটে উঠতে লাগলো। আমরা ধীরেসুস্থে নেমে এসে জেটির কাছেই এক সুদৃশ্য রেস্তোরাঁয় ইডলি, সম্বর, সন্দেশ খেলাম খুব তৃপ্তি করে। এবার আবার ফিরতে শুরু করলাম অরণ্যপথ ধরে শহরের দিকে, আমাদের হোটেলের দিকে। ফেরার পথে বৃক্ষশাখায় চোখে পড়লো লম্বা লেজবিশিষ্ট কাঠবিড়ালি ও সাদা মুখ কালো শরীর-বিশিষ্ট বাঁদর, বেশ বড়ো সাইজের। অরণ্যের চৌহদ্দি পেরিয়ে এক মালয়ালম তরুণের দোকানে বসে চা খেলাম। সে আমাদের কাঁচা লবঙ্গ এনে হাতে দিল, তার দোকান-সন্নিহিত সুপুরি গাছে বেয়ে ওঠা লতানে লবঙ্গলতা থেকে। এলাচ গাছও সে দেখালো আমাদের। কেরল তো ভারতবর্ষেই শুধু নয়, সারা পৃথিবীর মধ্যে মশলার জন্য প্রসিদ্ধ। আরবসাগর দিয়ে যুগে-যুগে ইউরোপের বণিকেরা, অভিযানকারীরা শুধু এই মশলার জন্যই ভারতে এসেছেন। এ তো ইতিহাস। ভাস্কো-দা-গামা থেকে শুরু করে শয়ে-শয়ে পর্যটক মশলার টানে এসেছিলেন আমাদের এই সুবিশাল ভূখণ্ডে।
আমরা হোটেলে গিয়ে স্নানটান সেরে লাগেজ নিয়ে হোটেলের প্রাপ্য মিটিয়ে বাইরে বেরিয়ে এক রেস্তোরাঁয় ইডলি-সম্বর খেয়ে, মুন্নারগামী বাসে চড়ে বসলাম। উপরে উঠছি। মুন্নারের রূপ ধীরে-ধীরে খুলে যাচ্ছে দু'চোখের সম্মুখে। চা-বাগান সবুজ গালিচার মতো তরঙ্গায়িত হয়ে জুড়ে আছে উপত্যকা জুড়ে। মুন্নারের নয়নাভিরাম সৌন্দর্য দর্শন করার জন্য সারাবছরই এখানে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের ভিড় লেগে থাকে। বাস আমাদের টি-ব্রেক দিল ২০ মিনিটের জন্য। বাস থেকে নেমে হাত-পা একটু ছাড়িয়ে নিয়ে একটা স্টলে চা-বিস্কুট খেলাম। আবারও বাসে উঠে একটানা চলে এলাম মুন্নারের শেষপ্রান্তে। সেখানে একটা ছোটো হোমস্টে-তে একটা ডাবলবেডের রুম পাওয়া গেল। মাত্র ৮০০ টাকা। খাবার খরচ আলাদা। আমরা ব্যাগপত্তর ঘরে রেখে ফ্রেশ হয়ে হোমস্টে-র মালিককে বললাম চা দিতে। মালয়ালম মালিক। মাঝবয়সী। আমাদের ভেজ-পকোড়া ও সুগন্ধি চা এনে দিলেন। তোফা টিফিন হলো। চা-টা খেয়ে বাইরে বেরিয়ে বাসস্ট্যান্ডে এসে কোচিনগামী বাসের টিকিট কেটে নিলাম। আগামীকাল সকাল সাতটায় আমরা কোচিন যাবো। এবার একটু ঘোরাঘুরি করলাম এদিক-সেদিক। কাছেই একটা মন্দির। মঙ্গলাদেবীর। আমরা দেবীদর্শন করলাম। এরপর হোমস্টে-তে ফিরে এসে বিশ্রাম শুরু করার আগে বললাম রাত ন'টায় রাতের খাবার দিতে। রুটি আর ডিমের ঝোল। রাত ন'টায় খাবার খেয়ে তোফা ঘুম। সারাদিন ধকল তো কম যায়নি আমাদের! সকালে উঠে ফ্রেশ হয়ে হোমস্টে-তে বাটারটোস্ট আর লিকার চা খেয়ে, বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে কোচিনগামী বাসে আমাদের নির্দিষ্ট সিটে বসে পড়লাম। কাঁটায়-কাঁটায় সকাল সাতটায় বাস ছাড়লো। মাঝখানে দু'বার ব্রেক। প্রথমে ব্রেকফাস্ট-ব্রেক ও বেলা দেড়টায় লাঞ্চব্রেক। এসব পর্ব মিটে যাবার পরে বাস ছাড়লো। চমৎকার রাস্তা। দু'পাশে নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক দৃশ্য। বাস থেকে নামার আগে হালকা ঘুম হলো একটু। বিকেল চারটেয় আমাদের বাস রেলওয়ে স্টেশন-সংলগ্ন বাসস্ট্যান্ডে এসে থামলো। বাস থেকে আমাদের হালকা লাগেজ নিয়ে নেমে এসে, নিকটেই একটা হোটেলে রুম বুক করে নিল ত্রিনাথদা। প্রতিদিন ৮০০ টাকা। দু'দিন থাকবো আমরা এখানে। হোটেলে ফ্রেশ হয়ে, বাইরে এসে শহরের দিকে হাঁটতে শুরু করলাম দুই মুসাফির। পথে এক ধাবায় চা-কেক খেলাম। কোচিন বা কোচি বড়ো চমৎকার শহর! আলো ঝলমল রাস্তা। ঘন্টা দুয়েক এভাবে হেঁটে, কোথাও একটু বসে, আমরা হোটেলে ফিরে এসে ফ্রেশ হয়ে লিকার চা খেলাম। হোটেলেই রান্নার ব্যবস্থা আছে। রাতে আমরা রুটি, আলুর দম ও সন্দেশ দিয়ে সাপার সেরে নিলাম। পরদিন সকালে উঠে একেবারে স্নানটান সেরে নিয়ে, আমাদের রুমে বসেই চা-টোস্ট খেয়ে বেরিয়ে পড়লাম। পায়ে হেঁটে একসময় পৌঁছে গেলাম কোচি বন্দর। কোচিনের বর্তমান নাম কোচি। এর বড়ো পরিচয় এর বন্দর। আরবসাগরের গায়ে প্রাকৃতিক পরিবেশে বন্দরটি গড়ে উঠেছে। প্রাচীনকাল থেকেই কোচিন বন্দরের নাম রয়েছে। বহু প্রাচীন পুঁথিতেও বন্দর হিসাবে এর খ্যাতির উল্লেখ রয়েছে। পর্যটকদের কাছে কোচিন 'কুইন অফ সি' বলে গণ্য হয়। কেবলমাত্র বন্দর হিসাবেই নয়, এখানকার সমুদ্র উপকূল জুড়ে দেখা যায় প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় হিন্দু, মুসলিম, ব্রিটিশ, ফরাসি ও পর্তুগিজ স্থাপত্য ও ভাস্কর্যশৈলীর নিদর্শন। রাজধানী তিরুবনন্তপুরম থেকে ২২২ কিমি দূরে দশটি দ্বীপের সমন্বয়ে গঠিত পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম বন্দর ও পোতাশ্রয়। মালাবার উপকূল জুড়ে চিরসবুজ নারকেলবীথি বেষ্টিত, সুদীর্ঘ খাল ও খাঁড়ি, অগণিত লবণ হ্রদ মিলে কোচিনকে এক যথার্থ রূপের আকর করে তুলেছে। এর পূর্বদিকে দূরবর্তী পশ্চিমঘাট পর্বতমালা ছবির মতো রূপ নিয়ে অবস্থান করছে।
সম্ভবত ১৫০০ খ্রিস্টাব্দের কাছাকাছি কোনো সময়ে পর্তুগিজ বণিক ভাস্কো-দা-গামা পালতোলা জাহাজ নিয়ে এই বন্দরে উপস্থিত হন। তৎকালীন শাসকের অনুমতি নিয়ে তাঁরা এখানে বাণিজ্য করতে শুরু করেন। ক্রমান্বয়ে প্রতিবেশী রাজ্যগুলির সঙ্গেও বাণিজ্যসম্পর্ক গড়ে তোলেন। প্রায় ১৫০ বছর সফলভাবে বাণিজ্য করার পরে, ১৬৬৩ খ্রিস্টাব্দে আবারও নতুন করে কয়েকটি পালতোলা বিদেশি জাহাজ ভিড়লো এই বন্দরে। এল ওলন্দাজ বা ডাচ বণিকেরা। এরা ছিল সংখ্যায় বেশি, দুর্ধর্ষ প্রকৃতির ও যুদ্ধাস্ত্রে পর্তুগিজদের তুলনায় অধিকতর শক্তিশালী। ফলে, তাদের পক্ষে পর্তুগিজ বণিকদের যুদ্ধে পরাজিত করে এই তল্লাট থেকে অনায়াসেই বিতাড়িত করা সম্ভব হলো। এরপর ওলন্দাজরা এখানে একচেটিয়া ব্যবসাবাণিজ্যের মাধ্যমে প্রচুর অর্থোপার্জনের দ্বারা এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করলো। কিন্তু একথা মানতেই হয় যে, পর্তুগিজ বণিক ভাস্কো-দা-গামা আসার পর থেকেই কোচিন বন্দরের দ্রুত উন্নতি ঘটতে থাকে। ১৭৯১ খ্রিস্টাব্দে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি-র অনুগত করদরাজ্যে পরিণত হয় সমৃদ্ধ বন্দরনগরী কোচিন। বর্তমান ভারতের দ্বিতীয় প্রধান বন্দর কোচিন থেকে বড়ো-বড়ো জাহাজ বোঝাই করে রাবার, গোলমরিচ, নারকেল ও নারকেলের ছোবড়া বিদেশে রপ্তানি করা হয়।
এ গেল কোচি বা কোচিনের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস। আমরা সকাল দশটায় বোটে করে কৃত্রিম দ্বীপ উইলিংডনের ওপারে গিয়ে পৌঁছলাম। এটা ছিল কন্ডাক্টেড ট্যুর। এই সাইটসিয়িং ট্যুরে আমরা একে-একে দেখলাম ইহুদিদের সিনাগগ, ডাচ প্রাসাদ, বোলাঘাট্টি, গুন্ডুদ্বীপ, চাইনিজ় ফিশিং নেট, গির্জা প্রভৃতি। ডাচ প্রাসাদটি মাত্তানচেরি নামক স্থানে অবস্থিত। ১৫৫৫ খ্রিস্টাব্দে পর্তুগিজরা প্রভূত অর্থব্যয়ে সুদৃশ্য এই প্রাসাদটি তৈরি করে। এর প্রায় ১০০ বছর পরে ডাচ বণিকরা প্রাসাদটির পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করেন। প্রাসাদের দরবার-কক্ষটি সুবিশাল। কক্ষটিতে বর্তমানে কোচিন রাজাদের ছোটোবড়ো নানা প্রতিকৃতি, তাঁদের ব্যবহৃত তরবারি, পোশাক-পরিচ্ছদ সংরক্ষণ করা আছে। জিউইশ সিনাগগ অর্থাৎ ইহুদিদের উপাসনালয়টি সুপ্রাচীন। নির্মাণকাল ১৫৬৮ খ্রিস্টাব্দ। এখানে সেই আমলের প্রাচীন শিল্পকর্ম নিরীক্ষণ করে বিমোহিত হলাম। ফোর্ট কোচিনে ভাস্কো-দা-গামার সমাধিসৌধটিও দেখলাম। বর্তমানে সেটি প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত। মেইনল্যান্ডে এর্নাকুলাম অবস্থিত। ফোর্ট কোচিনের বিপরীতদিকে অবস্থিত এর্নাকুলাম। পটে আঁকা ছবির মতো সাজানো-গোছানো শহর। এখানেই একটা প্রধান সড়ক রয়েছে বিখ্যাত ক্রীড়াবিদ পি টি ঊষা-র নামে। দেখে খুব প্রীত হলাম। সবকিছু দেখে ফিরে এলাম আমাদের হোটেলে। ফ্রেশ হয়ে চা ও টোস্ট খেলাম। তারপর ঘন্টাখানেক বিশ্রাম। তারপর রাতের খাবার সেরে নিলাম, হাতেগড়া রুটি ও পনিরের ডালনা দিয়ে। আগামীকাল সকালে আমরা কালাডি যাবো।
পরেরদিন সকালে ব্রেকফাস্ট সেরে, বাসে করে আমরা দুই বন্ধু কালাডির উদ্দেশে যাত্রা শুরু করলাম। কোচি থেকে ৪৫ কিমি দূরে কালাডি অবস্থিত। যথাসময়ে গন্তব্যে পৌঁছলাম। কালাডি জগদগুরু আদি শঙ্করাচার্যের জন্মস্থান। তিনি ছিলেন অষ্টম শতকের অদ্বৈতবাদী জগদগুরু। অদ্বৈতবাদ দর্শনের প্রচার করে তিনি মানবজাতিকে ঈশ্বরমুখী করার কাজে নিজেকে ব্রতী করেছিলেন। মাত্র ১৬ বছর বয়সেই গীতার ভাষ্য রচনা করেন এবং যাবতীয় বেদপাঠ সমাপ্ত করেন। ভারতে ব্রাহ্মণ্য ধর্মের পুনঃপ্রতিষ্ঠার কাজে তাঁর অবদান প্রভূত। শৈব ধর্মের প্রবর্তনকারী হিসাবেও তাঁর খ্যাতি রয়েছে। তিনি চারটি মঠ প্রতিষ্ঠা করেন— শারদা মঠ (গুজরাত), শৃঙ্গেরী মঠ (কর্ণাটক), যোশীমঠ (উত্তরাখণ্ড) এবং গোবর্ধন মঠ (ওড়িশা— পুরীধাম)। মঠগুলি আজ অদ্বৈতবাদী আশ্রমরূপে স্বীকৃত ও পরিচালিত। ৮৩০ খ্রিস্টাব্দে মাত্র ৩২ বছর বয়সে শঙ্করাচার্য পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়ে নিজধামে গমন করেন।
আমরা রামকৃষ্ণ অদ্বৈত আশ্রমের অদূরে অবস্থিত শঙ্করকীর্তি স্মারক ভবনটিতে যাই। ভবনটি আটতলা। এখানকার পাদুকামণ্ডপমটির কারুকার্য অপরূপ। এখানে আদি শঙ্করাচার্যের পাদুকা রক্ষিত আছে। দেওয়ালের গায়ে চিত্রের মাধ্যমে শঙ্করাচার্যের জীবনকাহিনি চমৎকার ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। আমরা এসব দেখে ধন্য ও অভিভূত হই। শুনলাম, এপ্রিল-মে মাসে মহা-ধুমধাম সহকারে এখানে শঙ্করজয়ন্তী উৎসব পালন করা হয়। সবকিছু দেখে ধীরে-ধীরে বাসস্ট্যান্ডে ফিরে আসি আমরা। ওখানে একটা ছোটো খাবার দোকানে ভাত খাই। সম্পূর্ণ নিরামিষ আহার। তৃপ্তি সহকারে আহার্য গ্রহণ করি আমরা। তারপর ফিরতি বাসে কোচিতে ফিরে আসি আমাদের ডেরায়। আগামীকাল কোচি রেলওয়ে স্টেশন থেকে ইন্টারসিটি ট্রেনে করে আমরা যাবো কান্নানোর। তারপর ত্রিচুর বা ত্রিশূর।
ইন্টারসিটি এক্সপ্রেসটি সকাল ৭:৫০-এ ছাড়লো কোচি রেলস্টেশন থেকে। আমরা যথারীতি ট্রেনে ওঠার আগেই ব্রেকফাস্ট সেরে নিয়েছি। কোচে উঠে আমাদের নির্দিষ্ট সিটে বসেছি। ঝকঝকে ট্রেন কম্পার্টমেন্ট। জানালার ধারে সিট পেয়েছি। দ্রুতগতির ট্রেন, অল্পকিছু স্টপেজ। জানালা দিয়ে বাইরের অনবদ্য সবুজ দৃশ্য দেখতে-দেখতে চলেছি। আহা, চোখের কী আরাম! আমার পাশের সিটেই এক ভদ্রলোক বসে আছেন। ক্রমশ আলাপ হলো। ভদ্রলোক ত্রিশূর জজকোর্টের মহামান্য বিচারক। কোচি থেকেই যাতায়াত করেন। সুপণ্ডিত ও সুরসিক। কেরল সম্বন্ধে নানা না-জানা কথা জানালেন তিনি। তিনি সরকারকে বলেছেন, "আমার কোনো সিকিউরিটি গার্ডের প্রয়োজন নেই।" স্বাধীনভাবে আর পাঁচটা সাধারণ মানুষের মতোই পথেঘাটে চলাফেরা করেন মাননীয় বিচারক মহোদয়। জীবনে একবারই মাত্র এক আসামীকে ফাঁসির অর্ডার দিতে হয়েছে তাঁকে। এজন্য তাঁর আফশোসের সীমা নেই। কিন্তু ফাঁসির আদেশ না-দিয়ে তাঁর কোনো উপায় ছিল না। ভদ্রলোকের কথা যত শুনছি আমি, ততই ওঁর ব্যক্তিত্বের প্রতি আমার সশ্রদ্ধ সমীহা বেড়ে যাচ্ছে। উনি আমাকে ওঁর নাম-ঠিকানাও দিয়েছিলেন। বেশ ক'বার চিঠিপত্রের আদানপ্রদানও হয়েছে আমাদের মধ্যে। যাইহোক, ভদ্রলোক ত্রিচুরে নেমে গেলেন। আমাদের দু'জনের সঙ্গে করমর্দন করলেন নামার আগে।
ভদ্রলোকের কথা ভাবতে-ভাবতে সামনে এগিয়ে চলেছি। গন্তব্য তো সেই কান্নানোর। আরবসাগরের ধারে। যথাসময়ে কান্নানোর স্টেশনে পৌঁছলাম। স্টেশন থেকে কিছুটা হাঁটতেই, আমরা একটা মাঝারিধরনের হোটেলে ডাবলবেডেড একটা রুম বুক করলাম। ৫০০ টাকা ভাড়া প্রতিদিন। বেশ সস্তাই বলতে হয়। ঘরে ব্যাগপত্তর রেখে চা খেয়ে একটু জিরিয়ে নিয়ে, স্নান সেরে নিলাম। চা, জলখাবার, লাঞ্চ, ডিনার এই হোটেলেই পাওয়া যাবে। বেশ ভালো ব্যবস্থাই বলতে হবে আমাদের মতো মুসাফিরের পক্ষে। এবার লাঞ্চ খেয়ে ঘন্টাখানেক ঘুমিয়ে নিয়ে, দুই বন্ধু পায়ে-পায়ে কান্নানোর সি-বিচের উদ্দেশে রওনা দিলাম। যে-সব রাস্তা দিয়ে চলেছি, তার প্রত্যেকটি বাড়ির চতুর্সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে চারপাশের নারকেল গাছ দ্বারা। প্রত্যেকটি বাড়ির সামনে ফুল ও ফলের গাছ, আর চারপাশে নারকেলবীথি— স্বপ্নের পরিবেশ! হাঁটতে-হাঁটতেই সমুদ্রের স্বর শুনতে পাচ্ছি। একটা সময়ে সমুদ্র একেবারে চোখের সামনেই উন্মোচিত হয়ে উঠলো। সি-বিচে গিয়ে বসলাম, উঠে দাঁড়িয়ে বিচ-ফুটবল দেখলাম। তরুণ-তরুণী, বালক-বালিকা, প্রৌঢ়-প্রৌঢ়া, এমনকী দু-চারজন বৃদ্ধ-বৃদ্ধাকেও সি-বিচে ঘুরে বেড়াতে দেখলাম। আর, সবার উপরে আরবসাগরের অপরাহ্নকালীন তরঙ্গমেখলা। সমুদ্র তো নয়, রানি, মহারানি!
অনেকক্ষণই বিচে কাটিয়ে নিকটবর্তী পরিত্যক্ত ভগ্নপ্রায় লাইটহাউসটি দেখতে গেলাম দুই বন্ধু। খুব ভালো লাগলো। লাইটহাউসটির পাশেই সমুদ্রের খাঁড়িতে মেছুয়া-মেছুনিরা মাঝ ধরছে জালে। জালে রুপোলি সামুদ্রিক মাছ সব খলবল করছে। কী অপরূপ দৃশ্য! ক্রমে-ক্রমে সন্ধ্যা নামতে লাগলো। সমুদ্রে যেন আগুন লেগেছে মনে হলো সূর্যাস্তের আভায়! আমরা সি-বিচে ফিরে এসে চা-বিস্কুট খেলাম। এরপর পায়ে-পায়ে আবার ফিরতে শুরু করলাম আমাদের হোটেলের উদ্দেশে। সন্ধে সাড়ে-সাতটায় হোটেলে এসে বিশ্রাম কিছুক্ষণ। তারপর রাত সাড়ে-ন'টায় ডাইনিংয়ে রাতের খাবার খেয়ে নিলাম। হাতেগড়া রুটি, শুকনো আলুর দম আর সন্দেশ। তোফা সাপার শেষে একটানা নিরুপদ্রব ঘুম। সকালে উঠে স্নানটান সেরে চা-টোস্ট খেয়ে বাসস্ট্যান্ড। সেখান থেকে বাসে করে ত্রিচুর বা ত্রিশূর। ত্রিচুরের গল্প শুরুর আগে বলি যে, কান্নানোর সি-বিচ দেখে অভিভূত হয়ে একটা কবিতাও লিখেছিলাম বাদকুল্লায়, বাড়ি ফিরে। কবিতাটি আমার কাব্যগ্রন্থ 'স্তম্ভগাথা ও অন্যান্য কবিতা'-য় আছে। কবিতাটি আমার পাঠকদের জন্য তুলে দিচ্ছি এখানে।
(ক্রমশ)
Comments
Post a Comment