খবরটা শোনা ইস্তক মনটা ভার হয়ে আছে অর্বাচীনের। কলকাতা নগরী নাকি একদিন মাটির নিচে ঢুকে যাবে। তার ঘণ্টা বেজে গেছে। নেপালের ভয়াবহ বন্যা আর ভূমিকম্প নিয়ে বলার সময় আবহ ও পরিবেশবিজ্ঞানী এই সাবধানবাণী শোনালেন। এটা শোনার পর থেকেই অর্বাচীনের মন থেকে আনন্দ মুছে গিয়ে খ্যাপা কুকুরের মতো হয়ে গিয়েছে। গিন্নি কিছু বললেই হয় সে খ্যাক করে, নয় গরগর করে।
গিন্নিও কম যায় না। সেও পাল্টা চোখগরম করে হুঙ্কার দিল, তোমার কী হয়েছে বলো তো? সারাদিন পাগলা কুকুর হয়ে রয়েছো?
এবার একটু নরম হয়ে গেল অর্বাচীন, আর ভালো লাগছে না গিন্নি। সেদিন খবরে কী বললো, শুনলে না?
— আমার অতো ছাতা মনে থাকে না। সংসারের ঘানি টানতেই দিন কাবার, তা তোমার ওসব খবর!
অর্বাচীন চিন্তিতস্বরে বললো, আর ক'বছরের মধ্যে গোটা কলকাতা মাটির নিচে চলে যাবে।
— যাক। তদ্দিন আমরা থাকবো না।
— তা হয়তো থাকবো না। কিন্তু ভাবছি, একশো কি তিনশো বছর পর খোঁড়াখুঁড়ি করে কেউ কলকাতাকে আবিষ্কার করলো। তারপর ইতিহাস বইয়ে লেখা হলো, এই স্থলে কলিকাতা নামক এক মিশ্র নগরী গড়িয়া উঠিয়াছিল। অথচ দ্যাখো আমরা সেই কলকাতার গা-ঘেঁষে বসে রয়েছি।
— রাখো তোমার বক্তিমা। বাজারে যেতে হবে। মুড়ি আনতে হবে। আর শোনো, মুসুর ডালের বড়ি পেলে নিয়ে এসো।
— যাচ্ছি যাচ্ছি।
গিন্নির কথা মানেই প্রশাসনিক নির্দেশ। অমান্য করলেই ছররা গুলি ছুটে আসবে। অতএব ঝোলা হাতে যন্তরমন্তরের অর্থাৎ বাজারের পথে। কিন্তু মাথার মধ্যে আবহবিদের কথাগুলো দাঁতের ব্যথার মতো লেপ্টে আছে। উল্টোদিক থেকে বাজারের থলি হাতে এগিয়ে আসছিলেন নিকুঞ্জবাবু। ওদের পাড়াতেই শেষপ্রান্তে থাকেন। ইস্কুলে না কলেজে, কোথায় যেন মাস্টারি করতেন। অর্বাচীনের সঙ্গে যে মাখো-মাখো সম্পর্ক আছে এমন নয়; ওই পাড়ায় চলতে-ফিরতে যেমন হয়, আর কী! সামনে পড়ে গেলেই দাঁত বের করে, হেঁ-হেঁ ভালো আছেন?
তা এবারও সামনে আসতেই, হেঁ-হেঁ কেমন আছেন?
— ফাটছে।
— মানে! অর্বাচীন বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করলো, কী ফাটছে?
— যা ফাটার। বুঝলেন মশাই, তৈলাক্ত বাঁশের অঙ্কও হার মেনেছে।
— মানে?
— বুঝলেন না? আরে মশাই, তৈলাক্ত বাঁশে বাঁদরটা উঠতো, আবার নামতো। আর বাজারদর তো উঠছেই শুধু উঠছেই। নামার কোনো লক্ষণ নেই।
অর্বাচীন ভাবলো, ঠিকই তো, এদিকটাতে তো সে নজর দেয়নি! ঠিক-ঠিক। কিন্তু কলকাতা মাটির নিচে চলে গেলে বাজার নিয়ে মাথা ঘামানো অনর্থক। সে নিকুঞ্জবাবুর মুখের দিকে তাকিয়ে বললো, কাল রাতে টিভিতে শুনলুম আর কয়েকবছরের মধ্যে কলকাতা নাকি মাটির নিচে চলে যাবে?
— যাবে তো! শুধু একটা বড়ো ভূমিকম্পের অপেক্ষা। সমুদ্র এগিয়ে আসছে। এই আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, এইসব অঞ্চল সুন্দরবন হয়ে যাবে।
— নাঃ, তা হবে না।
— কলকাতার কাছেই গঙ্গার দু'পাড়ে ম্যানগ্রোভ জন্মাতে শুরু করেছে। কারণটা কী, জানেন? সমুদ্রের লোনাজল নদীতে ঢুকে পড়ছে, মিঠেজল সমুদ্রে যেতে পারছে না। আটকে থাকছে। এই লোনা আর মিঠে জলের সংমিশ্রণে ম্যানগ্রোভ জন্মায়। ফলে সমুদ্রের তীরভূমিতে আর নতুন করে ম্যানগ্রোভ বাড়তে পারছে না। বুঝলেন?
— না।
— না।
— বুঝবেন। যাই, আবার বেরোতে হবে।
— আচ্ছা, কলকাতা সুন্দরবন হতে কতদিন লাগবে?
— কলকাতা শহর না-হলেও, সুন্দরবন কাছাকাছি চলে আসবে। তা ধরুন, বছর তিরিশ-চল্লিশ। চলি।
নিকুঞ্জবাবু প্রস্থান করতেই অর্বাচীন ভাবলো, তিরিশ বছরটা বড্ডো দেরি হয়ে গেল। বছরখানেকের মধ্যে হলে, আর গাঁটের কড়ি খরচ করতে হতো না! গিন্নি ক'দিন ধরে বায়না ধরেছে, সুন্দরবন বেড়াতে যাবে। ক'দিনের জন্যও যদি সুন্দরবনটা এই এলাকায় চলে আসতো, দোতলার বারান্দায় বসে গিন্নি বাঘ দেখতে পারতো। নাঃ, তা আর হলো না! কড়ি খসবেই। ধুস!
Comments
Post a Comment