ত্রিচুর বাসস্ট্যান্ডে নেমে একটা ছোটো গাড়িতে করে আমরা বেদক্কুনাথন মন্দিরচত্বরে পৌঁছে গেলাম। ৭০ মিটার লম্বা এক ঢিপির উপর মন্দিরটি অবস্থিত। মোট সাড়ে-তিন হেক্টর এলাকা নিয়ে এই মন্দির। চারপাশে চারটি গোপুরম। মন্দিরের গর্ভগৃহে কালো পাথুরে তৈরি বেদক্কুনাথন শিবলিঙ্গ শ্রদ্ধাভরে দর্শন করলাম আমরা। শিবলিঙ্গের একপাশে শ্রীরামচন্দ্রের বিগ্রহ, অন্যপাশে শঙ্করনারায়ণের বিগ্রহ। স্থানীয়রা বিশ্বাস করেন, পরশুরাম বিগ্রহগুলি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং তিনি নিত্যপূজা করতেন। এপ্রিল-মে মাসে এখানে কয়েকদিন ধরে পুরম উৎসব হয় মহাধুমধামের সঙ্গে। বাজি পোড়ানো হলো এই উৎসবের প্রধান অঙ্গ। বেদক্কুনাথন মন্দিরের অনতিদূরে সুবিখ্যাত গুরুভায়ুরাপ্পান বা শ্রীকৃষ্ণমন্দির। পবিত্র হিন্দুতীর্থ গুরুভায়ুর কৃষ্ণমন্দিরের জন্যই প্রসিদ্ধ। 'দক্ষিণের দ্বারকা' নামেও এর খ্যাতি আছে। কথিত আছে, স্বয়ং প্রজাপতি ব্রহ্মা, বিষ্ণুর অবতার শ্রীকৃষ্ণকে প্রতিষ্ঠা করেন এখানে। ব্রহ্মা প্রতিষ্ঠিত আর বায়ুদেবতা বহন করেন বলে, নামও হয়েছে গুরুভায়ুর। আর কৃষ্ণবিগ্রহকে বলা হয় গুরুভায়ুরাপ্পান, অর্থাৎ 'লর্ড অফ গুরুভায়ুর'। আমরা পুবের দরজা দিয়ে মন্দিরচত্বরে প্রবেশ করলাম। সুবিশাল চত্বর। সুবিশাল মন্দির। নাম্বুদ্রিপাদ ব্রাহ্মণেরা মন্দিরের পূজারী। মন্দিরচত্বরে ঢুকতেই শুনলাম, সানাই বাজছে। স্থায়ী নহবতখানা রয়েছে। সাড়ম্বরে চলছে শুভবিবাহম, অন্নপ্রাশনম, আরও সব আচার-অনুষ্ঠান। সুবিশাল হাতিশালা রয়েছে। রয়েছে অতিথিশালা। বৃদ্ধ এক বাঙালি দম্পতিকে দেখলাম, অতিথি হয়ে রয়েছেন। স্বামী-স্ত্রী দু'জনেই চাতালে বসে শ্রীকৃষ্ণের নামগান করছেন। দুধে-আলতা রঙের এক নাম্বুদ্রিপাদ ব্রাহ্মণ পুরোহিত প্রশ্ন করায় জানালেন, কলকাতার এক ভদ্রলোক তাঁর মা-বাবাকে মন্দির-কর্তৃপক্ষের সানন্দ অনুমতি সাপেক্ষে এখানে কয়েকমাসের জন্য রেখে গেছেন। যাইহোক, আমি ও ত্রিনাথদা বিগ্রহ দর্শন করার জন্য লাইনে দাঁড়িয়েছি। আমার ঠিক সামনেই এক সদ্যতরুণ তাঁর পুত্রসন্তানকে কোলে করে দাঁড়িয়েছেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণের দর্শন ও আশীর্বাদলাভের প্রত্যাশায়। শিশুটির ডান কানের লতিতে গলায় পরানো সিল্কের উত্তরীয় থেকে বেরিয়ে আসা একটি সুতো জড়িয়ে গেছে। তরুণ পিতা লক্ষ করেননি বিষয়টি। আমি সঙ্গে-সঙ্গে তাঁকে সতর্ক করে দিই। তিনি সুতোটি সরিয়ে দেন তৎক্ষণাৎ, আর আমাকে বারবার ধন্যবাদ জানাতে থাকেন। আমি বলি, আমাকে নয়; ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে ধন্যবাদ দিন।
আমাদের বিগ্রহদর্শন সারা হলে, আমরা পায়ে-পায়ে ফিরে আসছি। হঠাৎ দেখি, সেই তরুণটি তাঁর বাবা-মা ও স্ত্রীকে নিয়ে আমাদের কাছে এসে করজোড়ে বলছেন, আসুন আপনারা প্রসাদ নেবেন দয়া করে। আমরা তাঁদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে যাই তাঁদের সঙ্গে। সামনে এক ফাঁকা চাতালে বসতেই আমাদের সামনে তরুণটির মা ও স্ত্রী কলাপাতা পেতে দিয়ে বেতের বড়ো ঝুড়ি থেকে প্রসাদ দিতে থাকেন। প্রচুর ফলমূল ও মিষ্টান্নসামগ্রী, যা ওঁরা বাড়ি থেকে নিয়ে এসে দেবতাকে উৎসর্গ করেছেন। অন্নপ্রাশনমের এ এক অঙ্গ। আমার সৌভাগ্য, সুন্দর এই রিচ্যুয়ালটির সাক্ষী হয়ে রইলাম। খুবই অভিজাত শিক্ষিত পরিবার। ওঁদের এই আপ্যায়নে, আচরণে আমরা বিমোহিত। প্রসাদ গ্রহণ করে, ওঁদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে, শ্রীকৃষ্ণকে আরও একবার প্রণতি জানিয়ে আমরা ধীরে-ধীরে মন্দিরচত্ত্বর থেকে বেরিয়ে এলাম। এত বিশাল মন্দির আমি অন্তত আমার জীবনে আর কোথাও দেখিনি! পরম সৌভাগ্য, গুরুভায়ুরাপ্পানে আসতে পেরেছি।
এরপর আমরা বাসে করে আবার ফিরে এলাম কান্নানোরে। সেই রাত কান্নানোরে থেকে পরেরদিন সকালে রওনা দিয়ে, আমরা দুপুর দুটো নাগাদ পালঘাট হয়ে মালামবুড়া বা মালামপুঝায় চলে এলাম। পালঘাট বা পালাক্কাড থেকে মাত্র ১৪ কিমি। পশ্চিমঘাট পর্বতমালায় অপেক্ষাকৃত নিচু পাহাড়ে ঘেরা সুন্দর উপত্যকায় ভারতপুঝা নদীতে বাঁধ দিয়ে সৃষ্টি হয়েছে মালামপুঝা লেক। ড্যাম ছাড়াও বাঁধ-সংলগ্ন মনোরম সাজানো উদ্যানের পর্যটক-আকর্ষণ যথেষ্ট। কাতলা, মিরর-কার্প মাছে ভর্তি লেকের জলে নৌকাবিহারের চমৎকার ব্যবস্থা আছে। আমরা অবশ্য নৌকাবিহার করিনি। সবুজ ঘাস আর ফুলে-ফুলে ঢাকা উদ্যান-প্রাঙ্গন মোহিনী আলোয় সেজে ওঠে প্রতি শনি-রবি ও উৎসবের দিনে। খুবই নয়নাভিরাম দৃশ্য। স্থানীয় লোকজনের কাছে শুনলাম এইসব। এখানকার আবহাওয়া খুব মনোরম। আমরা ঘুরেফিরে সব দেখলাম। হেঁটে-হেঁটে দুই বন্ধু চলে গেলাম উপত্যকার শেষপ্রান্তে, যেখান থেকে পশ্চিমঘাট পর্বতমালার কিছু শীর্ষদেশ দেখা যায়। বসার জায়গা আছে। বসে-বসে ঝকঝকে নীলাকাশ, আকাশে উড়তে থাকা চিল, শকুন, সিগাল, কর্মোর্যান্ট ইত্যাদি পাখিও দেখলাম। বহুদিন পরে শকুন দেখলাম। সেই ছোটোবেলায় দেখেছি আমাদের গ্রামে। শ্মশানে প্রচুর শকুন। এখন আর পশ্চিমবঙ্গে শকুন দেখতে পাওয়া যায় না। যাইহোক, এবার ধীরে-ধীরে নেমে এসে বাঁধের উপরের সেতু দিয়ে হেঁটে চলে এলাম এপারে। একটা চায়ের দোকানে বসে সেঁকা পাউরুটি আর ঘুগনি খাচ্ছি। চায়ের দোকানের মালিক মইনুদ্দিনের সঙ্গে আলাপ হলো। সরল-সাদাসিধে, দরিদ্র মানুষ। সে জানালো, সে খিদিরপুর ডকে খালাসির কাজ করেছে দীর্ঘদিন। ভাঙা-ভাঙা বাংলা বলতে পারে। আমাদের বললো, এই নদীতে খুবই সুস্বাদু ছোটো মাছ পাওয়া যায়। দুপুরে এই দোকানেই সে আমাদের সেই মাছের ঝোল আর ভাত খাওয়াতে পারে। আমরা তো সানন্দে রাজি হলাম। বেলা দেড়টা-দুটোয় আসবো জানিয়ে, আমরা ধীরেসুস্থে কাছেই গাছপালা ঘেরা বাসস্ট্যান্ডের বিশ্রামালয়ে গিয়ে বিশ্রাম করতে লাগলাম। কিছুটা ঘুমিয়েও নিলাম দুই মুসাফির। ঘুম ভেঙে দেখি, মইনুদ্দিন ডাকছে আমাদের। বেলা প্রায় আড়াইটে। আমরা ওর সঙ্গে ওর ঝাঁপের ছোটো দোকানে গিয়ে চোখেমুখে জল দিয়ে ভাত খেতে বসলাম কাঠের বেঞ্চিতে। মাছের শুকনো-শুকনো ঝোল আর ভাত। আহা, কী সুন্দর রেঁধেছে মইনুদ্দিন! একেবারে অমৃত! ওকে টাকাপয়সা মিটিয়ে দিয়ে বাসস্ট্যান্ড থেকে পালাক্কাডগামী বাসে চড়ে বসলাম। যথাসময়ে বাস পৌঁছলো পালাক্কাডে। বাস থেকে নেমে আমরা বাসস্ট্যান্ডের নিকটবর্তী ছোটো একটা হোটেলে ডাবল-বেডেড রুমও পেয়ে গেলাম বেশ সস্তায়। একটু জিরিয়ে নিয়ে চলে এলাম পালাক্কাড বাজারে। চা খেয়ে ত্রিনাথদা এক ঝাঁ-চকচকে মিষ্টান্ন ভাণ্ডার থেকে আমার জন্য একটা ছোটো প্যাকেটে সন্দেশ নিয়ে এসেছেন। আমার হাতে দিয়ে বললেন, "আমি তো খাবো না, হাই সুগার; আপনি খান।" যখন যেখানেই ত্রিনাথদা-র সঙ্গে বেড়াতে গেছি, সব জায়গায় আমাকে উনি মিষ্টি খাইয়েছেন। আম কিন্তু দু-একটা খেতেন আমার সঙ্গে, বিশেষত বেনারসে যখন বেড়াতে গেছি। আর হ্যাঁ, উত্তরপ্রদেশ ভ্রমণকালে বিখ্যাত চৌসা আমও আমরা খেয়েছি, বিশেষত রাতে রুটির সঙ্গে। পালাক্কাডের যে মিষ্টান্ন ভাণ্ডার থেকে মিষ্টি কিনেছেন উনি, তার কারিগর নাকি বাঙালি। বোঝো কাণ্ড, কেরলের এই শেষপ্রান্ত পালাক্কাডেও মিষ্টির বাঙালি কারিগর! বাঙালি নেই কোথায়! এবার পায়ে-পায়ে বাজার পরিক্রমা শেষে, হায়দার আলি-র দুর্গটিও বাইরে থেকে দেখে নিলাম। আগামীকাল ভালো করে দেখতে হবে। সকাল-সকাল। কাল সন্ধ্যায় পালাক্কাড স্টেশন থেকেই আমাদের হাওড়াগামী ফেরার ট্রেন।
পরেরদিন সকাল ১০টা নাগাদ আমরা ১৭৬৬ সালে হায়দার আলি নির্মিত দুর্গটির ধ্বংসাবশেষ বেশ ভালোভাবে ঘুরেফিরে দেখলাম। মন ভরে গেল। ইতিহাসের কথাও মনে পড়লো। এই দুর্গেও হায়দার আলি-র সঙ্গে ইংরেজদের যুদ্ধ হয়েছিল। হায়দার ও তাঁর পুত্র টিপু সুলতান বীরত্বের সঙ্গে ব্রিটিশদের মোকাবিলা করেছিলেন। মৃত্যু হয়েছিল। কিন্তু সে-মৃত্যু ছিল প্রকৃত বীরের মৃত্যু।
বেলা একটা নাগাদ আমাদের হোটেলরুমে ফিরে এসে, স্নানাহার সেরে ঘুমিয়ে পড়লাম। সন্ধ্যা সাতটায় আমাদের ফিরতি ট্রেন। ট্রেনে ঠিক সময়ে উঠে রিজ়ার্ভড সিটে বসে পালাক্কাডের কথাই ভাবছিলাম। সুদীর্ঘ পশ্চিমঘাট পর্বতমালার অংশ তামিলনাড়ুর নীলগিরি পাহাড় শেষ হয়েছে তামিলনাড়ু ও কেরালা-র যৌথ সীমানার কাছে। আর বেশ কিছুটা চওড়া পাহাড়ি সমতল অঞ্চল সৃষ্টি করে এই পশ্চিমঘাট পর্বতমালা আবার শুরু হয়েছে কেরল আনাইমালাই পাহাড় নাম নিয়ে। আনাইমালাই আর নীলগিরির মাঝে ২৫কিমি চওড়া পাহাড়ি সমতলভূমির নাম পালাক্কাড গ্যাপ। এই পালাক্কাড গ্যাপের বুকে গড়ে উঠেছে উত্তর কেরলের অন্যতম শহর পালাক্কাড সিটি। ভাবছিলাম, কেরল সফর খুবই সার্থক আর বর্ণময় হলো আমাদের। এত বিচিত্র সব পরিবেশ, নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আমাদের প্রাণমন ভরিয়ে দিয়েছে একেবারে। ভাঙাচোরা আমার এই জীবনে এই যে আমার পর্যটন-স্পৃহা, তা নিঃসন্দেহে আমার জীবনকে কিছুটা হলেও এক তাৎপর্য দান করেছে—এই উপলব্ধি আমার হয়েছে।
নির্দিষ্ট দিনে, যথাসময়ে বাড়ি ফিরে এলাম। ফিরতে-ফিরতেই দুই বন্ধু ঠিক করলাম, আমাদের নেক্সট ট্রিপ হবে তামিলনাড়ু। দুই পর্বে তামিলনাড়ু যাবো। খুব বড়ো স্টেট—একবারে হবে না।
(ক্রমশ)
মুক্তধারা অনলাইন-এ ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত, কবি প্রাণেশ সরকার-এর আত্মজীবনী 'আমার ভাঙাচোরা জীবন'-এর প্রথম পর্যায় গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়েছে। প্রকাশক মেঘছায়া পাবলিকেশন (বীরনগর, নদিয়া)। মুদ্রিত মূল্য ৩০০ টাকা। বইটিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে এই আত্মজীবনীর প্রথম ২০টি পর্ব।
Comments
Post a Comment